৪৩০ কোটি টাকার প্রকল্পে ১৪ অডিট আপত্তি

৪৩০ কোটি টাকার প্রকল্পে ১৪ অডিট আপত্তি
আমার দেশ গ্রাফিক্স

কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে নেওয়া ৪৩০ কোটি টাকার প্রকল্পে ধীরগতি, নির্মাণ ত্রুটি, তদারকির ঘাটতি ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার চিত্র উঠে এসেছে। একই সঙ্গে ১৪টি অডিট আপত্তিতে প্রায় ৩৪ কোটি ২৩ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়ম শনাক্ত হলেও দীর্ঘদিনেও সেগুলোর নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নেওয়া উদ্যোগটির কার্যকারিতা ও স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি হাওরাঞ্চলের আকস্মিক বন্যা, জলাবদ্ধতা, যোগাযোগব্যবস্থা ও নির্মাণসামগ্রী পরিবহনের বাস্তবতা যথাযথভাবে বিবেচনায় না নেওয়ায় বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

‘কিশোরগঞ্জ জেলার হাওর এলাকার নির্বাচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়ন (প্রথম সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্পটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের উদ্যোগে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর বাস্তবায়ন করছে। ২০২০ সালের ১৬ জানুয়ারি একনেকে অনুমোদিত প্রকল্পটির সংশোধিত ব্যয় ৪৩০ কোটি ১২ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। জুন ২০২৭ পর্যন্ত এর মেয়াদ নির্ধারিত রয়েছে। তবে মে ২০২৬ পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৫৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ, বিপরীতে বাস্তব অগ্রগতি ৭৩ দশমিক ৫ শতাংশ।

প্রকল্পের আওতায় ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলী উপজেলার ২৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঁচ ও ছয়তলা ভবন, ছাত্রাবাস-ছাত্রীনিবাস, বিজ্ঞানাগার, লাইব্রেরি ও আইসিটি ল্যাব নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ৩৬টি ভবনের মধ্যে মে ২০২৬ পর্যন্ত ১৪টির নির্মাণ শেষ হয়েছে। কিন্তু অনেক ভবনে প্রয়োজনীয় আসবাব, বিজ্ঞানাগারের সরঞ্জাম ও আইসিটি উপকরণ না থাকায় পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার শুরু করা যায়নি।

নির্মাণকাজে ত্রুটি

আইএমইডির সরেজমিন পরিদর্শনে কয়েকটি ভবনে নির্মাণমান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অষ্টগ্রামের আব্দুল ওয়াদুদ উচ্চবিদ্যালয়ের ভবনে দৃশ্যমান ফাটল, অসমান প্লাস্টার, বাঁকা লিন্টেল এবং ইটের গাঁথুনিতে ফাঁকা অংশ পাওয়া গেছে। এসব ফাঁক দিয়ে পানি ঢুকলে ভবিষ্যতে লবণাক্ততা, প্লাস্টার খসে পড়া ও গাঁথুনির স্থায়িত্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মিঠামইনের বিরাটী ও কাঞ্চনপুর উচ্চবিদ্যালয়ের ভবনে প্লাস্টারে হেয়ারলাইন ক্র্যাক এবং ছাদে পানি চুইয়ে পড়ার চিহ্ন পাওয়া গেছে। অষ্টগ্রাম বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন ছাত্রীনিবাসে ছাদের প্রয়োজনীয় ঢাল ঠিক না থাকায় বর্ষায় পানি জমার ঝুঁকি রয়েছে। টাইলস ও গাঁথুনির কাজেও নিম্নমানের ফিনিশিং ধরা পড়ে।

নিকলী মুক্তিযোদ্ধা আদর্শ সরকারি কলেজের ভবনের মূল কাঠামো সন্তোষজনক হলেও গ্রিল, ওয়েল্ডিং ও দরজার চৌকাঠের কাজে দুর্বলতা পাওয়া যায়। সমীক্ষা দল এসব ত্রুটির পেছনে অদক্ষ শ্রমিক ও দুর্বল তদারকিকে দায়ী করেছে।

১৪ অডিট আপত্তিতে ৩৪ কোটি টাকা

প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুতর অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে ১৪টি অডিট আপত্তিতে ৩৪ কোটি ২৩ লাখ ৭০ হাজার টাকার অনিয়মের বিষয় উঠে এসেছে। এর একটিও এখন পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়নি।

অডিট পর্যবেক্ষণে অতিরিক্ত পাইল, রড ও কংক্রিট দেখিয়ে বিল নেওয়া, ব্যবহার না করা রডের মূল্য পরিশোধ, চুক্তির আগেই বিল দেওয়া, টেস্ট রিপোর্ট ছাড়া অর্থ ছাড় এবং স্পেসিফিকেশন-বহির্ভূত নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া বিলম্বজনিত জরিমানা আদায় না করা, ভুয়া কারিগরি পরীক্ষার প্রতিবেদন গ্রহণ, পারফরম্যান্স সিকিউরিটির মেয়াদ না বাড়িয়ে বিল পরিশোধ এবং সরকারি ভ্যাট-রয়্যালটি আদায়ে ব্যর্থতার বিষয়ও অডিটে উঠে এসেছে।

ভবন আছে, সরঞ্জাম নেই

অবকাঠামো নির্মাণের সঙ্গে প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহের সমন্বয় না থাকাও প্রকল্পের অন্যতম বড় দুর্বলতা। আসবাবপত্রের ৩৬টি প্যাকেজের মধ্যে মে পর্যন্ত মাত্র ১৩টির কাজ শেষ হয়েছে। ১১টি চলমান এবং ১২টি মূল্যায়ন পর্যায়ে ছিল।

আইসিটি সরঞ্জাম সংগ্রহে পরিস্থিতি আরো হতাশাজনক। ২৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ১৫টি প্যাকেজ নির্ধারণ করা হলেও সমীক্ষার সময় পর্যন্ত একটিরও দরপত্র আহ্বান করা হয়নি। ফলে ল্যাবের কক্ষ তৈরি হলেও কম্পিউটারসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহের কার্যক্রম শুরু হয়নি। এছাড়া ভবন নির্মাণ শেষ হলেও কোথাও প্রয়োজনীয় বেঞ্চ-ডেস্ক, বিজ্ঞানাগারের সরঞ্জাম কিংবা অন্যান্য শিক্ষাসামগ্রী না থাকায় শিক্ষার্থীরা প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাচ্ছে না।

হাওরের পরিবেশে টেকসই নিয়ে শঙ্কা

হাওরাঞ্চলের আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও ঢেউয়ের কারণে ভবনগুলোর স্থায়িত্ব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, ওয়াটারপ্রুফিং ও রিটেইনিং ওয়ালের ঘাটতি রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে জায়গার সংকটের কারণে প্রতিরক্ষামূলক অবকাঠামো আংশিক নির্মাণ করা হয়েছে।

প্রকল্প শেষ হওয়ার পর ভবনগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কার্যকর কোনো এক্সিট প্ল্যান নেই। বড় ধরনের মেরামতের জন্য আলাদা তহবিলও রাখা হয়নি। ফলে ভবিষ্যতে এসব স্থাপনা কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ

আইএমইডি দ্রুত অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি, নির্মাণকাজের ত্রুটি সংশোধন, বাকি ভবনগুলোর কাজ শেষ করা এবং আসবাবপত্র ও আইসিটি সরঞ্জাম সরবরাহের সঙ্গে অবকাঠামো নির্মাণের সমন্বয়ের সুপারিশ করেছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন