পোলাও চালের চড়ামূল্য, কমতি নেই ভেজালেও

পোলাও চালের চড়ামূল্য, কমতি নেই ভেজালেও
ছবি: সংগৃহীত

দেশের বাজারে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে পোলাও চালের দাম। পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার পরও গত তিন মাসে কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে প্রায় ৭০ টাকা। শুধু গত এক সপ্তাহেই বেড়েছে প্রায় ৪০ টাকা। বর্তমানে ব্র্যান্ডভেদে প্যাকেটজাত পোলাও চাল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ ২৩০ টাকায়। পাইকারি বাজারে ৫০ কেজির বস্তার দাম উঠেছে ১০ হাজার ২০০ টাকায়।

দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি সুগন্ধি চালের বাজারে বেড়েছে ভেজাল ও জালিয়াতির অভিযোগও। কাটারি আতপ ও কম দামের চাল মিশিয়ে চিনিগুঁড়া বা কালিজিরা চাল হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। কোথাও আবার সাধারণ আতপ চালে কৃত্রিম সুগন্ধি মিশিয়ে নামি ব্র্যান্ডের মোড়কে বাজারজাত করা হচ্ছে। এতে প্রতারিত হচ্ছেন ভোক্তারা।

বিজ্ঞাপন

খুচরা ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের অভিযোগ, মিল মালিক ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়েছে। তাদের দাবি, কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই তিন মাসে বস্তাপ্রতি চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা এবং এক সপ্তাহে প্রায় এক হাজার টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। পাশাপাশি প্যাকেটজাত চালের কেজিতেও ৪০ টাকা পর্যন্ত দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে পরিবহন ব্যয় কিছুটা বাড়লেও এত বড় মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা নেই বলে মনে করেন তারা।

তবে দেশের অন্যতম বৃহৎ খাদ্যপণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নাবিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম স্বপন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কারসাজির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, সুগন্ধি ধানের উৎপাদন কমে যাওয়া, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি এবং বিয়ে-সামাজিক অনুষ্ঠান বাড়ায় চাহিদা বেড়েছে। বাজার স্থিতিশীল রাখতে সাময়িকভাবে পোলাও চাল রপ্তানি বন্ধ রাখারও পরামর্শ দেন তিনি।

পাইকারি বাজারেও ঊর্ধ্বগতি

রাজধানীর বাবুবাজার, নয়াবাজার, বাদামতলী ও কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সব ধরনের পোলাও চালের দাম বেড়েছে। তেজগাঁওয়ের চাঁদপুর রাইস এজেন্সির স্বত্বাধিকারী বাচ্চু মিয়া জানান, যে বস্তা কয়েক মাস আগে ছয় হাজার টাকায় বিক্রি হতো, এখন সেটিই ১০ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মিলগেটেই মানভেদে প্রতি কেজি চাল কিনতে হচ্ছে ২০০ থেকে ২০৪ টাকায়, যা গত জুনে ছিল ১৫৬ থেকে ১৬৩ টাকা।

তার অভিযোগ, দেশের চালের বাজার হাতেগোনা ১০-১২টি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে। তারা আগেভাগে ধান কিনে মজুত করে পরে দাম বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করছে।

কারওয়ান বাজারে কেনাকাটা করতে আসা গৃহবধূ শারমিন বলেন, এভাবে দাম বাড়তে থাকলে সাধারণ মানুষের পক্ষে সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা কঠিন হয়ে পড়বে।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, তিন মাসে ৫০ থেকে ৭০ টাকা দাম বাড়া অস্বাভাবিক। সরকারের কর-শুল্ক কমানোর সুবিধাও ভোক্তারা পাচ্ছেন না। তার মতে, বাজার তদারকির দুর্বলতাই অসাধু ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করছে।

ভেজাল-জালিয়াতির বিস্তার

দাম বাড়ার সুযোগে সুগন্ধি চালের বাজারে ভেজালও বেড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কমদামি আতপ চালে কৃত্রিম সুগন্ধি বা বাসমতি ফ্লেভার মিশিয়ে চিনিগুঁড়া বা কালিজিরা চাল হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। আবার খাঁটি চিনিগুঁড়া চালের সঙ্গে কাটারি আতপ কিংবা ব্রি-৯০ জাতের চাল মিশিয়েও বাজারজাত করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আসল চিনিগুঁড়া মূলত ব্রি ধান-৩৪ জাত থেকে উৎপাদিত হয়। এতে স্বাভাবিকভাবেই সুগন্ধ থাকে; কোনো কৃত্রিম ফ্লেভারের প্রয়োজন হয় না।

সম্প্রতি পুরান ঢাকায় পোলাও চালে আতপ চাল মিশিয়ে ভেজাল করার দায়ে এক ব্যবসায়ীকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। যশোরেও নকল মোড়কে চিনিগুঁড়া চাল বিক্রির অভিযোগে এক ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়েছে।

নওগাঁর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. জামাল উদ্দিন বলেন, শুধু ব্রি ধান-৩৪ জাতের চালেই স্বাভাবিক সুগন্ধ থাকে। দেখতে প্রায় একইরকম হওয়ায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কমদামি চাল মিশিয়ে বেশি দামে বিক্রি করছেন।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ফরহাদ খন্দকার জানান, কৃত্রিম সুগন্ধি ব্যবহারের অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার পরই জানা যাবে এসব উপাদান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কি না।

কঠোর তদারকির দাবি

ভোক্তা প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ব্র্যান্ড বা মোড়ক দেখে নয়, পরিচিত ও বিশ্বস্ত বিক্রেতার কাছ থেকে চাল কেনা উচিত। একইসঙ্গে সুগন্ধি চালের মান যাচাই, ভেজাল শনাক্তকরণ এবং বাজার তদারকি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তারা।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, বাজারে নিয়মিত অভিযান চলছে এবং ভেজাল ও প্রতারণার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন