দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিকে সচল রাখতে আইনশৃঙ্খলার দৃশ্যমান উন্নয়ন এবং চাঁদাবাজি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার জোরালো দাবি জানিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। দাবি বাস্তবায়ন না হলে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা।
সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে ‘বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নবগঠিত সরকারের নিকট ডিসিসিআইর প্রত্যাশা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে অর্থনীতি ও বাণিজ্যের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদ।
তাসকিন আহমেদ বলেন, আমাদের রক্তে রক্তে চাঁদাবাজি ঢুকে গেছে। ফ্যাক্টরিতে ট্রাক ঢুকতে চাঁদা দিতে হয় আবার বের হতেও চাঁদা দিতে হয়। পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে, যার ফলে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত রাস্তায় নামতে বাধ্য হচ্ছে।
দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও অনিয়ম কমেনি; বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিস্তৃতি পেয়েছে। পুলিশ, প্রশাসন, আয়কর দপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতার অভাব স্পষ্ট। এসব সমস্যার অবসান না হলে অর্থনৈতিক লক্ষ্যে পৌঁছানো কঠিন হবে।
ডিসিসিআই জানায়, চাঁদাবাজি ও অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের কারণে ব্যবসার ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে, ফলে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে। সংগঠনটির মতে, উৎপাদক পর্যায়ে স্বল্প দামে পণ্য বিক্রি হলেও অবৈধ আদায় ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে বাজারে ভোক্তাদের বহুগুণ বেশি অর্থ গুনতে হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে সরকারের কাছে চারটি প্রধান দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো— দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কার্যকর উন্নয়ন, চাঁদাবাজি নির্মূল, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করা এবং বিনিয়োগবান্ধব আর্থিক নীতি প্রণয়ন। পাশাপাশি ইচ্ছাকৃত নয় এমন ঋণখেলাপিদের পুনঃঅর্থায়নের মাধ্যমে ব্যবসায় ফেরানো এবং ব্যাংক ঋণের সুদহার সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার আহ্বান জানানো হয়।
রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার প্রসঙ্গে তাসকিন আহমেদ বলেন, কর কাঠামো জটিল হওয়ায় কর-জিডিপি অনুপাত কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ছে না। এ জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পৃথকীকরণ ও দ্রুত অটোমেশন প্রয়োজন। কার্যকর উদ্যোগ নিলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব।
বিনিয়োগ সহজীকরণের বিষয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থা কার্যকর করার তাগিদ দেন ডিসিসিআই সভাপতি। তাঁর মতে, অতিরিক্ত কাগজপত্র ও দীর্ঘসূত্রতা উদ্যোক্তাদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শ্রমবাজার পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় সংবাদ সম্মেলনে। ডিসিসিআই জানায়, দেশে প্রায় ২৬ লাখ মানুষ কর্মহীন অবস্থায় রয়েছে। কারিগরি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বেসরকারি খাত শক্তিশালী করা গেলে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং চাঁদাবাজির প্রবণতাও ধীরে ধীরে কমে আসবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক ইস্যুতে বেসরকারি খাতের একাধিক অনুরোধ সত্ত্বেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাড়াহুড়ো করে যুক্তরাষ্ট্রপন্থি চুক্তি সই করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। চুক্তিটি পুনর্বিবেচনার তাগিদ দিয়ে ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মাধ্যমে চুক্তিটি অবৈধ ঘোষণা হলে ভালো, নতুবা নতুন সরকারকে দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
রপ্তানি বৈচিত্র্য বাড়ানোর লক্ষ্যে চামড়া, হালকা প্রকৌশলসহ মোট ৩০টি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে উন্নয়নের ওপর জোর দেয় সংগঠনটি। ডিসিসিআই নেতারা মনে করেন, এসব খাতে পরিকল্পিত সহায়তা দিলে অর্থনীতিতে গতি আসবে এবং উদ্যোক্তাদের আস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে। সংবাদ সম্মেলনে ডিসিসিআইয়ের অন্যান্য নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

