জাঙ্ক কোম্পানির দখলে শেয়ারবাজার

কাওসার আলম

জাঙ্ক কোম্পানির দখলে শেয়ারবাজার

‘ভাগাড়’ বলতে সাধারণত এমন জায়গা বোঝায়, যেখানে মৃত পশু, আবর্জনা বা পচনশীল বর্জ্য ফেলা হয়। দেশের শেয়ারবাজারও এখন অনেকটা ‘আবর্জনাতুল্য বর্জ্য কোম্পানির’ ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্যানুযায়ী, তালিকাভুক্ত ২৯ শতাংশ কোম্পানি এখন জাঙ্ক কোম্পানি হিসেবে বিবেচিত ‘জেড’ ক্যাটাগরিভুক্ত। এসব কোম্পানির মধ্যে আবার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে ৩০ শতাংশের।

এ ক্যাটাগরিভুক্ত আরো ২৮ শতাংশ কোম্পানির অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় রয়েছে। তবে উৎপাদন বন্ধ বা অস্তিত্ব সংকটে থাকা সত্ত্বেও এসব কোম্পানির শেয়ার লেনদেন কিন্তু থেমে নেই। বরং দরবৃদ্ধি ও লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় প্রাধান্য পাচ্ছে ‘জাঙ্ক’ কোম্পানিগুলো।

বিজ্ঞাপন

বাজারসংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের শেয়ারবাজারে একসময় ব্যাংক, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক ও বীমা কোম্পানিগুলো ছিল বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ খাত। কিন্তু আওয়ামী সরকারের দুর্বৃত্তায়নে এখন এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই রুগ্ণ কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। অধিকাংশ ব্যাংকের শেয়ারের দর নেমে এসেছে অভিহিত মূল্যের (ফেস ভ্যালু) নিচে। ইসলামি শরিয়াহ মোতাবেক পরিচালিত পাঁচটি ব্যাংকের লেনদেন স্থগিত রয়েছে। এছাড়া ব্যাংকবহির্ভূত আটটি কোম্পানি ক্রমাগত লোকসানের কারণে অবসায়নের পথে রয়েছে। অন্যদিকে তালিকাভুক্ত মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর ব্যাপারেও বিনিয়োগকারীদের কোনো আগ্রহ নেই। ৩৬টির মধ্যে ৩২টি ফান্ডের বাজারদর অভিহিত মূল্যের নিচে। মূলত কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানি ও হাতেগোনা কিছু দেশীয় কোম্পানি ছাড়া দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগযোগ্য কোম্পানির সংখ্যা নেই বললেই চলে।

এমন পরিস্থিতির মধ্যে গত দু্ই বছরে শেয়ারবাজারে নতুন কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি। বিধিমালা পরিবর্তন ইস্যুতে আইপিও আবেদনও জমা পড়েনি। করোনার সময় ছাড়া এত দীর্ঘ সময় আইপিও না আসার ঘটনাকে নজিরবিহীন বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, দ্রুত ভালো কোম্পানিকে বাজারে নিয়ে আসতে না পারলে শেয়ারবাজার পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। সরকারের মালিকানাধীন বহুজাতিক যেসব কোম্পানির শেয়ার রয়েছে সেগুলো দ্রুত তালিকাভুক্ত করা উচিত। এছাড়া সরকারের যেসব প্রকল্প রয়েছে সেগুলো সিকিউরিটাইজ করে শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহে একটা পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।

সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি অব বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) তথ্যানুযায়ী, দেশের শেয়ারবাজারের মেইন বোর্ডে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা ৩৭০টি, মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড ৩৩টি, সরকারি ট্রেজারি বন্ড ২৩২টি, করপোরেট বন্ড ৪৭টি, এসএমই বোর্ডে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ৩০টি এবং অন্যান্য ক্যাটাগরি হিসাবে আরো ১৮টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে।

ডিএসইর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, প্রধান বোর্ডে তালিকাভুক্ত ৩৭০টি কোম্পানির মধ্যে ১০৭টি ‘জেড’ ক্যাটাগরিভুক্ত। এ হিসাবে প্রায় ২৯ শতাংশ কোম্পানিই এ ক্যাটাগরিতে। নিয়মিত বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) না করা, ছয় মাসের বেশি সময় ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকা ও বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ না দেওয়ার কারণে কোম্পানিগুলো ‘জেড’ ক্যাটাগরিভুক্ত হয়। এ ধরনের কোম্পানিগুলোকে বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করেন বাজারবিশ্লেষকরা।

ডিএসইর তথ্যানুযায়ী, ‘জেড’ ক্যাটাগরিভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৩২টির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে দুই দশকের বেশি সময় ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকা কোম্পানিও রয়েছে। ২০০২ সাল থেকে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে মেঘনা পিইটি কোম্পানির। তারপরও এ কোম্পানিটির শেয়ারের লেনদেন যথারীতি চলছে। গত এক বছরে কোম্পানিটির শেয়ারের দরসীমা ১৭ টাকা থেকে ৩১ টাকা পর্যন্ত। ২০১৬ সালে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে বাংলাদেশ ওয়েল্ডিং ইলেকট্রোড (বিডিওয়েল্ডিং)। বন্ধ থাকা সত্ত্বেও এ কোম্পানির শেয়ার গত এক বছরে ছয় টাকা থেকে ২০ টাকায় লেনদেন হচ্ছে। বন্ধের তালিকায় থাকা কোম্পানিগুলোর মধ্যে দুলামিয়া কটন, রহিমা ফুড, শ্যামপুর সুগার মিলস লিমিটেড কোম্পানির শেয়ার ১০০ টাকার বেশি মূল্যে লেনদেন হচ্ছে। অথচ সবচেয়ে ভালো মানের শেয়ার হিসাবে বিবেচিত ‘এ’ ক্যাটাগিরিতে তালিকাভুক্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার লেনদেন হচ্ছে ৪০ টাকার নিচে।

‘জেড’ ক্যাটাগরিভুক্ত ১০৭টি কোম্পানির মধ্যে ৩০টি কোম্পানির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ। বিনিয়োগকারীরা যাতে এ ধরনের কোম্পানিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করে, সেজন্য ওয়েবসাইটে সে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও যথারীতি এসব কোম্পানির শেয়ারের লেনদেন চলছে।

নিয়মানুযায়ী শেয়ারবাজারে লোকসানি কোম্পানির তালিকাভুক্তির কোনো সুযোগ নেই। প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির পূর্বশর্তই হচ্ছে কোম্পানিটির পুঞ্জীভূত লোকসান থাকতে পারবে না এবং আবেদনের আগের তিন বছর ধারাবাহিক মুনাফা থাকতে হবে। অর্থাৎ আর্থিকভাবে দুর্বল কোনো কোম্পানির শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ নেই। ব্যবসা সম্প্রসারণ, নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন, মূলধন বৃদ্ধি কিংবা ব্যাংকঋণ পরিশোধে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের মাধ্যমে কোম্পানি আগের চেয়ে আরো ভালো মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হবে—এমনটাই প্রত্যাশা করা হয়। কিন্তু দেশের শেয়ারবাজারে উল্টো চিত্রই দেখা যাচ্ছে। শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের কয়েক বছরের মধ্যেই বড় ধরনের লোকসান গুনতে থাকে এসব কোম্পানি। মুনাফা অর্জন করতে না পারায় বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ কোম্পানিগুলোর স্থান হয় ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে।

এসব কারণে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশের শেয়ারবাজার এখন জাঙ্ক কোম্পানির বাজারে পরিণত হয়েছে। অনেক কোম্পানি রয়েছে সেগুলো মুনাফা দেখাচ্ছে এবং লভ্যাংশও দিচ্ছে, কিন্তু তাদের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। দিন যত যাবে, এ ধরনের জাঙ্ক কোম্পানির সংখ্যা আরো বাড়বে। আর জাঙ্ক কোম্পানিগুলোকে ঘিরে শেয়ারবাজারে চলছে এক ধরনের জুয়াখেলা। বাংলাদেশে জুয়ার বৈধতা না থাকায় দেশের শেয়ারবাজারে এসব জাঙ্ক কোম্পানির শেয়ার এখন জুয়ার উপকরণ (ইনস্ট্রুমেন্ট) হিসেবে বিবেচনা করছে তারা। জুয়াখেলা খেলতে একসময় যেমন মানুষ নিঃস্ব হয়ে যায়, তেমনি বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে এসব জাঙ্ক কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করে নিঃস্ব হয়ে বাজার ছেড়ে যাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা।

সিডিবিএলের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে শেয়ারবাজারে বিও অ্যাকাউন্টধারীর সংখ্যা ১৬ লাখ ৫৭ হাজার। অথচ ২০১০ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩৩ লাখেরও বেশি। ১৪ বছরে বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যা তো বাড়েইনি, উল্টো ৫০ শতাংশ বিনিয়োগকারী বাজার ছেড়ে গেছেন।

এ বিষয়ে শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ ও আইসিবির চেয়ারম্যান আবু আহমেদ আমার দেশকে বলেন, শেয়ারবাজার ‘গার্বেজ’ কোম্পানির সংখ্যাই বেশি। এসব গার্বেজ বা জাঙ্ক কোম্পানি নিয়ে যা হচ্ছে, সেটা জুয়া ছাড়া কিছুই না। বিগত কমিশন (অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াতের আমলে) ৯০ শতাংশ লেনদেনই হতো জাঙ্ক শেয়ারে এবং এসব শেয়ার ক্রয়ে মার্জিন লোন সুবিধা দেওয়া হতো। বর্তমান কমিশন জাঙ্ক শেয়ার ক্রয়ে মার্জিন লোন সুবিধা বন্ধ করে ভালো কাজ করেছে। এখন নিজের টাকায় জুয়া খেলছে। বর্তমানে শেয়ারবাজার লেনদেনের প্রায় ৫০ শতাংশই জাঙ্ক শেয়ারে হচ্ছে।

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, ৪০০-এর মতো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলেও ৪০-৫০টি কোম্পানি বিনিয়োগযোগ্য। এ হিসাবে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কোম্পানি রয়েছে যেগুলো থেকে ভালো ডিভিডেন্ড পাওয়া যায়। ৫০ শতাংশেরও বেশি কোম্পানি জাঙ্কে পরিণত হয়েছে। এসব কোম্পানি দিয়ে শেয়ারবাজার চলছে না। এ কারণে বাজার থেকে বিনিয়োগকারীরা চলে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ঝুঁড়িতে থাকা পচা আপেল যেমন সরিয়ে ফেলতে হয়, তেমনি এসব পচা কোম্পানিকে তালিকাচ্যুত করে বাজারে ভালো কোম্পানি নিয়ে আসতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির বিরুদ্ধে ওভার রেগুলেটের অভিযোগ করে তিনি বলেন, শুধু রেগুলেট করলেই হবে না, বাজার উন্নয়নের দিকেও নজর দিতে হবে। বাজারে কেন ভালো কোম্পানি আসছে না, এ নিয়ে সব অংশীজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরিকল্পিত উপায়ে দেশের শেয়ারবাজারকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তোলা হয়। এরপর ২০১০ সালে দেশের শেয়ারবাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটে। ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারী তাদের পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হন। শেয়ারবাজারে বিপর্যয়ের পর বিএসইসির তৎকালীন চেয়ারম্যান জিয়াউল হক খন্দকারসহ কমিশনের সদস্যদের সরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক খায়রুল হোসেনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। আইন অনুযায়ী, দুই মেয়াদের বেশি বিএসইসির চেয়ারম্যান বা কমিশনারদের নিয়োগের বিধান না থাকলেও তিনি তিন মেয়াদে ৯ বছর কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই আরেক শিক্ষক ও আওয়ামীপন্থি নেতা অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলামকে কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর শিবলী রুবাইয়াত পদত্যাগ করেন।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাবির দুই অধ্যাপকের দায়িত্বকালে দেশের শেয়ারবাজারের কাঠামোগত ভিত্তি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তিগত সুবিধা লাভের জন্য তারা বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মে জড়িয়েছেন এবং বাজারকে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। অধ্যাপক খায়রুল হোসেনের সময় সবচেয়ে বেশি আইপিও অনুমোদন দেওয়া হয়। এসবের অধিকাংশই এখন দুর্বল কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে শিবলী রুবাইয়াত আইপিও মার্কেটের পাশাপাশি সেকেন্ডারি মার্কেটকে কারসাজি চক্রের অভয়ারণ্যে পরিণত করেন। আইনবহির্ভূত হওয়া সত্ত্বেও তিনি ব্যক্তিগতভাবেও শেয়ার ব্যবসায় নিয়োজিত ছিলেন। বাজারসংশ্লিষ্টরা এ দুজনকে ‘গার্বেজ রেগুলেটর’ হিসেবে অভিহিত করে থাকেন।

ডিএসইর তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, দুই অধ্যাপক বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ১৩২টি কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে ফিক্সড প্রাইজ মেথডে অনুমোদন দেওয়া ১১০টি কোম্পানির মধ্যে ৪১টি বর্তমানে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত। ‘বি’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে ৩৪টি কোম্পানি। সাধারণত বছর শেষে ১০ শতাংশের কম মুনাফা দেয় এ ধরনের কোম্পানিগুলোই ‘বি’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে নামমাত্র মুনাফা দিয়ে ‘বি’ ক্যাটাগরিতে থাকা বেশিরভাগ কোম্পানি আগামী দিনে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে ১০ শতাংশের বেশি লভ্যাংশ ঘোষণা দেওয়া ‘এ’ ক্যাটাগরিভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা ৪৫টি। এ হিসাবে ফিক্সড প্রাইস মেথডে তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেওয়া ৭৫টি এখন দুর্বল কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। শুধু তাই নয়, এদের মধ্যে বেশ কয়েকটি কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। অথচ ফিক্সড প্রাইস মেথডে তালিকাভুক্ত কোম্পানির অধিকাংশই প্রিমিয়ার মূল্যে বাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। এসব কোম্পানির মধ্যে কয়েকটির বাজারদর এখন অভিহিত মূল্যেরও নিচে।

বড় মূলধনী কোম্পানি হিসেবে প্রিমিয়াম মূল্যে বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে দুই কমিশনের আমলে ২২টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে চারটি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে, তিনটি ‘বি’ ক্যাটাগরিতে এবং ১৫টি ‘এ’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত। এসব কোম্পানির মধ্যে হাতেগোনা দুয়েকটি ছাড়া কোনোটিরই বাজারদর আইপিও মূল্যের বেশি নয়। বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের পর এসব কোম্পানির আর্থিক অবস্থার আরো অবনতি হয়েছে।

ডিএসইর নীতিনির্ধারকরা বলছেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে যারা কমিশনের দায়িত্বে ছিলেন তারা রাজনৈতিক প্রভাব ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর স্বার্থে দুর্বল, মানহীন ও নামসর্বস্ব কোম্পানিকে তালিকাভুক্তির অনুমোদন দিয়েছেন। ডিএসইর পক্ষ থেকে এসব কোম্পানির তালিকাভুক্তির বিষয়ে আপত্তি জানানো হলেও সেগুলো আমলে নেওয়া হয়নি। বরং সংশ্লিষ্ট ডিএসই কর্মকর্তাদের নানাভাবে হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়।

ডিএসইর সাবেক প্রেসিডেন্ট শাকিল রিজভী আমার দেশকে বলেন, কোম্পানির অবস্থার ওপর নির্ভর করে বাজার চলে। কোম্পানি ভালো না হলে ফেরেশতা দিয়ে চালালেও বাজার ভালো হবে না। বিগত দেড় দশকে শেয়ারবাজারে অনেক বাজে কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে। ডিএসইর পক্ষ থেকে এসব কোম্পানির অনেক বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়েছিল। কিন্তু বিএসইসি ক্ষমতা দেখিয়ে এসব কোম্পানির অনুমোদন দিয়েছে। আপত্তি জানানোর কারণে ডিএসইর পর্ষদ থেকে এমডিকে নানাভাবে শাসানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে ইস্যুয়ার, ইস্যু ম্যানেজার ও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশের মাধ্যমে দুর্বল, মানহীন কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে বলে মনে করেন শাকিল রিজভী। তিনি আরো বলেন, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর প্রাকৃতিক কারণে কিংবা ব্যবসায় ধরন পরিবর্তনের কারণে কিছু কোম্পানির আর্থিক অবস্থা খারাপ হতে পারে। তবে এর সংখ্যা দুই শতাংশের বেশি হতে পারে না। কিন্তু অধিকাংশ কোম্পানির আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে আর্থিকভাবে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকেই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

শেয়ারবাজারে আইপিওসহ মোট ১১টি অনিয়মের তদন্তে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে বিএসইসির বর্তমান চেয়ার‌ম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন কমিশন। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে অনিয়মের দায়ে বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলামের ওপর শেয়ারবাজার-সংশ্লিষ্ট যে কোনো কার্যক্রম থেকে আজীবনের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। আর্থিক অনিয়মসহ নানা দুর্নীতির ঘটনায় তিনি বর্তমানে কারান্তরীণ।

অপর চেয়ারম্যান অধ্যাপক খায়রুল হোসেনের ব্যাপারে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে তিনি আমেরিকায় অবস্থান করছেন। বেস্ট হোল্ডিংয়ের বন্ডকে শেয়ারে রূপান্তরে অনিয়মে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিএসইসির শুনানিতে অংশ নিয়েছিলেন খায়রুল হোসেন। এরপরই তিনি বিপদ আঁচ করতে পেরে আমেরিকায় পাড়ি জমান।

খায়রুল হোসেনের সঙ্গে বিএসইসির কমিশনার হিসেবে দায়িত্বপালনকারী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন নিজামী আমার দেশকে বলেন, আইপিও অনুমোদনে যেসব মৌলিক নীতি রয়েছে সেগুলোর অনুসরণ করেই কমিশন আইপিও অনুমোদন দিয়েছে। কমিশন যদি দুর্বল কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দিত, তাহলে বিনিয়োগকারীদের সুযোগ ছিল সেগুলোতে আবেদন না করে প্রত্যাখ্যান করার। কিন্তু প্রত্যেকটি আইপিওর ক্ষেত্রে ১০ গুণেরও বেশি সাবস্ক্রিপশন হয়েছে। এখন ১০-১৫ বছর পর যদি কোম্পানি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে চলে যায় বা আর্থিকভাবে দুর্বল হয়, তার দায়িত্ব কমিশনের ওপর বর্তানোর সুযোগ নেই। কমিশন আইপিওর অনুমোদন দেয় কিন্তু কোম্পানি ভালো করবেÑএ ধরনের কোনো গ্যরান্টি দেয় না। তবে আইপিও অনুমোদন দেওয়ার পর কমপ্লায়েন্স ও এনফোর্সমেন্ট অ্যাকশন সঠিকভাবে না নেওয়ার কারণে সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে আগের কমিশন, বর্তমান কমিশনের পাশাপাশি স্টক এক্সচেঞ্জেরও দায়বদ্ধতা রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, আমাদের দেশের শেয়ারবাজার কখনো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি। এখানে রাজনৈতিক প্রভাবের একটি বিষয় সব সময়ই ছিল। কিন্তু রেগুলেটর বডিতে যারা থাকেন, তারা কতটা সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন, সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে যেসব আইপিও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং কেন দেওয়া হয়েছে সেগুলোর পর্যালোচনা হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন