এসআরবির অভিযানের সময় তরুণের মৃত্যু, তদন্তের দাবি এইচআরএসএসের

এসআরবির অভিযানের সময় তরুণের মৃত্যু, তদন্তের দাবি এইচআরএসএসের

রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ধলপুর এলাকায় স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) অভিযানের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে ১৮ বছর বয়সী তরুণ মারুফ ওরফে দুখু মিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। একই সঙ্গে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটন, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা এবং নিহতের পরিবারের জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও শোক প্রকাশ করে এইচআরএসএস।

সংগঠনটির দাবি, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য এবং তাদের নিজস্ব অনুসন্ধানে ঘটনাটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে গুরুতর অসংগতি পাওয়া গেছে। একদিকে অভিযানের সময় আত্মরক্ষার্থে ফাঁকা গুলি ছোড়ার দাবি করা হয়েছে, অন্যদিকে এসআরবির একটি ক্যাম্প থেকে ওই এলাকায় কোনো দল পাঠানোর কথা অস্বীকার করা হয়েছে। এমনকি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও মারুফ কার গুলিতে নিহত হয়েছেন, তা নিশ্চিত করতে পারেননি।

এইচআরএসএসের অনুসন্ধানে জানা যায়, নিহতের স্বজনদের দাবি, হট্টগোলের শব্দ শুনে মারুফ পাশের রাস্তায় গেলে কিছুক্ষণ পর তার গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পাওয়া যায়। অন্যদিকে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, নিজেদের র‍্যাব/এসআরবি সদস্য পরিচয় দেওয়া কয়েকজন ব্যক্তি তিনজনকে হাতকড়া পরানোর সময় ইটের টুকরা নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এ সময় দুজন সদস্য গুলি চালান বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

সংগঠনটি বলছে, স্বজন, প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যের মধ্যে থাকা এসব অসংগতি নিরসন এবং ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্‌ঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত অপরিহার্য।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন এর আগের দিন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) সরকার অনুমতি দিলে ‘ক্রসফায়ার’ করার প্রস্তুতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের বক্তব্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

এইচআরএসএসের মতে, র‍্যাবের নাম পরিবর্তন করে এসআরবি করা হলেও বাহিনীর কার্যকর কাঠামোগত সংস্কার ও জবাবদিহি নিশ্চিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

মানবাধিকার সংগঠনটি মনে করিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশের সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির (আইসিসিপিআর) ৬ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক মানুষের জীবনের অধিকার সুরক্ষিত করা হয়েছে। জাতিসংঘের নীতিমালা অনুযায়ী, আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার অবশ্যই কঠোরভাবে প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক হতে হবে।

এইচআরএসএস বলছে, আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর অভিযানে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলে কার্যকর, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

এইচআরএসএসের সাত দফা দাবি

ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সাত দফা দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। দাবিগুলো হলো—

১. সংশ্লিষ্ট বাহিনীর বাইরে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করে তদন্তের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।

২. ব্যালিস্টিক পরীক্ষার ফল, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, সিসিটিভি ফুটেজ, কল রেকর্ড এবং অভিযানসংক্রান্ত সব নথি সংরক্ষণ করে তদন্তে ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

৩. তদন্তের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে অভিযানে অংশ নেওয়া সদস্যদের সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব থেকে সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করতে হবে।

৪. নিহতের পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং পরিবারের সদস্য ও প্রত্যক্ষদর্শীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

৫. ঘটনার জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং নিহতের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও কার্যকর প্রতিকার দিতে হবে।

৬. বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ইঙ্গিতবাহী বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে। পাশাপাশি সাদা পোশাকে অভিযান পরিচালনা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পরিচয় প্রদর্শন এবং আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

৭. এসআরবির কাঠামোগত সংস্কার, স্বাধীন তদারকি এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

বিবৃতিতে এইচআরএসএস আরও বলেছে, জীবনের অধিকার রক্ষা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা ছাড়া এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব নয়। তাই মারুফের মৃত্যুর ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংস্কারেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন