জাতীয় ভাবধারা ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দায়িত্বশীল আচরণ, তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং গুজব প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীরা। তারা বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের কল্যাণ, পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনের জন্য ব্যবহার করতে হবে; বিভেদ, বিদ্বেষ ও সংঘাত সৃষ্টির মাধ্যম হিসেবে নয়।
‘জাতীয় ভাবধারাপন্থী ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে উৎসাহ প্রদান (জাতীয় ভাবধারাবিরোধী অপসংস্কৃতি প্রতিরোধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি)’ বিষয়ক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
সেমিনারে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলম এবং বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্টস এসোসিয়েশনের সভাপতি এ. কে. এম মহসীন। অংশগ্রহণ করেন দৈনিক দেশ রূপান্তরের বিশেষ প্রতিনিধি রেজাউল করিম লাভলু, দৈনিক নয়া দিগন্তের চিফ ফটো জার্নালিস্ট নাসিম শিকদার এবং দৈনিক সময়ের আলোর ডেপুটি চিফ রিপোর্টার রফিক রাফী।
সেমিনারে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলম বলেন, রাষ্ট্রের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি দেশের নাগরিকদের দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধের ওপর নির্ভরশীল। দেশীয় লোকজ সংস্কৃতির চর্চা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং দেশের ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতির সুষ্ঠু চর্চা জাতীয় ভাবধারা গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও শিল্প-সাহিত্যের প্রচার করা প্রয়োজন। জাতীয় গণতান্ত্রিক চেতনা বিকাশে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। টেলিভিশন, রেডিও ও পত্রপত্রিকার সংবাদ ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের সংস্কৃতি ও নাগরিকদের পরিচয় তুলে ধরা হয়। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, যেন কোনো ধরনের বিদ্বেষমূলক আচরণ প্রকাশ না পায়।
বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্টস এসোসিয়েশনের সভাপতি এ. কে. এম মহসীন বলেন, গণতান্ত্রিক ও নিজস্ব দেশীয় সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যের চর্চা বাড়াতে হবে। কৃষিতে গণতন্ত্রের বিকাশে গ্রামাঞ্চলের কৃষকদের পুঁজি বিনিয়োগ ও চিন্তা-চেতনার পরিবর্তনের পাশাপাশি দরিদ্র শ্রেণির দুর্বিষহ জীবন দূর করতে সমাজের সব শ্রেণির মানুষের ইতিবাচক ভূমিকা রাখা জরুরি।
তিনি বলেন, আমাদের অতীত ইতিহাস—১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস—চর্চার মাধ্যমে ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে সমাজের জীবনধারায় প্রতিফলিত করা আবশ্যক। উগ্রবাদী চিন্তাধারা পরিহার করে জাতীয় স্বার্থে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও সংস্থাগুলোকে পরমসহিষ্ণুতার সঙ্গে সবার মতামতকে শ্রদ্ধার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
পাশাপাশি দেশের নাগরিকদের স্বার্থে পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনকারী সাংবাদিকদের কল্যাণে এমন কার্যকর ভূমিকা রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি, যাতে তাঁদের আত্মমর্যাদাবোধ অক্ষুণ্ণ থাকে।
দৈনিক দেশ রূপান্তরের বিশেষ প্রতিনিধি রেজাউল করিম লাভলু বলেন, আমরা বর্তমানে প্রায়শই অসহিষ্ণু আচরণ প্রদর্শন করছি, যা কাম্য নয়। এর ফলে জাতীয় ভাবধারায় গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
তিনি দেশের সব নাগরিকের প্রতি তথ্যের সত্যতা ও নির্ভরযোগ্যতা যাচাই বা ফ্যাক্ট-চেকিং না করে কোনো সংবাদ জনগণের সামনে উপস্থাপন করা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানান।
দৈনিক নয়া দিগন্তের চিফ ফটো জার্নালিস্ট নাসিম শিকদার বলেন, দেশের সাংবাদিকদের জাতীয় ভাবধারা ও সংস্কৃতি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। গণতান্ত্রিক চর্চা ও সঠিক সামাজিক সংস্কৃতি তুলে ধরা দেশের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। সামাজিক দায়বদ্ধতার পাশাপাশি জাতীয় গণতন্ত্র রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা একান্ত কাম্য।
দৈনিক সময়ের আলোর ডেপুটি চিফ রিপোর্টার রফিক রাফী বলেন, বর্তমান সময়ে রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক ও সামাজিক সংস্কৃতির প্রভাব কম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের বক্তব্য ও উপস্থাপনায় সামাজিক সংস্কৃতির যথাযথ প্রতিফলন না থাকায় জনদুর্ভোগের সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, দেশের সাংবাদিকদের মধ্যে যাচাই-বাছাই করে যাঁদের কল্যাণ অনুদান প্রদান করা হয়, তাঁদের গেজেটভুক্ত তালিকার মতো বার্ষিক কার্যক্রমের প্রকাশনা প্রকাশ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি টেলিভিশন ও পত্রিকার সাংবাদিকদের সঙ্গে মোবাইল সাংবাদিকদের কার্যক্রমের পার্থক্য বিবেচনায় পৃথক নীতিমালা প্রণয়ন করা হলে দেশের জাতীয় ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম আরও সুন্দরভাবে এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে উপস্থাপন করা সম্ভব।
সেমিনারের সঞ্চালক ট্রাস্টের উপপরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) এ বি এম রফিকুল ইসলাম বলেন, ডিজিটাল মাধ্যমে দেশীয় সংস্কৃতির চর্চা এবং অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও শিল্প-সাহিত্যের প্রচারে দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন। পাশাপাশি দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা জরুরি।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল বাছির। তিনি বলেন, সমাজে বৈচিত্র্য স্বাভাবিক। বিভিন্ন সমাজ, মত ও পেশার মানুষের ভিন্ন ভিন্ন আদর্শ ও মতামত ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশ পায়। ফলে চিন্তা, চেতনা, বিশ্বাস, মতামত ও আচরণে পার্থক্য দেখা যায়, যা কখনো কখনো সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বিনষ্ট করতে পারে।
তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের কল্যাণ ও পারস্পরিক সম্প্রীতি বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করা জরুরি। ডিজিটাল মাধ্যমে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সমাজের সব মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পারিবারিক ও নৈতিক শিক্ষা জোরদার করতে হবে। সুস্থ ও গঠনমূলক সংস্কৃতি প্রচারে গণমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে।
সেমিনারে সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল শিষ্টাচার, তথ্য যাচাই এবং গুজব প্রতিরোধের বিভিন্ন কৌশল তুলে ধরা হয়। বক্তারা সংবাদের শিরোনাম ও মূল বিষয়ের মধ্যে অসামঞ্জস্য, চটকদার ভাষা বা ক্লিকবেইট, তথ্যসূত্রের অনুপস্থিতি কিংবা ভুয়া সূত্র এবং ঘৃণামূলক ও পক্ষপাতদুষ্ট শব্দ ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন।
কোনো তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা শেয়ার না করে বিশ্বস্ত ও মূলধারার গণমাধ্যমের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা এবং নির্ভরযোগ্য ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তথ্যের সত্যতা যাচাই করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সন্দেহজনক তথ্য দেখা গেলে তা রিপোর্ট করে অন্যদের সচেতন করার আহ্বান জানানো হয়।
এ ছাড়া মন্তব্য ও পোস্টে কুরুচিপূর্ণ শব্দ ব্যবহার থেকে বিরত থেকে শালীনতা বজায় রাখা, কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে অবশ্যই তার সত্যতা যাচাই করা এবং আবেগের পরিবর্তে তথ্য ও যুক্তির ভিত্তিতে মত প্রকাশের পরামর্শ দেওয়া হয়। ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা ও সম্মান বজায় রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।
সেমিনারে তরুণদের জন্য ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির অবস্থান তৈরি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার প্রতিফলনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। পরিবারের শিশুদের নৈতিক ও যুক্তিযুক্ত উপস্থাপনা এবং বৈষম্যহীন মানসিক বিকাশের জন্য পারিবারিক শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
বক্তারা বলেন, সাহিত্যচর্চা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তরুণদের সম্পৃক্ত করা হলে তাঁদের মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চা, সৃজনশীলতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি পাবে।
সেমিনারে সমাজের সব মানুষের মধ্যে জাতীয় গণতান্ত্রিক ও ভাবধারাপন্থী কার্যক্রম প্রতিফলনের লক্ষ্যে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরা হয়। বিভিন্ন মত, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থানের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখতে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা এবং সম্পর্ক বিবেচনা করে আচরণ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। কথায় কথায় অন্যের ধর্ম, লিঙ্গ, জাতি বা শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও পরিচয়কে সামনে না আনার পরামর্শ দেওয়া হয়।
বক্তারা বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় না রাখতে পারলে ডিজিটাল মাধ্যম কিংবা বাস্তব জীবনে কোথাও স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব নয়। বিশেষ করে ডিজিটাল মাধ্যমে আরও সচেতন থাকা প্রয়োজন, কারণ সেখানে মানুষ একে অপরকে সামনাসামনি দেখেন না। তাই মন্তব্য ও আচরণের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রেখে সমাজকে আরও সুন্দরভাবে গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।
সেমিনারে সামগ্রিকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তন, জাতীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বিকাশ, গণতান্ত্রিক চেতনা এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি বৃদ্ধির কাজে ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


