খেলাফত রাষ্ট্রে ক্ষমতা হস্তান্তরের নীতি

খলিফা হলেন ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)

খলিফা হলেন ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)

শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। ইসলামের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রাথমিক পর্যায়ে যেভাবে খলিফা ওমরের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়েছিলে, তাতেই রয়েছে এই সমস্যার সর্বোৎকৃষ্ট সমাধান।

ইস্তিখলাফ : খেলাফত রাষ্ট্রে ক্ষমতা হস্তান্তরের নীতি

বিজ্ঞাপন

ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.) কোনো বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেননি এবং নিজের গোত্রের লোকদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেননি। উত্তরসূরি নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি উপদেষ্টা পরিষদের বর্ষীয়ান সদস্য আবদুর রহমান ইবনে আওফ, উসমান ইবনে আফফান, আলি ইবনে আবু তালেব ও তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহর মতো বিশিষ্ট সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন। তাদের কাছে ওমরের যোগ্যতা, মন-মেজাজ ও স্বভাব বিষয়ে মতামত জানতে চেয়েছিলেন। অনেকেই ওমরের কঠোর স্বভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। খলিফা তাদের আশ্বস্ত করেছিলেন। বলেছিলেন, ইসলামের সুরক্ষার জন্যই তার এই কঠোরতা। দায়িত্ব কাঁধে এলে তিনি ভারসাম্য খুঁজে নেবেন। এরপর উপদেষ্টাদের অনুমোদনে খলিফার উত্তরসূরি হিসেবে ওমর (রা.)-কে মনোনীত করা হয়েছিল।

সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার জন্য খলিফা একটি লিখিত সনদ তৈরি করেন। উসমান ইবনে আফফান সনদটি পাঠ করে সবাইকে শোনান। পরবর্তীকালে দুই খ্যাতনামা গবেষক এ ঘটনার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন, যা এই সিদ্ধান্তের গভীরতা বুঝতে সাহায্য করে।

শাহ ওয়ালিউল্লাহ ‘ইজালাতুল খাফা’ গ্রন্থে এ ধরনের ক্ষমতা হস্তান্তরের পদ্ধতিকে ‘ইস্তিখলাফ’ বলেছেন। তার বিশ্লেষণে, এটি কোনো বংশগত উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা নয়; বরং রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জনস্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে বিদায়ি শাসকের পক্ষ থেকে যোগ্যতম উত্তরসূরিকে মনোনয়নের গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া। তার মতে, প্রথম খলিফার নির্বাচন ছিল জনগণের প্রত্যক্ষ সম্মতিনির্ভর রাজনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে, আর দ্বিতীয় খলিফার নির্বাচন ছিল বিদায়ি রাষ্ট্রপ্রধানের সুচিন্তিত মনোনয়ন এবং জনগণের সম্মিলিত অনুমোদনের সমন্বয়ে সম্পন্ন একটি বৈধ ক্ষমতা হস্তান্তর।

একই দৃষ্টিভঙ্গি শিবলী নোমানীও আল ফারুক গ্রন্থে তুলে ধরেছেন। তার মতে, ওমর (রা.)-এর মনোনয়ন কোনো ব্যক্তিগত পছন্দ বা ক্ষমতা হস্তান্তরের নিজস্ব সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং সম্ভাব্য রাজনৈতিক অস্থিরতা এড়িয়ে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা, শাসনব্যবস্থার স্থিতিশীলতা এবং জনকল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গৃহীত একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রনৈতিক পদক্ষেপ।

এই মনোনয়নের যথার্থতা বুঝতে হলে আমাদের দেখতে হবে, দুই খলিফার ব্যক্তিত্বের মধ্যে আসলে কী ধরনের বিদ্যমান ছিল।

বাইয়াত ও খলিফার পক্ষে জনসমর্থন

উপদেষ্টা পরিষদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পরও খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য আরেকটি জরুরি কাজ বাকি ছিল। আর তা হলো সাধারণ বাইয়াত ও জনতার সমর্থন। সেজন্য মসজিদে নববিতে বাইয়াত অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সাধারণ মানুষ দলে দলে এসে সামরিক শক্তিপ্রদর্শন, বলপ্রয়োগ বা মৌখিক কোনো হুমকি ছাড়াই সবাই ওমরকে খলিফা হিসেবে মেনে নেন।

ওমর (রা.) জানতেন, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য শীর্ষ সাহাবিদের সিদ্ধান্ত যথেষ্ট নয়; সাধারণ মানুষের আনুগত্য ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে, বিদ্রোহ ও দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, এই রাষ্ট্রের শৃঙ্খলার জন্য জনগণের বাইয়াত অত্যন্ত জরুরি।

এই বাইয়াত ‘শপথ অনুষ্ঠানে’র মতো জনবিচ্ছিন্ন কোনো আড়ম্বরতা ছিল না। এটি ছিল শাসক ও জনগণের মধ্যে আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এক অবিচ্ছেদ্য চুক্তি। শাসক ধর্মের আইন মেনে চলবেন, ন্যায়বিচার করবেন। আর জনগণ কল্যাণকর্মে তাকে সমর্থন দেবে; শাসক বিপথে গেলে জনগণ জবাবদিহি করতে পারবে।

নারীদের রাজনৈতিক সচেতনতা

এই বাইয়াত অনুষ্ঠানের সবচেয়ে তাৎপর্য ও কার্যকারিতা ছিল নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। সপ্তম শতকে যখন রোম ও পারস্য সাম্রাজ্যে নারীর রাজনৈতিক মতামতকে মূল্যহীন মনে করা হতো, তখন খেলাফত রাষ্ট্রে নারীরা সরাসরি খলিফা নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন এবং আনুগত্যের শপথ করেছিলেন।

খলিফা উমরের ব্যক্তিত্বের কঠোরতা নিয়ে অনেক নারীর মনে দ্বিধা ছিল। এত কঠোর মনের মানুষ কি সাধারণ মানুষের দুঃখ-বেদনা উপলব্ধি করতে পারবেন? এই প্রশ্ন তাদের অনেকের মনেই ছিল। বাইয়াতের সময় তারা সরাসরি খলিফাকে এই প্রশ্ন করেন। ওমর (রা.) ধৈর্য ও একাগ্রতার সঙ্গে তাদের কথা শোনেন এবং আশ্বস্ত করে বলেন, দুর্বল ও সাধারণ মানুষের জন্য তার হৃদয় থাকবে দয়ার্দ্র আর অত্যাচার ও সীমা অতিক্রমণ করলে তিনি হবেন কঠোর।

উমরের শাসনামলে নারীর অধিকার শুধু বাইয়াতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তারা নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও খেলাফত রাষ্ট্রের প্রধানকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করতে পারতেন। একবার খলিফা দেনমোহরের সীমা নির্ধারিত করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে একজন সাধারণ নারী তাকে চ্যালেঞ্জ করেন। খলিফার সামনে কোরআনের দলিল উপস্থাপন করেন। ফলে খলিফাকে জনসমক্ষে নিজের ভুল স্বীকার করতে হয়।

খলিফার প্রথম ভাষণ

দায়িত্ব গ্রহণের পর ওমর (রা.) মিম্বারে দাঁড়িয়ে যে ভাষণ দেন, আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সেটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ শাসননীতির ঘোষণাপত্র। তিনি বলেছিলেন, ‘উপস্থিত লোক সকল! আপনাদের পরিচালনার দায়িত্ব আমার ওপর অর্পিত হয়েছে। আপনারা আবু বকরের যুগে আমাকে কঠোর দেখেছিলেন। এর কারণ ছিল, তার স্বভাবসুলভ কোমলতার সঙ্গে আমার কঠোরতা ভারসাম্য রক্ষা করত। কিন্তু আজ সব দায়িত্ব আমার কাঁধে ন্যস্ত হয়েছে।

জেনে রাখবেন, আমার কঠোরতা কোনো নিরপরাধ, দুর্বল বা নির্যাতিত মানুষের প্রতি নয়; তা শুধু জালেম, সীমালঙ্ঘনকারী ও অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হবে। আমি জালেমের গাল মাটিতে মিশিয়ে দেব, যতক্ষণ না সে সত্য ও ন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ করে। পক্ষান্তরে, দুর্বল ও নিপীড়িত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আমি নিজের গালও মাটিতে রেখে দিতে দ্বিধা করব না।

আমি আপনাদের কাছে অঙ্গীকার করছি, বায়তুল মাল থেকে অন্যায়ভাবে একটি দিরহামও গ্রহণ বা ব্যয় করব না। আপনাদের ন্যায্য প্রাপ্য যথাসময়ে প্রদান করব, সীমান্তে অযথা দীর্ঘকাল অবস্থান করতে বাধ্য করব না এবং আপনারা যখন যুদ্ধক্ষেত্রে থাকবেন, তখন আপনাদের পরিবারের অভিভাবক হিসেবে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আমি নিজেই দায়িত্ব পালন করব।

খলিফা ওমরের এই ভাষণ বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি মাইলফলক।

প্রথমত, খলিফা স্পষ্ট করেন, রাষ্ট্রীয়শক্তি ব্যক্তির ইচ্ছাপূরণের জন্য নয়, বরং এটি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার।

দ্বিতীয়ত, এর মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘কল্যাণ রাষ্ট্রে’র সূচনা হয়, যে রাষ্ট্র নিজের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব মনে করে দুর্বলদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে।

তৃতীয়ত, খলিফা ‘বায়তুল মাল’কে (অর্থ বিভাগ) জনগণের আমানত ঘোষণা করেন। এর মাধ্যমে আর্থিক স্বচ্ছতার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। সর্বোপরি, খলিফা নিজেকে ‘শাসক’ বা ‘প্রভু’ পরিচয়ের বদলে নিজেকে জনগণের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের ওয়াদা করেন।

ক্ষমতার রূপান্তর

ওমর (রা.) নিজের ভূমিকা রূপান্তরের বিষয়টি অত্যন্ত সচেতনভাবে অনুধাবন করেছিলেন। যখন রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন অন্য কেউ—রাসুল (সা.) বা আবু বকর (রা.)—তখন উমরের ভূমিকা ছিল রাষ্ট্রকে রক্ষা করা এবং শাসকের কোমলতাকে নিজের কঠোরতা দিয়ে ভারসাম্য দেওয়া। কিন্তু নিজেই যখন রাষ্ট্রপ্রধান হলেন, তখন কঠোরতা ও কোমলতার সমন্বয় তাকেই একাধারে বহন করতে হলো। ক্ষমতার পরিবর্তন কীভাবে একজন শাসকের ব্যক্তিগত মানসিকতায় নতুন দায়িত্ববোধ তৈরি করে, উমরের এই রূপান্তর তারই এক প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত।

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারের বিখ্যাত সংজ্ঞা অনুযায়ী, রাষ্ট্র মানেই বলপ্রয়োগের বৈধ একচ্ছত্র অধিকার। ওমর (রা.) তার শাসননীতিতে স্পষ্ট করে দেন যে, এই ক্ষমতা ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য নয়—তা পরিচালিত হবে শুধু অন্যায় প্রতিরোধে, দুর্বল ও নিরীহ নাগরিকের অধিকারে সুরক্ষায়। যেখানে নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি বা টমাস হবসের রাষ্ট্রচিন্তায় ক্ষমতাকেই শাসক-প্রজা সম্পর্কের মূল চালিকাশক্তি ধরা হয়, ওমর সেখানে উপস্থাপন করেন এক ভিন্ন দর্শন—দায়িত্ব ও জবাবদিহির রাজনীতি।

এই দর্শনের প্রথম ও সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রয়োগ ঘটে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনে।

প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ

এককেন্দ্রিক শাসনের পরিবর্তে ওমর (রা.) গড়ে তোলেন একটি বিকেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক কাঠামো। সাম্রাজ্য বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রকে মেসোপটেমিয়া, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মিসর ও পারস্যের মতো প্রধান প্রদেশে ভাগ করা হয়। প্রতিটি প্রদেশে গভর্নর (ওয়ালি), রাজস্ব কর্মকর্তা (আমিলুল খারাজ), পুলিশ প্রধান (সাহিবুস শুরতা) ও কাজী নিয়োগের মাধ্যমে প্রশাসনিক দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে বিভক্ত করা হয়।

শাহ ওয়ালিউল্লাহ এই ব্যবস্থাকে ‘ইনতিজামে মুদুন’ বা নাগরের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বলে অভিহিত করেছেন। শিবলী নোমানীর মতে, এর মূল ভিত্তি ছিল জবাবদিহি। প্রতিবছর হজ মৌসুমে সব গভর্নরকে মক্কায় উপস্থিত হয়ে জনগণের অভিযোগের জবাব দিতে হতো। প্রশাসনের এই কার্যকারিতার অন্যতম ভিত্তি ছিল বিচার বিভাগের স্বাধীনতা।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা

ওমর (রা.) বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করেন। বিচারক নিয়োগ দিতেন খলিফা, কিন্তু গভর্নরদের বিচারকাজে হস্তক্ষেপের অধিকার ছিল না।

বাসরার কাজী আবু মুসা আশআরি (রা.)-এর উদ্দেশে প্রেরিত তার নির্দেশনামা ‘ফারুকী জুডিশিয়াল কোড’ নামে পরিচিত। এতে তিনটি মৌলিক নীতি নির্ধারিত হয়েছিল—

১. প্রমাণ উপস্থাপনের দায় বাদীর,

২. বিচারকের কাছে সবাই সমান,

৩. সত্যের স্বার্থে ভুল রায় সংশোধনের সুযোগ থাকবে।

শিবলী নোমানীর মতে, এই নীতিগুলো আধুনিক আইনের সমতা ও ন্যায়বিচারের ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

রাজস্ব ব্যবস্থা ও দেওয়ানের উদ্ভব

ওমর (রা.) বিজিত ভূমি সৈন্যদের মধ্যে বণ্টন না করে রাষ্ট্রের যৌথ মালিকানায় (ফায়) রাখেন। আদি অধিবাসীদের জমিতে বহাল রেখে ন্যায্য খারাজ ও জিজিয়া ধার্য করা হয়। এই বিশাল রাজস্ব পরিচালনার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় ‘দেওয়ান’ (রাষ্ট্রের আর্থিক ও সামরিক রেজিস্ট্রার)। শাহ ওয়ালিউল্লাহর মতে, এটি আধুনিক বাজেট ও পেনশন ব্যবস্থার প্রাচীনতম রূপ। এখান থেকে মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে নির্ধারিত শ্রেণির মানুষ ভাতা পেত।

কল্যাণরাষ্ট্রের ফারুকী তত্ত্ব

হিজরি ১৮ সালের দুর্ভিক্ষ ও মহামারিতে (আমুর রামাদাহ) ওমর (রা.) রাজকোষ থেকে খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করেন এবং সংকটকালীন সময়ে চুরির হদ্দ শাস্তি স্থগিত রাখেন। এটি নাগরিক সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।

তার বিখ্যাত উক্তি— ফোরাত নদীর তীরে একটি কুকুরও যদি ক্ষুধায় মারা যায়, তবে তার জন্যও তিনি আল্লাহর কাছে জবাবদিহির আশঙ্কা করেন, এটা প্রমাণ করে যে তার রাষ্ট্রচিন্তায় শাসকের দায়িত্ব শুধু মানুষের নয়, সমগ্র সমাজ ও জীবজগতের কল্যাণ নিশ্চিত করা।

জনগণের আস্থা ও শাসক-শাসিতের সম্পর্ক

ওমর (রা.) জনগণের ভয় ও অনিশ্চয়তা দূর করে শাসক ও শাসিতের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, প্রশাসনিক কঠোরতা ও জনগণের প্রতি মমতা পরস্পরবিরোধী নয়; বরং এই দুইয়ের ভারসাম্যই সফল রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি।

ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে জিরো টলারেন্স

ওমর (রা.) গভর্নরদের সম্পদের হিসাব সংরক্ষণ করতেন এবং অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধি হলে তা বায়তুল মালে জমা নেওয়া হতো। বিলাসিতা, দ্বাররক্ষী রেখে জনগণকে দূরে সরিয়ে রাখা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল।

প্রতিবছর হজ মৌসুমে তিনি উন্মুক্ত দরবারে গভর্নরদের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনতেন। ‘আস-আস’ নামে নৈশপ্রহরী ব্যবস্থা চালু করেন এবং নিজেও ছদ্মবেশে নগর পরিদর্শন করতেন। এক শিশুর কান্নার ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি জন্মের পর থেকেই শিশুদের জন্য রাষ্ট্রীয় ভাতা চালুর নির্দেশ দেন।

পররাষ্ট্রনীতি

ওমর (রা.)-এর আমলে ইসলামি রাষ্ট্র ভারত মহাসাগর থেকে উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। যদিও কিছু আধুনিক ইতিহাসবিদ এসব অভিযানকে সাম্রাজ্যবাদী সম্প্রসারণ হিসেবে দেখেন, শিবলী নোমানী ও শাহ ওয়ালিউল্লাহর মতে এগুলোর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা। পারস্য বিজয়ের পর আরো আগে অগ্রসর হওয়ার প্রস্তাবও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন এবং সীমান্তে শান্তিপূর্ণ ভারসাম্য বজায় রাখার নীতি গ্রহণ করেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন