ফরিদগঞ্জে কচুরিপানা এখন আয়ের উৎস

ফরিদগঞ্জে কচুরিপানা এখন আয়ের উৎস

‎চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলায় ফেলে দেওয়া কচুরিপানা এখন মানুষের আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে । ফেলনা কচুরিপানা স্তূব আকারে বেড তৈরি করে, সেখান থেকে জৈবসার তৈরি করা হচ্ছে । জৈবসার অর্গানিক সবুজ সবজি উৎপাদন করে বিপ্লব সৃষ্টি করেছেন স্থানীয় কৃষকরা।

জানা গেছে, চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার ডাকাতিয়া নদীর তীরঘেঁষে চাঁদপুর-ফরিদগঞ্জ- লক্ষ্মীপুর আঞ্চলিক সড়কের শোভান এলাকার কৃষকরা কচুরিপানার তৈরি বেডে বিষমুক্ত সবজি চাষ করে সফলতার স্বাক্ষর রাখছেন। একদিকে যেমন এই পদ্ধতি লাভজনক প্রমাণিত হয়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষ পাচ্ছেন রাসায়নিকবিহীন নিরাপদ সবজি। ফরিদগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষির এমন উদ্যোগ ইতোমধ্যে চাঁদপুর জেলাকে মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

বিজ্ঞাপন

‎জানা যায়, ফরিদগঞ্জ উপজেলার শোভান গ্রামের কৃষক সহিদ তালুকদার প্রথম এই পদ্ধতিতে সবজি চাষ শুরু করলেও এখন ওই গ্রামের শতাধিক কৃষক এই পথে এগিয়ে এসেছেন।

‎স্থানীয়রা জানান, বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকেও কৃষি বিভাগের প্রশিক্ষণার্থী ও চাষিরা ফরিদগঞ্জে ভাসমান বেড সবজি চাষ পরিদর্শনে আসছেন। তিন দশক আগে বরিশাল থেকে আসা এক চারা বিক্রেতার হাতে ভাসমান বেডের চারা দেখে উদ্বুদ্ধ হন সহিদ তালুকদার। কিন্তু ঘটনাক্রমে ওই চারা নষ্ট হয়ে গেলে তাকে জরিমানা দিতে হয়। সেই জেদ থেকেই তিনি নিজ এলাকায় ডাকাতিয়া নদীর তীরে কচুরিপানা দিয়ে তৈরি করেন প্রথম ভাসমান বেড। এরপর শুরু হয় তার পরীক্ষামূলক চাষ, যা আজ দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। কচুরিপানার এসব বেডে যেমন লাউ, কুমড়া, লালশাকসহ ১৫-১৭ ধরনের সবজি চাষ সম্ভব, তেমনি বেডের অবশিষ্টাংশ জৈবসার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এতে রাসায়নিক সারের চাহিদা কমে এসেছে, বাড়ছে জৈবসারের জনপ্রিয়তা।

‎সহিদ তালুকদার জানান, এ বছর তিনি ৬০টি ভাসমান বেড তৈরি করেছেন। খরচ পড়েছে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা, আর আয়ের আশা করছেন প্রায় ১০ লাখ টাকা। এই কচুরিপানার বেডে চাষ করা সবজির আয়ের অর্থ দিয়ে তিনি তিন সন্তানকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। শোভান গ্রামে বর্তমানে প্রায় ১০০ থেকে ১১০ জন কৃষক নিয়মিত ভাসমান বেডে সবজি আবাদ করছেন। তিনি সরকারি আরো বেশি পৃষ্ঠপোষকতা দাবি করেছেন।

‎কৃষক বাবুল হোসেন জানান, তিনি গত ২০ বছর ধরে এই পদ্ধতিতে চাষ করছেন। অপর কৃষক আবু তাহের বলেন, এক শতক বেড তৈরি করতে খরচ হয় প্রায় ৫ হাজার টাকা, আর আয় হয় প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা, অর্থাৎ খরচের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি লাভ থাকে। বেড ভেঙে জমিতে ছড়িয়ে দেওয়া হয় জৈবসার হিসেবে, যা শীতকালীন সবজি উৎপাদনে বাড়তি সহায়ক হিসেবে কাজ করে।

‎কৃষক আবু জাফর বলেন, আমি কচুরিপানার এ বেডে বিভিন্ন প্রজাতির সবজি চাষ করে সুন্দরভাবে পরিবার নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছি। সবজি অন্য স্থানে বিক্রির পাশাপাশি নিজেরা বিশুদ্ধ খাবার খেতে পারছি। ডাকাতিয়া নদীর এ কচুরিপানা থেকে নতুন কিছু করা গেলে মানুষের কর্মস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি নদীর প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরে আসবে।

‎বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু জাফর বলেন, আমাদের উপজেলায় ডাকাতিয়া নদীর তীরে কচুরিপানার ওপর বেড প্রস্তুত করে সবজি চাষের বিষয়টি অনেকের নজরে এসেছে। আমার সঙ্গে পড়ুয়া অনেক শিক্ষার্থী চাঁদপুর আসলে তারা ফরিদগঞ্জে কচুরিপানার বেডে সবজি চাষের বিষয়টি দেখে আসে। আমি মনে করি এটি কৃষিতে একটি নতুন দিগন্ত।

‎ফরিদগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কল্লোল কিশোর সরকার জানান, কচুরিপানার বেডে সবজি ও মসলার আবাদ বাড়ছে। আমরা এ পর্যন্ত কৃষি বিভাগ থেকে ২৮টি প্রদর্শনী দিয়েছি। কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি সহায়তা বাড়ানো গেলে, উৎপাদন আরো কয়েকগুণ বৃদ্ধি সম্ভব।

এই পদ্ধতি শুধু পুষ্টির চাহিদাই পূরণ করে না, কৃষকের আর্থসামাজিক উন্নতিতেও ভূমিকা রাখছে।

‎ছবি ক্যাপশন: ফরিদগঞ্জ উপজেলার শোভান এলাকার ডাকাতি নদীর তীরে কচুরিপানার বেডে সবুজ শাকসবজি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন