বর্জ্যকে আর বোঝা হিসেবে দেখা উচিত নয় বরং বাংলাদেশের জন্য এটিকে সম্পদ, শক্তি ও অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তর করা উচিত। বাংলাদেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন সমন্বিত, কম খরচের ও স্থানীয়ভাবে পরিচালনাযোগ্য সমাধান।
রোববার বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)র উদ্যোগে জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিকমিয়া হলে বাংলাদেশের পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: সমস্যা, চ্যালেঞ্জ ও টেকসই সমাধানের রূপরেখা শীর্ষক এক সেমিনার বক্তারা এ কথা বলেন।
বাপার সভাপতি অধ্যাপক ড. নুর মোহাম্মদ তালুকদারের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক জনাব মো. আলমগীর কবির এর সঞ্চালনায় সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও বাপার আজীবন সদস্য, ড. নাসির উদ্দীন খান, এবং স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাপার সহ-সভাপতি, মহিদুল হক খান।
মূল প্রবন্ধে ড. নাসির উদ্দীন খান বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মূলত কালেক্ট-ট্রান্সপোর্ট -ড্রাম্প নির্ভর। ফলে বর্জ্যের পুনর্ব্যবহার, সম্পদ পুনরুদ্ধার ও জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে না এবং বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উন্মুক্ত স্থানে, জলাভূমি ও জলাশয়ে গিয়ে পড়ছে। এর ফলে পরিবেশ ও অর্থনীতির ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ তৈরি হচ্ছে। বর্তমান ব্যবস্থার কারণে মিথেন নির্গমন, নদী ও জলাশয় দূষণ, নদীর তলদেশ ভরাট, জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ, ডেঙ্গু ও অন্যান্য জনস্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে মূল্যবান নগরভূমির অপচয়, পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যয় বৃদ্ধি এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ, জ্বালানি, কর্মসংস্থান ও সম্ভাব্য রাজস্ব হারানোর মতো অর্থনৈতিক ক্ষতিও হচ্ছে।
সহজ প্রযুক্তিতে, দেশীয় বিনিয়োগ ও স্থানীয় জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে একটি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তোলা আমাদের লক্ষ্য । এর মাধ্যমে বর্জ্যকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য সম্পদ, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তর করে বাংলাদেশের চলমান গ্যাস ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায়ও একটি অর্থবহ অবদান রাখা সম্ভব হবে।
অধ্যাপক ড. নুর মোহাম্মদ তালুকদার বলেন, বায়োগ্যাস মূলত উনবিংশ শতাব্দীতে চালু হয়েছে জার্মানিতে। কিন্তু সেই বায়োগ্যাস নিয়ে এখনও গবেষণা চলমান। ইউরোপের সলিড ওয়েস্ট আর বাংলাদেশের সলিড ওয়েস্টের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। তিনি দেশের পরিবেশকে সুস্থ্যরাখতে পরিবেশের সাথে সম্পৃক্ত সকল সংস্থার মধ্যে সমন্বয় জরুরী বলে মনে করেন।
অধ্যাপক এম. ফিরোজ আহমেদ বলেন, ঢাকা শহরের সব বাস স্ট্যান্ডগুলো বর্জ্য ডাম্পের উপরে নির্মিত। অনেকেই কার্বন ক্রেডিট পাওয়ার আশায় থাকে। কিন্তু চায়না একেই শতকরা ৬০ভাগ কার্বন ক্রেডিট নিয়ে গেছে। সেকেন্ডারি ডাম্পিংগুলোতে যেন বৃষ্টির পানি না পড়ে তা নিশ্চিত করতে পারলে সেই বর্জ্যগুলো থেকে ভালো জ্বালানী পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
সিটি কর্পোরেশনগুলো যদি বাড়ী বাড়ী গিয়ে ময়লা সংগ্রহ করার টাকা কালেকশন করতে পারে তবে আর্থিকভাবে অনেক লাভবান হবে। বর্জ্যগুলো দিয়ে কম্পোস্ট তৈরি করে এর বাজার তৈরি করতে পারলে একদিকে জৈব সারের ঘাটতি পূরণ হবে অন্যদিকে আর্থিকভাবেও উপকৃত হবে।
নূর আজিজুর রহমান বলেন, ঢাকা শহরে সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকার কারণে একটু বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এই বর্জ্যগুলোকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে আমরা ইতোমধ্যে দক্ষিণকোরিয়ান একটি কোম্পানির সাথে আলাপ আলোচনা করছি। বাস্তবায়নের জন্য আরো সময় ও গবেষণা ও সমীক্ষার প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। তিনি আরো বলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন দেশের বিশেষজ্ঞ ও টেকনোলজিগুলোর সর্বোত্তম ব্যবহারের পরিকল্পনা করছি।
মো. আরিফুর রহমান বলেন, ঢাকা শহরের ড্রেনেজ সিস্টেম ও ইন্টার লিংকগুলো সার্বক্ষণিক পরিষ্কার রাখা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সলিড ওয়েস্টের কারণে। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ওয়েস্ট টু এনার্জি প্রজেক্ট চালুর প্রক্রিয়া হাতে নিয়েছি। এটা পুরো পুরো পুরি চালু হলে প্রতিদিন ৩ হাজার টন ময়লা তারা নিবে। তারা আমাতের কাছে ৩০ একর জমি চেয়েছে। সেখান থেকে ৪২-৪৫ মেগা ওয়ার্ট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে।
স্বাগত বক্তব্যে জনাব মহিদুল হক খান বলেন, দেশের বর্জ্যের ধরণ ও আকার দিন দিন পরিবর্তন হচ্ছে। দেশের সামগ্রিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় রোডম্যাপ তৈরির দাবি জানান তিনি।
আলমগীর কবির বলেন, জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে না; বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উন্মুক্ত স্থান-জলাভূমি ও জলাশয়ে গিয়ে পড়ছে। এর ফলে পরিবেশ ও অর্থনীতির ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ তৈরি হচ্ছে। সাধারণ সম্পাদক জনাব আলমগীর কবির বাংলাদেশের পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার টেকসই সমাধানে নিম্মোক্ত ৬ দফা সুপারিশতুলে ধরেন।
সেমিনারে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক এম. ফিরোজ আহমেদ, বিশিষ্ট পানি বিজ্ঞানী, সহ-সভাপতি বাপা, নূর আজিজুর রহমান, প্রধান প্রকৌশলী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন, মো. আরিফুর রহমান, অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এবং প্রকৌশলী শুভ কিবরিয়া, প্রধান গবেষক, ক্যাব প্রমুখ ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


