রংপুরে গণপতি পরিবার হত্যাকাণ্ড: ঘাতকদের বর্ণনায় খুনের হাড়হিম বিবরণ

রংপুরে গণপতি পরিবার হত্যাকাণ্ড: ঘাতকদের বর্ণনায় খুনের হাড়হিম বিবরণ

রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও নগরীর মাছুয়াপাড়ার বাসিন্দা গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চারজনকে শ্বাসরোধে হত্যার রোমহর্ষক বিবরণ দিয়েছে গ্রেপ্তার দুই ঘাতক। তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উঠে এসেছে, ইয়াবা সেবনের সময় গৃহকর্তা গণপতি দেখে ফেলায় একে একে পরিবারের সবাইকে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডকে ডাকাতি হিসেবে চালাতে বাড়ির স্বর্ণালংকার ও টাকা লুট করে চম্পট দেয় মাদকাসক্ত সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস।

বৃহস্পতিবার মামলার সার্বিক পরিস্থিতি ও তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে ব্রিফিংয়ে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি) কমিশনার আব্দুল মাবুদ জানান, গ্রেপ্তার মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ আদালতে জবানবন্দিতে জানিয়েছে, চারজনের মধ্যে গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও মেয়েকে বাড়ির ছাদেই হত্যা করা হয়। পরে গণপতির লাশ টিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। তার স্ত্রী ও মেয়ের লাশ ছাদের সিঁড়ির গেটের আড়ালে রাখা হয়, যাতে পাশের বাড়ির ছাদ থেকে সহজে দেখা না যায়।

বিজ্ঞাপন

আরএমপি কমিশনার বলেন, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ জানায়, গত ২০ আগস্ট রাত ১২টার পর সে ইয়াবা নিয়ে অপর আসামি মুগ্ধসহ তাদের বন্ধু সীমান্তের বাসায় যায়। সেখানে তারা তিনটি ইয়াবা সেবন করে। রাত ৩টার দিকে আরো ইয়াবা খাওয়ার ইচ্ছা হলে ইয়াবা ব্যবসায়ী শান্তকে ফোন দিয়ে আরো চারটি ইয়াবা চায়। এরপর তারা গণপতির বাসার ছাদে যায়। শিক্ষক গণপতির ছাদের চারদিকে অর্ধেক দেয়াল থাকায় বাইরে থেকে দেখা যেত না। বাসার ছাদে পানির ট্যাংকের আড়ালে বসে তারা ইয়াবা সেবন করতে থাকে। একপর্যায়ে ভোরের আলো ফুটে যায়। সে রাতে তারা দুজন আটটি ইয়াবা সেবন করেছিল। সকালে গণপতি স্যার ছাদে হাঁটতে এসে তাদের দেখে ফেলেন এবং ধমক দিয়ে বলেন, ‘তোরা এত সকালে এখানে কী করিস?’

জবানবন্দির বরাত দিয়ে আরএমপি কমিশনার বলেন, তখন মানসম্মানের ভয়ে তাদের মাথা কাজ করছিল না। শিক্ষক গণপতিকে চিল্লাচিল্লির সুযোগ না দিয়ে তারা দুজন তাকে ধরে ফেলে এবং ধস্তাধস্তি হয়। তার ঘাড়ে থাকা গামছা দিয়ে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দুদিক থেকে টান মেরে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। তার লাশ টিন দিয়ে ঢেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় সম্ভবত শব্দ পেয়ে স্ত্রী ও মেয়ে ছাদে চলে আসেন। তারা দু-তিনবার চিৎকার দিলে মুগ্ধ শিক্ষক গণপতির স্ত্রীর গলা এবং সিদ্ধার্থ মেয়ের গলা চেপে ধরে। পাঁচ মিনিটের মতো ধস্তাধস্তির পর তারা দুজনকে মেরে ফেলে। সিদ্ধার্থ এক হাতে মেয়ের গলা ও অন্য হাতে মুখ চেপে ধরেছিল। মুগ্ধ স্যারের স্ত্রীকে মারার পর দুজন মিলে গামছা দিয়ে আবার মেয়ের গলায় প্যাঁচ দেয়। তাতেও মেয়ে না মরলে পাশের কবুতরের খাবার রাখার বক্স থেকে রশি এনে মেয়ের গলায় পেঁচিয়ে দুদিক থেকে টান দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে।

বাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা আছে কি না সে ভয়ে সিদ্ধার্থ ছাদ থেকে নিচে নেমে পুরোনো প্লায়ার্স দিয়ে বিদ্যুতের তার কেটে দেয়, যাতে সিসিটিভি থাকলে ডিসকানেক্ট হয়ে যায়। তখন মুগ্ধ ছাদে ছিল। এরপর সিদ্ধার্থ আবার ছাদে ফিরে যায় এবং দুজনে মিলে মা-মেয়ের লাশ ছাদের গেটের ভেতরের সিঁড়ির দিকে এমনভাবে রাখে যেন পাশের ছাদ থেকে দেখা না যায়।

এরপর তারা দোতলায় শিক্ষকের রুমে ঢোকে। তখন ১২ বছর বয়সি ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী ঘুম থেকে উঠে আসামি সিদ্ধার্থকে দেখে বলে ওঠে ‘সিদ্ধার্থ দা, তুমি এখানে কেন?’ তখন তারা তাকে পেটিকোট দিয়ে গলা পেঁচিয়ে মেরে ফেলে।

এরপর আসামিরা খুব ক্লান্ত হয়ে বাথরুমে গিয়ে গায়ে-মাথায় পানি ঢালে এবং তাদের কাছে থাকা আরো একটি ইয়াবা সেবন করে। ডাকাতি বা চুরির নাটক সাজাতে মুগ্ধর বুদ্ধিতে তারা ঘরের আলমারি, ড্রয়ার, জামাকাপড় ও খাতা-বই ওলটপালট করে। মুগ্ধ স্বর্ণালংকার এনে দিলে সিদ্ধার্থ তা প্লাস্টিকের বাক্সে ও কাপড়ের প্যাকেটে ঢোকায়। ঘরে তারা ১৫ হাজার টাকা নগদ পায়।

জুমার নামাজের সময় রাস্তায় মানুষের চলাচল কমে গেলে তারা শিক্ষক গণপতির ছাদ হয়ে পাশের বাড়ির ছাদ দিয়ে দেয়াল টপকে বেরিয়ে যায়। মুগ্ধ ১৫ হাজার টাকা নিয়ে যায়। আর সিদ্ধার্থ স্বর্ণের ব্যাগ নিয়ে গলির ভেতর দিয়ে নিজের বাসায় চলে যায়। ওই সন্ধ্যায় সবার অগোচরে সিদ্ধার্থ স্বর্ণের ব্যাগটি তার পূর্ণিমা কাকির বাসার পেছনের মাটিতে পুঁতে রাখে।

অপর আসামি মুগ্ধর স্বীকারোক্তির সারসংক্ষেপও প্রায় একই রকম উল্লেখ করে আরএমপি কমিশনার বলেন, আসামি মুগ্ধকে তিন কিলোমিটার দূরের এক শ্মশান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেখানে পালিয়ে গিয়ে কেয়ারটেকার বিদ্যুৎ দাসের কাছে পানি ও আশ্রয় চেয়ে সে স্বীকার করে, ‘দাদা, আমাকে পানি ও আশ্রয় দাও। আমি আর সিদ্ধার্থ মিলে গণপতি স্যারসহ চারজনকে খুন করে এসেছি।’ কিন্তু বিদ্যুৎ তাকে আশ্রয় দেয়নি। এর পরপরই পুলিশ পৌঁছে মুগ্ধকে গ্রেপ্তার করে। বিদ্যুৎ আদালতে ১৬৪ ধারায় সাক্ষ্য দিয়েছে।

পুলিশ কমিশনার বলেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। তিনি আরো বলেন, হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধর ডোপ টেস্ট ও ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার প্রক্রিয়া চলছে। আদালতের অনুমতি নিয়ে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা হচ্ছে। নিহত আগামী চক্রবর্তী ও প্রীতিলতা চক্রবর্তীর লাশের ভ্যাজাইনাল সোয়াব সংগ্রহ করা হয়েছিল। পরীক্ষায় ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। গলায় শ্বাসরোধ বা ফাঁস লাগার ঘটনায় লাশ থেকে বীর্য ও মলমূত্র বের হয়ে আসতে পারে। এটি বাইরের বীর্য নয়, লাশের ভেতর থেকেই বের হয়। একইভাবে গলায় ফাঁস লাগলে চোখ কিছুটা বেরিয়ে আসার মতো শারীরিক পরিবর্তনও ঘটতে পারে বলে জানান তিনি।

গত বুধবার রাতে সিদ্ধান্তের ভাই পার্থ দাস অভিযোগ করে বলেছিলেন, বাড়ির আলামত নষ্ট করার জন্য পুলিশ পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করেছে। তার এ দাবির বিষয়ে আরএমপির গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) উপকমিশনার (ডিসি) সনাতন চক্রবর্তী বলেন, বাড়িতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ আলামত আগেই সংগ্রহ করা হয়েছে এবং পানি দিয়ে কোনো আলামত ধুয়ে ফেলার ঘটনা ঘটেনি। সেখানে নিরাপত্তার জন্য পুলিশ রয়েছে। এগুলো বলে মামলা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা মাত্র।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন