ইবনে ফাদলানের ভ্রমণবৃত্তান্তে রুশ ভাইকিংদের জীবনচিত্র

ইবনে ফাদলানের ভ্রমণবৃত্তান্তে রুশ ভাইকিংদের জীবনচিত্র
ভাইকিং বা রুশ বণিকদের কাছে দাস বিক্রি করার একটি সাধারণ দৃশ্য

দশম শতকের আরব পর্যটক ও কূটনীতিক আহমাদ ইবনে ফাদলান প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তার পুরো নাম আহমাদ ইবনে ফাদলান ইবনে আব্বাস ইবনে রশিদ ইবনে হাম্মাদ। তিনি আব্বাসী খলিফা আলমুকতাদিরের বিশেষ দূত হিসেবে ৯২১ সালে বাগদাদ থেকে যাত্রা করেন এবং ৯২২ সালে ভলগা বুলগার অঞ্চলে পৌঁছান। তার ভ্রমণবৃত্তান্ত ‘রিসালাহ’ ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল, যেখানে তিনি ওঘুজ তুর্কি, বাশকির, খাজার, ভলগা বুলগার এবং বিশেষভাবে রুশদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছেন।

ইবনে ফাদলান তার রচনায় ভাইকিংদের ‘রুশ’ নামে উল্লেখ করেছেন। আধুনিক গবেষকদের মতে, এরা ছিল স্ক্যান্ডিনেভীয় বণিক ও যোদ্ধাদের একটি গোষ্ঠী। তারা পূর্ব ইউরোপের নদীপথ ব্যবহার করে বাণিজ্য পরিচালনা করত।

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘ ও কষ্টকর যাত্রার পর ইবনে ফাদলান ও তার সঙ্গীরা ৯২২ সালের ১২ মে ভলগা বুলগারদের অঞ্চলে পৌঁছান। সেখানে শাসক আলমিশ তাদের অভ্যর্থনা জানান। ইবনে ফাদলানের বর্ণনা থেকে জানা যায়, খলিফার পত্র পাঠ করে শোনানোর সময় প্রতিটি বাক্য স্থানীয় ভাষায় অনুবাদ করা হয় এবং উপস্থিত লোকরা ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দেয়।

পরে তিনি আতিল বা ভলগা নদীর তীরে অবস্থানরত রুস বণিকদের দেখেন। তিনি তাদের শারীরিক গঠন দেখে বিস্মিত হয়ে লেখেন : ‘তারা ছিল আমার দেখা শারীরিকভাবে সবচেয়ে পরিপূর্ণ মানুষ। তারা খেজুরগাছের মতো লম্বা।’

তিনি আরো উল্লেখ করেন, তাদের শরীরে বিভিন্ন ধরনের উল্কি বা ট্যাটুর স্পষ্ট চিহ্ন ছিল। তাদের হাতের কবজি থেকে শুরু করে বাহু, কাঁধ এবং গলা পর্যন্ত বিভিন্ন নকশায় উল্কি আঁকা ছিল। এসব উল্কিতে জ্যামিতিক নকশার পাশাপাশি লতাপাতা, গাছ, ফুল এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদানের চিত্র অঙ্কিত ছিল। তার পর্যবেক্ষণে এসব উল্কি শুধু দেহসজ্জার জন্য নয়, বরং তাদের সামাজিক পরিচয়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কিংবা ব্যক্তিগত মর্যাদার গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে প্রতীয়মান হয়।

তবে রুশদের পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস সম্পর্কে ইবনে ফাদলানের পর্যবেক্ষণ মোটেও ইতিবাচক ছিল না। একজন মুসলিম আলিম হিসেবে ইসলামে নির্ধারিত পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার বিধানের সঙ্গে তাদের দৈনন্দিন অভ্যাসের সুস্পষ্ট পার্থক্য তিনি লক্ষ করেন। তার বর্ণনায় দেখা যায়, মলমূত্র ত্যাগের পর কিংবা অন্যান্য দৈনন্দিন কাজের পর তারা মুসলমানদের মতো শরিয়ত নির্দেশিত পদ্ধতিতে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখত না। বিশেষ করে, একটি দৃশ্য তাকে গভীরভাবে বিস্মিত করেছিল। দৃশ্যটি ছিল এমন—একটি বড় পাত্রে পানি এনে পরপর বহু মানুষ একই পানিতে মুখ ধুয়ে, নাক পরিষ্কার করে এবং অন্যান্য পরিচ্ছন্নতার কাজ সম্পন্ন করত। ইবনে ফাদলানের কাছে এই অভ্যাসটি অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ও বিস্ময়কর বলে মনে হয়েছিল।

রুশ সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ধর্মীয় বিশ্বাস। সে সময় তারা বর্তমানের মতো খ্রিষ্টান ছিল না; বরং স্থানীয় বিভিন্ন দেব-দেবীর উপাসনা করত। ইবনে ফাদলান উল্লেখ করেন, ব্যবসায়ীরা কাঠের তৈরি মূর্তির সামনে গিয়ে সফল বাণিজ্যের জন্য প্রার্থনা করত এবং বিভিন্ন উপঢৌকন উৎসর্গ করত।

তিনি আরো বলেন, রুশদের কিছু সামাজিক আচরণ তার কাছে অত্যন্ত বিস্ময়কর ও নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়েছিল। কতক রুশ বণিক নিজেদের দাসীদের সঙ্গে প্রকাশ্যেই যৌন সম্পর্ক স্থাপন করত, এমনকি আশপাশে অন্য লোকজন উপস্থিত থাকলেও তারা এতে বিশেষ সংকোচ বোধ করত না। একজন মুসলিম আলিম হিসেবে ইবনে ফাদলান এই আচরণকে কঠোরভাবে নিন্দা করেন এবং এটিকে তাদের নৈতিক ও সামাজিক রীতিনীতির একটি নেতিবাচক দিক হিসেবে তুলে ধরেন।

তবে ইবনে ফাদলানের সবচেয়ে বিখ্যাত বিবরণ হলো একটি রুশ নেতার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া। এটি ভাইকিংদের মৃত্যু-পরবর্তী আয়োজন সম্পর্কে ইতিহাসে সংরক্ষিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যক্ষ বিবরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

তিনি লিখেছেন, প্রধানের মৃত্যুর পর তাকে সঙ্গে সঙ্গে দাফন করা হয় না। প্রথমে দশ দিনের জন্য একটি অস্থায়ী কবরে রাখা হয়। এ সময়ে তার জন্য নতুন পোশাক তৈরি করা হয় এবং শেষকৃত্যের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এরপর তার সম্পদ তিন ভাগে ভাগ করা হয়; এক ভাগ পরিবারের জন্য, এক ভাগ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার খরচের জন্য এবং এক ভাগ অনুষ্ঠানের ব্যবহারের জন্য।

এরপর মৃতের দাসীদের জিজ্ঞাসা করা হয়, তাদের মধ্যে কে প্রভুর সঙ্গে মৃত্যুবরণ করবে। একজন তরুণী স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসে।

পরবর্তী কয়েক দিন তাকে বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা হয় এবং আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতির অংশ করা হয়।

নদীর তীরে একটি জাহাজ রাখা হয় এবং তার ভেতরে মৃত প্রধানের জন্য একটি বিশেষ কক্ষ তৈরি করা হয়। পরে মৃতদেহ বের করে মূল্যবান পোশাক ও অলংকার পরিয়ে সেখানে বসানো হয়। এরপর বিভিন্ন পশু ‘বলি’ দেওয়া হয়—ঘোড়া, কুকুর ইত্যাদি। তাদের বিশ্বাস ছিল, এগুলো মৃত ব্যক্তির সঙ্গে পরজগতে যাবে।

অনুষ্ঠানের সবচেয়ে রহস্যময় চরিত্র ছিলেন একজন বৃদ্ধা নারী, যাকে ইবনে ফাদলান ‘মৃত্যুর দেবদূত’ নামে উল্লেখ করেছেন। তিনি অনুষ্ঠানের শেষ ধাপ পরিচালনা করতেন। শেষপর্যায়ে দাসীটিকে জাহাজে নেওয়া হয় এবং ধর্মীয় আচার সম্পন্ন হওয়ার পর তাকে হত্যা করা হয়। এরপর মৃত প্রধান, দাসী, পশু, অস্ত্র, সম্পদসহ পুরো জাহাজে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ইবনে ফাদলান উল্লেখ করেন, এক রুশ ব্যক্তি তাকে বলেছিল, ‘তোমরা আরবরা তোমাদের প্রিয় মানুষকে মাটির নিচে পুঁতে রাখো। কিন্তু আমরা তাকে আগুনের মাধ্যমে দ্রুত তার গন্তব্যে পাঠাই।’

পরে জাহাজ ও সবকিছু পুড়ে যাওয়ার পর সেখানে একটি মাটির ঢিবি তৈরি করা হয় এবং একটি কাঠের খুঁটি স্থাপন করা হয়।

ইবনে ফাদলানের এই বিবরণ শুধু ভাইকিংদের ইতিহাস নয়; এটি দশম শতাব্দীর উত্তর ইউরেশিয়ার সমাজ, বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও মানুষের মানসিক জগৎ সম্পর্কে একটি বিরল জানালা খুলে দেয়। আজও ইতিহাসবিদরা তার পর্যবেক্ষণকে মধ্যযুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যক্ষ দলিল হিসেবে মূল্যায়ন করেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন