ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে অজ্ঞাত হিসেবে ফেলে যাওয়া সেই কিশোরীর পরিচয় মিলেছে। ১৫ বছর বয়সী মিম আক্তার ছিল নারায়ণগঞ্জের একটি বাসার গৃহকর্মী। মৃত্যুর আগে তাকে নির্যাতন করা হয়েছিল বলে পরিবারের অভিযোগ। আর মিমের লাশ হাসপাতালে রেখে পালানোর ঘটনায় এবার গ্রেপ্তার হয়েছেন ওই বাসার গৃহকর্তা, তার স্ত্রী ও শ্বশুর। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তেও উঠে এসেছে, ঘটনার পর নিজেদের আড়াল করতে তারা বাসা ছেড়ে অন্যত্র সরে গিয়েছিলেন।
গ্রেপ্তার তিনজন হলেন—এ বি এম আব্দুর রাজ্জাক (৪৭), মো. ফয়সাল আহমেদ (৩৫) ও রাহেমা খাতুন রেশমা (২৯)।
বৃহস্পতিবার ভোরে রাজধানীর ডেমরা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে শাহবাগ থানা পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশও তিনজনকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অপরাধের বিষয়টি আড়াল করতেই মিমের লাশ ঢামেক হাসপাতালের সামনে রেখে পালিয়েছিল তারা। পরে গ্রেপ্তার এড়াতে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড় এলাকার বাসা ছেড়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অন্যত্র আত্মগোপন করে। প্রযুক্তিগত অনুসন্ধান ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাদের অবস্থান শনাক্তের পর ডেমরায় অভিযান চালানো হয়।
অভাবের সংসার থেকে গৃহকর্মীর জীবন
মিমের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুমিল্লার বাঙ্গরা বাজার থানার আন্দিকুট গ্রামের মৃত ফজলু মিয়া ও শিপন বেগমের মেয়ে মিম। তিন বোনের মধ্যে সে ছিল সবার ছোট। বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারে নেমে আসে চরম অভাব। দুই বোনের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর মিমকে কাজের জন্য নারায়ণগঞ্জে পাঠানো হয়।
মিমের সৎ ভাই আমির হোসেনের ভাষ্য, এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের মাধ্যমে প্রায় এক বছর আগে নারায়ণগঞ্জের এক ব্যবসায়ীর বাসায় গৃহকর্মীর কাজ নেয় মিম। সেখানেই তার জীবনের শেষ অধ্যায় শুরু হয়।
পরিবারের অভিযোগ, ওই বাসায় থাকার সময় মিমকে প্রায়ই মারধর ও নির্যাতন করা হতো। সুযোগ পেলেই মোবাইল ফোনে মায়ের কাছে নির্যাতনের কথা জানাত সে। এমনকি গৃহকর্তা ফয়সাল আহমেদের কাছে বিষয়টি জানালে উল্টো মিমের মাকে বকাঝকা ও হুমকি দেওয়া হতো বলে পরিবারের দাবি।
‘মেয়েকে নিতে গিয়েছিলাম, বলা হলো পালিয়ে গেছে’-
মিমের মা শিপন বেগম জানান, গত ১১ আগস্ট রাতে মেয়েকে আবারও মারধর করার খবর পান তিনি। এরপর আর অপেক্ষা না করে পরদিন সকালে নারায়ণগঞ্জের ওই বাসায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মেয়েকে নিয়ে আসার জন্য।
কিন্তু বাসায় গিয়ে মেয়েকে পাননি। পরিবারের দাবি, তখন গৃহকর্তার পক্ষ থেকে জানানো হয়—মিম চুরি করে বাসা থেকে পালিয়ে গেছে। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় মিমের মা সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় অভিযোগ করেন।
এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে মিমের লাশ পাওয়ার ঘটনা সামনে আসে। ফলে পরিবারের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।
তবে পরিবারের এসব অভিযোগের প্রতিটি দিক এখনো তদন্ত করে দেখছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং ফরেনসিক আলামত বিশ্লেষণের পর মিমের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও কার কী ভূমিকা ছিল, তা আরও পরিষ্কার হবে।
সিসিটিভিতে দুই ব্যক্তি, এরপর সিএনজি চালক-
মিমকে ঢামেকে নিয়ে আসার ঘটনাটিই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে ওঠে। হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে পুলিশ দেখতে পায়, গত ১২ আগস্ট বুধবার বেলা ১১ টা থেকে ১২ টার মধ্যে দুই ব্যক্তি একটি সিএনজি অটোরিকশায় করে কিশোরীকে ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে নিয়ে আসে। তারা মিমকে ট্রলিতে তুলে দেওয়ার পর কৌশলে সেখান থেকে সরে যায়।
একজন টিকিট কাটার কথা বলে এবং অন্যজন অটোরিকশার ভাড়া দেওয়ার কথা বলে চলে যায়। এরপর আর কেউ ফিরে আসেনি।
পুলিশ ওই ফুটেজের সূত্র ধরে সিএনজি অটোরিকশাটি শনাক্ত করে। পরে চালককে জিজ্ঞাসাবাদ করে মিমকে কোথা থেকে এবং কারা হাসপাতালে নিয়ে এসেছিল, সে বিষয়ে তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করা হয়। তদন্তের এই সূত্র ধরেই নারায়ণগঞ্জের বাসার অবস্থান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পর্কে তথ্য পায় পুলিশ।
আগের ময়নাতদন্তে শরীরে আঘাতের চিহ্ন
মিমের পরিচয় শনাক্ত হওয়ার আগেই তার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছিল। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক জাকিয়া তাসনিম ময়নাতদন্ত করেন। তিনি জানিয়েছিলেন, কিশোরীর শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
শাহবাগ থানার এসআই মাহফুজা আক্তারের তৈরি সুরতহাল প্রতিবেদনেও মিমের মাথা, গলার ডান পাশের সামনে ও পেছনে এবং থুতনিতে আঘাতের চিহ্ন থাকার কথা উল্লেখ করা হয়।
মৃত্যুর আগে মিম ধর্ষণ বা অন্য কোনো ধরনের যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আলামত ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ফলে ফরেনসিক প্রতিবেদনও তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অপমৃত্যু মামলা থেকে নতুন মোড়
মিমকে অজ্ঞাত হিসেবে উদ্ধারের পর ১৩ আগস্ট শাহবাগ থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করা হয়েছিল। তখন তার পরিচয় জানা না থাকায় তদন্তের প্রথম ধাপ ছিল কিশোরী কে এবং কোথা থেকে এসেছে—তা বের করা।
প্রযুক্তির সহায়তায় পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর তদন্তকারীরা তার কর্মস্থল ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ শুরু করেন। এরপরই তদন্তের গতিপথ বদলে যায়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানের মাধ্যমে তিনজনের অবস্থান শনাক্ত করে বৃহস্পতিবার ভোরে ডেমরা এলাকায় অভিযান চালানো হয়। ইতিমধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায়ও একটি মামলা করা হয়েছে।
‘লাশ ফেলে পালানোর’ কারণ খুঁজছে পুলিশ
মিমের মৃত্যুর পর তাকে হাসপাতালে রেখে যাওয়ার ঘটনা এখন তদন্তের মূল প্রশ্নগুলোর একটি। পুলিশ বলছে, প্রাথমিকভাবে অপরাধ আড়াল করার উদ্দেশ্যেই লাশ হাসপাতালে ফেলে রেখে তারা পালিয়েছিল বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে মিমের মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এবং তিনজনের প্রত্যেকের ভূমিকা কী ছিল, তা এখনো তদন্তাধীন।
এ বি এম আব্দুর রাজ্জাক, ফয়সাল আহমেদ ও রাহেমা খাতুন রেশমার সঙ্গে মিমের সম্পর্ক, তার মৃত্যুর আগে বাসায় কী ঘটেছিল, কে বা কারা তাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল এবং কেন তাকে হাসপাতালে রেখে পালানো হলো—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার এড়াতে সানারপাড়ের বাসা ছেড়ে তারা রাতারাতি অন্যত্র চলে গিয়েছিল। এ ঘটনায় সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় একটি নিয়মিত মামলা করার প্রক্রিয়াও চলছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


