তেল-গ্যাস ও ঋণ ব্যয়ের বাড়তি চাপ, মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ

তেল-গ্যাস ও ঋণ ব্যয়ের বাড়তি চাপ, মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বাড়ছে। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ঋণের সুদহারও কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরো বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। এরপর তা আরো বেড়ে প্রায় ১০৮ ডলারে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তীব্র হওয়ায় জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ বাড়ছে।

বিজ্ঞাপন

সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় ধরে বাড়তে থাকলে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর এর বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

টেক্সাসে বুধবার রিপাবলিকান পার্টির সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার আগে যুদ্ধ শেষ হবে বলে তিনি মনে করেন না। তার এই বক্তব্যও সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে।

বাজার বিশ্লেষক ক্রিস বোশঁ বলেন, বিনিয়োগকারীরা তেলের বাড়তি দামের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে ক্রমেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছেন। তার মতে, জ্বালানির দাম এভাবে বাড়তে থাকলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

এদিকে ইরান-সমর্থিত হুথি বাহিনী ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগরীয় বন্দর মোখা দখল করেছে—এমন খবরও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর ফলে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে আরো বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। যুক্তরাজ্যের পাইকারি বাজারে গ্যাসের দাম প্রতি থার্ম ২০০ পেন্সের ওপরে উঠেছে, যা ২০২২ সালের শেষের পর প্রথমবারের মতো এত বেশি। ইউরোপে বছরের এই সময়ের তুলনায় গ্যাসের মজুতও অনেক কম। শীতের আগে মজুত পূরণ করার প্রয়োজনীয়তা গ্যাসের দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।

ব্রেন্ট ক্রুডের দামের গতিপথেও সংঘাতের প্রভাব স্পষ্ট। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর ফেব্রুয়ারিতে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬৬ ডলার থেকে দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। মার্চের শুরুতে তা ৮০ ডলারের ওপরে ওঠে এবং মার্চের শেষ দিকে প্রায় ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছায়। পরে দাম কমে জুলাইয়ে প্রায় ৭২ ডলারে নেমে আসে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে আবারও বাড়তে থাকে এবং ১০ সেপ্টেম্বর তা ১০৪ দশমিক ৭৬ ডলারে দাঁড়ায়।

যুক্তরাজ্যের ভোক্তারা পাইকারি গ্যাসের বাজারে স্বল্পমেয়াদি মূল্যবৃদ্ধি থেকে ‘অফজেম’-এর মূল্যসীমার কারণে কিছুটা সুরক্ষা পান। তবে গ্যাসের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে পরিবারগুলোর জ্বালানি ব্যয়ও বাড়বে। আগামী অক্টোবরের শুরুতেই যুক্তরাজ্যে এই মূল্যসীমা ৩ দশমিক ৬ শতাংশ বাড়ার কথা রয়েছে। এরপর পরবর্তী পরিবর্তন হবে জানুয়ারিতে।

জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সরকারি বন্ডের সুদহারেও। যুক্তরাজ্যে ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদহার বুধবার ২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। ২০ ও ৩০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদহারও ১৯৯৮ সালের পর দেখা যায়নি—এমন উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

সরকারি বন্ডের সুদহার বৃদ্ধির অর্থ হলো সরকারের জন্য ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে যাওয়া। এমন সময় এই চাপ তৈরি হয়েছে, যখন দেশটির সরকারি অর্থব্যবস্থাও চাপের মধ্যে রয়েছে। একই সঙ্গে এর প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপরও পড়তে পারে। কারণ ঋণের সুদহার বাড়লে নির্দিষ্ট সুদের বন্ধকী ঋণ বা মর্টগেজসহ বিভিন্ন আর্থিক পণ্যের ব্যয়ও বাড়তে পারে।

ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন শুধু জ্বালানি বাজারেই নয়, বিশ্ব অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, সরকারি ঋণের ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের আর্থিক ব্যয়ের ওপরও নতুন চাপ তৈরি করছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন