লোকসাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু চরিত্র আছে, যাদের জন্ম একটি নির্দিষ্ট সমাজে হলেও সময়ের সঙ্গে তারা নির্দিষ্ট স্থানের সীমানা অতিক্রম করে বৃহত্তর মানবসমাজের সম্পদে পরিণত হয়। জোহা তেমনই একটি চরিত্র। বাংলাদেশের যিনি নাসিরুদ্দিন হোজ্জা নামে পরিচিত। জোহার উৎস আরব-পারসিক-ইসলামি সাংস্কৃতিক পরিসরে। কিন্তু শত শত বছর ধরে তার কাহিনি মৌখিকভাবে প্রচারিত, পরিবর্তিত ও পুনর্নির্মিত হতে হতে বিশ্বের বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্বসংস্কৃতিতে তার সবচেয়ে পরিচিত রূপ নাসিরুদ্দিন হোজ্জা বা জোহা নামে। ফলে জোহা আজ শুধু আরবের একজন রসিক ব্যক্তি নন; তিনি মানুষের হাসি, বুদ্ধি, প্রতিবাদ, সামাজিক সমালোচনা এবং ক্ষমতার সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্কের একটি সর্বজনীন প্রতীক।
জোহার ঐতিহাসিক মূল্যায়ন : ব্যক্তি থেকে লোকচরিত্র
জোহার ঐতিহাসিক পরিচয় নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ আছে। তবে তার অস্তিত্বের উল্লেখ প্রাচীন অনেক সাহিত্যকর্ম ও জীবনীমূলক বিভিন্ন রচনায় পাওয়া যায়। বালাজুরী তার ‘আনসাবুল আশরাফ’-এ জোহার সঙ্গে আবু মুসলিম খোরাসানির সাক্ষাতের একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, আবু মুসলিম কুফায় এসে জোহা নামের এক রসিক ব্যক্তির কথা জানতে পারলেন। তাকে খুঁজে আনা হলো। জোহা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমাদের মধ্যে আবু মুসলিম কে?’
তার এই আপাত সরল অথচ অত্যন্ত সাহসী প্রশ্নে আবু মুসলিম হাসলেন। পরে জোহাকে নিজের কাজে নিয়োগ করে পাঁচ হাজার দিরহাম উপহার দিলেন।
এই ছোট ঘটনার মধ্যেই জোহার চরিত্রের মূল বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে— ক্ষমতাবান ব্যক্তির সামনে ভয় না পেয়ে অপ্রত্যাশিত কথা বলা এবং হাস্যরসের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে নিয়ে আসা।
জামাখশারীও আলমুস্তাকসা গ্রন্থে জোহাকে উল্লেখ করেছেন। তিনি জোহাকে ফাজারাহ গোত্রের সদস্য বলেছেন। অন্যদিকে বিভিন্ন অভিধান ও জীবনী গ্রন্থে জোহার নাম দুজাইন ইবনে সাবিত, আবুল গুসন ইত্যাদি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ঐতিহাসিক জোহা ঠিক কে ছিলেন, এ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও তার নামে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক চরিত্রটি ক্রমেই শক্তিশালী হয়েছে। এখান থেকেই জোহা চরিত্রের গুরুত্ব সম্পষ্ট হয়। একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তি হয়তো নির্দিষ্ট সময় ও স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেন; কিন্তু জোহা সেই সীমানা অতিক্রম করেছেন। বিভিন্ন স্থান ও কালে বারবার বিভিন্ন ভাবে তার চরিত্র বিনির্মাণ করা হয়েছে। ব্যক্তি জোহা ধীরে ধীরে ‘জোহা’ নামের একটি সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
বোকামির মুখোশ ও জোহার স্বাধীনতার রহস্য
জোহাকে লোকসাহিত্যে প্রায়ই বোকা বা নির্বোধ হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু তার ‘বোকামি’ই আসলে তার সবচেয়ে বড় শক্তি। একজন জ্ঞানী বা রাজনৈতিকভাবে সচেতন ব্যক্তি যদি শাসকের সামনে অস্বস্তিকর প্রশ্ন করেন, তাহলে শাস্তি পাওয়ার ভয় থাকে। কিন্তু একজন ‘বোকা’ লোক যদি তেমন কোনো কথা বলে, নিছক কৌতুক বলে সেটা এড়িয়ে যাওয়া যায়।
জোহা তাই বোকামিকে বাক-স্বাধীনতার মুখোশ হিসেবে ব্যবহার করে। এই মুখোশ তাকে সামাজিক ও রাজনৈতিক নীতি-বহির্ভূত কিছুটা স্বাধীনতা দেয়। ফলে ক্ষমতাবান ব্যক্তির সামনে তিনি এমন কথাও বলতে পারেন, অন্যদের যা বলার সাহস হয় না।
জোহা ও নসরুদ্দিন খোজা : আরব থেকে আনাতোলিয়া
জোহার সর্বজনীনতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ তার তুর্কি রূপ নসরুদ্দিন খোজা। আরব জোহার সঙ্গে নসরুদ্দিন খোজার চরিত্রগত মিল এত বেশি যে দুই চরিত্রের মধ্যে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হয়েছে।
নসরুদ্দিন খোজার বাহ্যিক দেহাবয়বও জুহার সঙ্গে মিল দেখা যায়, পাগড়ি, জোব্বা, লম্বা দাড়ি, মাঝারি উচ্চতা এবং গাধার উপস্থিতি দুই দেশের দুই লোক চরিত্রকে একমুখি করে তোলে।
তবে নসরুদ্দিন খোজা তুর্কি সমাজে এসে নতুন মাত্রা লাভ করেছে। তিনি কখনো ইমাম, কখনো কাজি, কখনো শিক্ষক, আবার কখনো কৃষক ও রাখাল। তিনি শহুরে শিক্ষিত মানুষ এবং আনাতোলিয়ার গ্রামীণ মানুষের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করেছেন।
তৈমুর লংয়ের সামনে নসরুদ্দিন খোজা
নসরুদ্দিন খোজার সবচেয়ে বিখ্যাত গল্পগুলোর একটি তার সঙ্গে তৈমুর লংয়ের কথোপকথন।
একবার তৈমুর খোজা জিজ্ঞেস করলেন, আব্বাসী খলিফাদের মতো আলমুতাওয়াক্কিল বিল্লাহ, আলমুতাসিম বিল্লাহ, মুত্তাকি বিল্লাহ ইত্যাদির মতো কোনো উপাধি তার থাকত, তাহলে কী হতে পারত?
খোজা উত্তর দিলো, ‘আউজু বিল্লাহ’ উপাধি তার জন্য সবচেয়ে মানানসই হত।
এখানে হাসির পাশাপাশি একটি রাজনৈতিক ব্যঙ্গ রয়েছে। একজন শাসক নিজের মহত্ত্ব ও ক্ষমতার স্বীকৃতি চান, আর খোজা তার প্রশ্নের উত্তর এমনভাবে দেন যে সেই ক্ষমতার অহংকারই হাসির বিষয় হয়ে যায়।
আরেকটি কাহিনিতে তৈমুর জানতে চাইলেন, মৃত্যুর পর তিনি জান্নাতে যাবেন, নাকি জাহান্নামে?
নসরুদ্দিন খোজা বললেন, এ নিয়ে চিন্তা করার প্রয়োজন নেই; কারণ হালাকু ও চেঙ্গিস খানের মতো মহান শাসকরা যদি জাহান্নামে থাকেন, তাহলে তিনি কি তাদের চেয়ে কম মর্যাদার যে জান্নাতে যাবেন?
এই উত্তর সরাসরি কোনো রাজনৈতিক মতাতম নয়। কিন্তু এর মধ্যে রয়েছে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক ব্যঙ্গ। শাসকের ক্ষমতা, মর্যাদা ও আত্মমুগ্ধতাকে হাসির মাধ্যমে প্রশ্ন করা হয়েছে।
সুলতান বায়েজিদ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
নসরুদ্দিন খোজার কাহিনিতে বায়েজিদের মতো তুর্কি (উসমানি) শাসকদের উপস্থিতিও দেখা যায়। এসব গল্প প্রমাণ করে, জোহা-ধাঁচের চরিত্র শুধু আরব-পারসিক-ইতিহাসের ব্যক্তিদের নিয়ে গল্প তৈরি করেনি; নতুন সমাজে প্রবেশ করে সে সমাজের নিজস্ব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও ঘটনাকে নিজের গল্পের অংশ করে নিয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া কাজ করে। চরিত্রটি একই থাকে, কিন্তু তার চারপাশের পৃথিবী বদলে যায়। আরবের জোহার গল্পে আবু মুসলিম বা খলিফা মাহদির কথা থাকে; তুর্কি সংস্কৃতিতে এসে তৈমুর বা বায়েজিদের গল্প ফুটে ওঠে। ফলে জোহা ও খোজারা স্থির কোনো চরিত্র না হয়ে প্রতিটি সমাজের সঙ্গে নতুন করে জন্ম নিনতে থাকে।
জোহার গাধা : আরব থেকে আনাতোলিয়ার গ্রাম
জোহা ও নসরুদ্দিন খোজার গল্পে গাধার উপস্থিতিও এই সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের গুরুত্বপূর্ণ দিক। একটি গল্পে জোহার খচ্চর তাকে ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছিল। লোকরা তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘জুহা, কোথায় যাচ্ছেন?’
তিনি উত্তর দিলেন, ‘খচ্চরটি যেদিকে যাচ্ছে, আমিও সেদিকে যাচ্ছি।’
হাস্যকর উত্তর হলেও এর মধ্যে মানুষের নিজের সিদ্ধান্ত অন্যের হাতে ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতাকে ব্যঙ্গ করা হয়েছে।
গাধা বা খচ্চর এখানে শুধু প্রাণী নয়; এটি গ্রামীণ জীবন, শ্রম, সরলতা এবং মানুষের সঙ্গে প্রাণীর সম্পর্কের প্রতীক। জোহার পাগড়ি যেখানে জ্ঞান ও সভ্যতার ছায়া ফেলে, গাধা সেখানে গ্রামীণ বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলে। এই দ্বৈততা তাকে একই সঙ্গে শিক্ষিত ও সাধারণ, শহুরে ও গ্রামীণ মানুষের প্রতিনিধি করে।
কেন জোহা পুরো বিশ্বের কাছে প্রাসঙ্গিক
জোহার সর্বজনীনতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় তার গল্পের বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করলে। তিনি রাজাকে নিয়ে রসিকতা করেন, কারণ ক্ষমতার অহংকার সবখানে আছে। তিনি ধনীকে নিয়ে ব্যঙ্গ করেন, কারণ লোভ উপস্থিতি সবখানে বিদ্যমান। তিনি দরিদ্রের দুর্দশা নিয়ে হাসির জায়গা তৈরি করেন, কারণ কঠিন সময়ে হাসির প্রয়োজন সবারিই হয়। তিনি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নিয়ে মজা করেন, কারণ পারিবারিক অশান্তি একটি বহুজাতিক সমস্যা। তিনি মানুষের বোকামি নিয়ে হাসেন, কারণ মানুষ সবখানেই ভুল করে। তাই জুহার গল্পে সামাজিক উপাদানগুলো স্থানীয় হলেও মানবিক উপাদানগুলো সর্বজনীন।
সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে
জোহার গল্পের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো সময়ের অনির্দিষ্টতা। ‘একদিন’, ‘কোনো একদিন’, এ ধরনের সূচনা গল্পকে নির্দিষ্ট ইতিহাসের মধ্যে আটকে রাখে না। তাই খলিফা মাহদির যুগের গল্প আধুনিক পাঠকও বুঝতে পারে। আবু মুসলিমের সময়ের গল্প আজও হাসাতে পারে। তৈমুর লংয়ের সঙ্গে নসরুদ্দিন খোজার কথোপকথন আধুনিক সময়ের ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গেও তুলনা করা যায়। কারণ গল্পের বাহ্যিক চরিত্র বদলায়, কিন্তু ক্ষমতা ও সাধারণ মানুষের সম্পর্কের মৌলিক প্রশ্নটি থেকে যায়। এই কারণে জোহার একটি ‘সামষ্টিক সময়ে’ জোহার উপস্থিতি পাওয়া যায়, যেখানে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ একে অন্যের সঙ্গে মিলে মিশে থাকে।
আরবের জোহা, তুর্কির নসরুদ্দিন খোজা তারপর বিশ্ব
জোহার যাত্রা তাই শুধু একটি চরিত্রের ভৌগোলিক বিস্তার নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক ধারণার বিস্তার। প্রতিটি সমাজ তাকে নিজের মতো করে গ্রহণ করেছে। তার নাম বদলেছে, পোশাক বদলেছে, গল্পের স্থান বদলেছে, শাসকের নাম বদলেছে; কিন্তু তার মৌলিক ভূমিকা বদলায়নি, তিনি মানুষের হয়ে কথা বলেছেন, ক্ষমতাকে হাসির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন এবং জীবনের অসংগতিকে বুদ্ধিদীপ্ত কৌতুকে পরিণত করেছেন। এই অভিযোজনের কারণেই জোহাকে কোনো নির্দিষ্ট সংস্কৃতির সীমানায় আটকে রাখা যায় না। তখন জোহা হয়ে ওঠে সর্বজনীন বিশ্বসংস্কৃতির প্রতীক।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


