বগুড়ায় আধুনিক কসাইখানা

উদ্বোধনের তিন মাসেও শুরু হয়নি কার্যক্রম

উদ্বোধনের তিন মাসেও শুরু হয়নি কার্যক্রম

বগুড়ায় আধুনিক কসাইখানা উদ্বোধনের তিন মাস হতে চলল। তবে এখনো কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি । লক্ষ্য ছিল যত্রতত্র পশু জবাই, সনদবিহীন অনিরাপদ পশুর মাংস যেখানে-সেখানে বিক্রি রোধ করা। পরিবেশদূষণ ও মাংস ব্যবসায়ীদের সময় সাশ্রয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরুর জন্য এখনো দরপত্র আহ্বান করা হয়নি, নিয়োগ করা হয়নি লোকবল। ফলে নির্ধারিত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কার্যক্রমে যেতে পারেনি জেলার এ আধুনিক কসাইখানা। তবে অল্প সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু করতে পারবেন বলে জানান বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক।

এদিকে বগুড়াবাসীর প্রত্যাশা আধুনিক কসাইখানাটি দ্রুত চালু হলে নিরাপদ ও হালাল মাংস পাওয়ার ব্যাপারে অস্বস্তি কাটবে তাদের। গত ১৭ মে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বগুড়া মহানগরীর জয়পুরপাড়ায় নবনির্মিত আধুনিক জেলা কসাইখানার উদ্বোধন করেন। প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে এ আধুনিক কসাইখানা নির্মাণ করা হয়। উদ্বোধনের পর এটি বগুড়া সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

বিজ্ঞাপন

বগুড়া জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রণালয়ের ‘লাইভস্টক অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পের মাধ্যমে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে কসাইখানাটি নির্মাণ করা হয়। বগুড়া মহানগরীর জয়পুরপাড়ায় ৫০ শতক জমির ওপর নির্মিত এ কসাইখানায় প্রতি ঘণ্টায় ১৫টি গরু এবং ৩০টি ছাগল বা ভেড়া জবাই ও মাংস প্রস্তুত করা যাবে। এতে যত্রতত্র পশু জবাইয়ের কারণে সৃষ্ট পরিবেশদূষণ কমবে এবং মাংস ব্যবসায়ীদের সময় ও শ্রম সাশ্রয় হবে।

বগুড়া জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. কাজী আশরাফুল ইসলাম জানান, ২০২৪ সালের ১৮ মার্চ কসাইখানার নির্মাণকাজ শুরু হয়। কয়েক দফা মেয়াদ বৃদ্ধির পর ঠিকাদার চলতি বছরের ৩০ মার্চ কাজ সম্পন্ন করেন। বর্তমানে এটি বগুড়া সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে লোকবল নিয়োগ না হওয়ায় কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

বগুড়া সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু হেনা বলেন, আধুনিক কসাইখানাটি আমরা বুঝে নিয়েছি। লোকবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের পর এটি চালু করা হবে। এখানে গরু ও ছাগল জবাই এবং মাংস প্রস্তুত করা হবে। তিনি জানান, কসাইখানায় আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা রয়েছে। ফলে পরিবেশদূষণের কোনো শঙ্কা থাকবে না। এটি পরিচালনায় প্রতিদিন ২৫-৩০ হাজার টাকা ব্যয় হবে এবং মাস এ খরচ দাঁড়াবে সাত লাখ থেকে ৯ লাখ টাকা।

প্রতিটি গরু ও ছাগল জবাই ও মাংস প্রস্তুত করার খরচ সম্পর্কে তিনি বলেন, এ খরচ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। ৩০টি গরু প্রস্তুত করা গেলে প্রতিটির চার্জ পড়বে ১,০০০ টাকা। এখানে কয়েক ধাপে গরু জবাই ও মাংস প্রস্তুত করা হবে।

স্থানীয় বাসিন্দারা আধুনিক কসাইখানা চালু হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেন। তারা বলেন, এতদিন বিভিন্ন এলাকায় রাতের আঁধারে বা ভোরে অসুস্থ পশু জবাই করে তা ভালো মাংস হিসেবে বিক্রি করা হতো। এখন এ ধরনের অনিয়ম কমবে এবং ভোক্তারা নিরাপদ মাংস পাবেন।

বগুড়া শহরের কলোনি এলাকার মিনহাজ রাব্বী ও আব্দুল্লাহ ইবনে আজিজ বলেন, শহরের যত্রতত্র স্যানিটারি ইন্সপেক্টরের সনদবিহীন পশু জবাইয়ের পর ব্যবসায়ীরা রাস্তার মোড়ে মোড়ে দোকান বসান। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এদের সিটি করপোরেশনের আয়তায় এনে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বগুড়া শহরের ১০টি বাজারের কোনোটিতে কসাইদের নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থায় নেই। ফলে ক্রেতা সাধারণকে মানহীন পশুর মাংস কিনতে হচ্ছে।

বনানী সুলতানগঞ্জ হাটের ভেতর বসবাসকারী আব্দুল বারী জানান, প্রতি হাটে এখানে ১০-১২টি গরু জবাই করা হয়। এদের বর্জ্য করোতোয়া নদীতে ফেলা হয়। প্রতিদিনই দেখি সম্পূর্ণ মানহীন, রুগ্ণ পশু জবাই করা হয়। এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের স্যানিটারি বিভাগে যোগাযোগ করা হলেও তারা মুখ খুলতে নারাজ। তবে তারা জানান, আগামী দিনে লোকবল বাড়লে এসব নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

বগুড়া শহরের কলোনি বাজার, বকশীবাজার, খান্দার বাজার, কলেজ বাজার, কালীতলা বাজার, সেউজগাড়ী আমতলা বাজার, বউবাজারসহ ১০টি বাজার রয়েছে। এছাড়া শহরতলীর মহাস্থান হাট, বাঘোপাড়া, ভবের বাজার, তিনমাথা রেলগেট, বনানী, ফুলতলা, রানীরহাট, শাকপালা, সাবগ্রাম, চেলোপাড়া, নামাজগড়ে কমপক্ষে ২০০টি দোকান রয়েছে। এর অধিকাংশই ভ্রাম্যমাণ বাজার।

সরেজমিন দেখা যায়, এসব মাংস বিক্রেতাদের অধিকাংশই পাইকারি কিনে এনে ক্রেতাদের মধ্যে বিক্রি করেন। তাদের তথ্য অনুযায়ী ক্যান্টনমেন্ট, মাদলা, পেরিরহাট, সাবগ্রাম, মহাস্থান, বাঘোপাড়া থেকে পাইকারি মাংস কিনে এনে তারা বিক্রি করেন। সেক্ষেত্রে তারা জানেন না কী পশু তারা জবাই করেছে। বছরের পর বছর ক্রেতারাও জানেন না, তারা বিক্রেতার কাছ থেকে কী কিনছেন—এমন অভিযোগ সর্বত্র।

পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিদিন গড়ে ৩০০ গরু ও ২০০ ছাগল জবাই হয়। সাবেক বগুড়া পৌরসভার ৫০ জন মাংস বিক্রেতার তালিকা থাকলেও এ সংখ্যা হালনাগাদ করা হয়নি। গরুর মাংস বিক্রেতা কলোনি বাজারের সুজন, রফিকুল ও আজাহার বলেন, ‘সরকার যদি আধুনিক কসাইখানার ব্যবস্থা করে, তবে আমরা সেখান থেকেই পশু জবাইয়ে কাজ করতে আগ্রহী।’

নিরাপদ খাদ্য নিয়ে কাজ করা ভোক্তা অধিকার কর্মকর্তা মো. সুজন বলেন, বিষয়টি নিয়ে অবশ্যই আমরা জেলায় কাজ করব এবং নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখব। এজন্য আগে তালিকা প্রণয়ন জরুরি।

সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী রেজাউল করিম বলেন, ‘খুব দ্রুত দরপত্র আহ্বান করা হবে। ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষ হয়েছে। তিনি বলেন, বগুড়ার রাস্তাঘাট, হাটবাজারের কসাইদের তালিকা করা হচ্ছে। এদের নিয়ন্ত্রণে আমরা কাজ করব।’

বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এমআর ইসলাম স্বাধীন আমার দেশকে বলেন, চলতি মাসের মধ্যেই নবনির্মিত এ কসাইখানার কার্যক্রম শুরুর সম্ভাবনা রয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন