বন্যার পানি তখনো স্কুলে পৌঁছায়নি। কিন্তু একের পর এক সতর্কবার্তা পাচ্ছিলেন প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি। শেষ সতর্কবার্তাটি পাওয়ার পর আর অপেক্ষা করেননি তিনি। বন্ধ করে দেন ক্লাস। ৯০০ শিক্ষার্থীকে দ্রুত সরিয়ে নেন উঁচু জায়গায়। এর মাত্র কয়েক মিনিট পরই ভয়ংকর পানির স্রোত আছড়ে পড়ে শহরে।
নেপালের নুয়াকোট জেলার ত্রিভুবন ত্রিশূলি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দাওয়াদির ওই সিদ্ধান্তে প্রাণে বেঁচে যায় ৯০০ শিক্ষার্থী।
তার ভাষায়, সিদ্ধান্ত নিতে আরো ১০ মিনিট দেরি হলে শিক্ষার্থীসহ তাদের কেউই হয়তো আজ বেঁচে থাকত না।
স্কুলটিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ৬০০। বন্যার ভয়াবহতা সম্পর্কে কয়েক মিনিটের মধ্যেই চারটি সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন দাওয়াদি। বিভিন্ন ব্যক্তি তাকে এসব সতর্কবার্তা দেন। এর মধ্যে একটি এসেছিল নদীর উজানে থাকা বেত্রাবতী শহর থেকে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন তিনি। বিবিসিকে দাওয়াদি বলেন, ‘আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আর দেরি করা উচিত নয়। বন্যা না এলেও সমস্যা ছিল না। সর্বোচ্চ এক দিনের ক্লাস নষ্ট হতো।’
এরপর শিক্ষার্থীদের স্কুল থেকে সরিয়ে উঁচু জায়গায় নেওয়া শুরু হয়। সেই সময়ই ভয়াবহ দৃশ্যটি চোখে পড়ে দাওয়াদির। নদী থেকে মাত্র ১০০ মিটার দূরে থাকা একটি আবাসিক ভবন মুহূর্তের মধ্যে বন্যার পানির স্রোতে তলিয়ে যায়।
দাওয়াদি বলেন, ‘আমরা যদি ১০ মিনিট পরে সিদ্ধান্ত নিতাম, তাহলে শিক্ষার্থীসহ আমাদের কেউই আজ আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারতাম না।’
‘মাত্র ১০ সেকেন্ডের ব্যবধানে বেঁচে গেছি’
দাওয়াদির সিদ্ধান্তে প্রাণে বেঁচে যাওয়া শিক্ষার্থীদের একজন ১৬ বছর বয়সি ইউনিশা। তার বর্ণনায়, মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে এসেছেন তারা।
সাংবাদিকদের ইউনিশা বলেন, ‘আমি ও আমার বন্ধুরা মাত্র ১০ সেকেন্ডের ব্যবধানে বেঁচে গেছি।’
বন্যার পানি ও ধ্বংসাবশেষ যখন শহরটিকে গ্রাস করছিল, তখন শিক্ষার্থীরা কাদামাখা পথ ধরে দৌড়ে নিরাপদ জায়গায় ওঠে। ইউনিশা বলেন, ‘চোখের সামনে মুহূর্তের মধ্যে বাজারটি ভেসে যায়।’
বন্যার তিন দিন পর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আবার দেখা হয় ইউনিশার।
শিক্ষকদের সতর্কতায় রক্ষা পেল আরো শিশু
শুধু নুয়াকোট নয়, নেপালের আরো কয়েকটি এলাকায় শিক্ষকদের দ্রুত সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের প্রাণ বাঁচিয়েছে।
বন্যায় অন্তত ৬৯টি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এতে প্রায় ১৯ হাজার শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে শিশু অধিকারবিষয়ক সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন।
বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি ধাদিং। সেখানে একদল শিক্ষার্থী দুপুরের খাবারের বিরতিতে শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হয়েছিল। ঠিক তখনই ভয়াবহ পানির স্রোত আঘাত হানে। শ্রেণিকক্ষের বাইরে থাকায় তারা প্রাণে বেঁচে যায়।
এলাকার অন্য শিক্ষার্থীদেরও শেষ মুহূর্তে শ্রেণিকক্ষ থেকে বের করে দেন শিক্ষকরা। পানি ধেয়ে আসার ঠিক আগে তারা শিক্ষার্থীদের দ্রুত স্কুল ছাড়ার নির্দেশ দেন।
বেঁচে যাওয়া এক শিশুর মা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘বন্যা আসছে। ব্যাগ ও খাবারের বাক্স রেখে চলে যাও।’
শিক্ষকদের সেই নির্দেশ মেনেই শিক্ষার্থীরা দ্রুত বেরিয়ে আসে। এভাবেই তারা ভয়াবহ বন্যার হাত থেকে রক্ষা পায়।
নিহত ৭৮১, নিখোঁজ ২,৫০২
নেপালে এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ৭০০-এর বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। রোববার দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২ হাজার ৫০২ জনের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে ৫৯২ জন বিদেশি নাগরিক।
সর্বশেষ হিসাবে, দুর্যোগে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৮১ জনে।
বুধবার সকালে নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে এই ভয়াবহ দুর্যোগ শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, একটি হিমবাহ ধসে এই আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। এতে বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ পাহাড় থেকে প্রবল স্রোতে নিচের দিকে নেমে আসে।
সেই স্রোত পথে থাকা জনপদগুলোতে আঘাত হানে। মুহূর্তের মধ্যে ভেসে যায় ঘরবাড়ি, বাজার ও স্থাপনা।
এই দুর্যোগের পর জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছেন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে নেপালের অবদান খুবই সামান্য। অথচ এর ক্ষতির বড় অংশ বহন করতে হচ্ছে নেপালের মানুষকে।
নেপালের মানুষ তাদের অবদানের তুলনায় অসমভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের ‘প্রধান ভুক্তভোগী’ হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

