র্যাবে যোগদানের প্রথম দিন রাতে ২০১১ সালের ১১ জুলাই আমাকে একটি বিশেষ অভিযানে নিয়ে যাওয়া হয়। টঙ্গীর আহসানুল্লাহ মাস্টার ফ্লাইওভার পার হয়ে ডানে গিয়ে আমাদের গাড়ি ইউটার্ন নিয়ে ভেতরের দিকে একটি ব্রিজের কাছে দাঁড়ায়। এরপর চোখ-হাত বাঁধা বন্দীকে গাড়ি থেকে নামিয়ে জিয়াউল আহসান ব্রিজের রেলিংয়ে মাথা ঠেকিয়ে গুলি করে রেলিংয়ের ওপর দিয়ে নিচে ফেলে দেয়। আমি মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে র্যাবে যোগদান করেছি, এই ঘটনা দেখে আমি হতবিহ্বল হয়ে পড়ি।
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জবানবন্দিতে এসব কথা বলেন স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়া সেনা কর্মকর্তা মেজর খোন্দকার মোহাম্মদ সাজ্জাদুল ইসলাম।
আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে শতাধিক মানুষকে গুম, নির্যাতন ও খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বরখাস্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে ষষ্ঠ সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি।
জবানবন্দিতে মেজর সাজ্জাদ বলেন, “আমার বর্তমান বয়স ৫৫ বছর। বর্তমানে আমি একজন ব্যবসায়ী। আমি ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ২৬তম বিএমএ লং কোর্সে কমিশন লাভ করি এবং ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে মেজর পদে থাকা অবস্থায় স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করি। সেনাবাহিনীতে থাকাকালে ২০১১ সালের ৫ জুলাই সরকারি আদেশে আমাকে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নে (র্যাব) বদলি করা হয়। তখন র্যাব সদর দপ্তরে লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান ডাইরেক্টর ইন্টেলিজেন্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়। পরদিন আমাকে র্যাব সদর দপ্তর থেকে র্যাব-৩-এ বদলি করে পাঠানো হয়। র্যাব-৩-এ তখন কমান্ডিং অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন লে. কর্নেল রফিকুল ইসলাম। তিনি আমার কুশলাদি জিজ্ঞাসা করেন এবং কথাবার্তার একপর্যায়ে তিনি আমাকে বলেন, আজ রাতে একটি অপারেশন হবে এবং সেখানে আমাকে যেতে হবে। তিনি বলেন, এটি লে. কর্নেল জিয়াউল আহসানের নির্দেশ।”
জবানবন্দিতে সাজ্জাদ বলেন, “ওইদিন আনুমানিক রাত ১১টার দিকে লে. কর্নেল রফিকুল ইসলাম, মেজর তরিকুল এবং আরও একজন অফিসারসহ সাদা পোশাকে র্যাব সদর দপ্তরের গেটে গিয়ে পৌঁছাই। আমাদের গাড়িটি পৌঁছানোর পর র্যাব সদর দপ্তরের ভেতর থেকে আরও তিনটি গাড়ি এসে যোগ দেয়। এরপর চারটি গাড়ি র্যাব সদর দপ্তর থেকে রওনা শুরু করে। টঙ্গীর আহসানুল্লাহ মাস্টার ফ্লাইওভার পার হয়ে ডানে গিয়ে ইউটার্ন নিয়ে ভেতরের দিকে একটি রাস্তা দিয়ে গাড়িগুলো চলতে থাকে। প্রায় ৪০-৪৫ মিনিট চলার পর গাড়িগুলো একটি ব্রিজের ওপর গিয়ে দাঁড়ায়। এরপর গাড়ি থেকে সবাই নামেন। একজন চোখ বাঁধা, হাত বাঁধা বন্দীকে গাড়ি থেকে নামানো হলে জিয়াউল স্যার ওই বন্দীকে ধরে নিয়ে ব্রিজের রেলিংয়ের সঙ্গে ঠেকিয়ে তার মাথার পেছন দিক থেকে গুলি করে রেলিংয়ের ওপর দিয়ে নিচে ফেলে দেন।”
জবানবন্দিতে এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, “এরপর সবাই গাড়িতে ওঠার পর গাড়িগুলো আবার চলতে শুরু করে। কিছুদূর যাওয়ার পর গাড়িগুলো আবার একটি ব্রিজের ওপর গিয়ে দাঁড়ায়। আবার সবাই গাড়ি থেকে নামেন। একটু এগোলেই সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন জিয়াউল আহসান। তিনি আমাকে ইঙ্গিত করে বললেন, এখানে একটি সন্ত্রাসবিরোধী অপারেশন হবে এবং তুমি সেটা করবে। আমি স্যারকে জিজ্ঞেস করলাম, স্যার সন্ত্রাসবিরোধী অপারেশন কী? কারা সন্ত্রাসী? তাদের অপরাধ কী? আমার এই কথা শোনার পর তিনি অগ্নিমূর্তি ধারণ করেন। উপস্থিত ৬-৭ জনের সামনে তিনি চিৎকার করে আমাকে গালি দিতে থাকেন। এরপর আমাকে গাড়িতে গিয়ে বসতে বলেন। স্যারের এই কথা শুনে আমি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে গাড়ির ভেতর গিয়ে বসলাম। আমার সারা গায়ে ঘাম বের হচ্ছিল। আমি ভয়ে দোয়া-দরুদ পড়তে শুরু করলাম এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে শুরু করলাম।”
তিনি বলেন, “আমি ভয়ে কাঁপছি, এর মাঝেই আমার কানে বাইরে থেকে একটি অস্পষ্ট আওয়াজ ভেসে আসে। সেটি গুলির শব্দ বলেই মনে হলো। প্রায় ৮-১০ মিনিট পর বাকিরা সবাই গাড়িতে ফিরে আসেন এবং গাড়িগুলো আবার চলতে শুরু করে। এভাবে তিন জায়গায় গাড়ি থামে এবং অপারেশন শেষ করে। এরপর আমাদের গাড়িটি ক্যান্টনমেন্টের স্টাফ রোডে এমপি চেকপোস্টে পৌঁছানোর পর আমাকে নামিয়ে দেওয়া হয়। আমি হেঁটে আমার বাসায় চলে যাই। ভয়ে আমার পা যেন চলছিল না।”
জবানবন্দিতে এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, “পরদিন ১২ জুলাই আমাকে র্যাব থেকে সেনাবাহিনীতে বদলি করে দেওয়া হয়। এরপর ৩-৪ দিনের মধ্যে জাতীয় পত্রিকায় গাজীপুর, জয়দেবপুর এলাকায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তিনটি লাশ পাওয়া গেছে বলে খবর প্রকাশিত হয়। ২০১১ সালে র্যাবের এই ঘটনার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে আমাকে একজন অবিশ্বস্ত এবং অবাধ্য অফিসার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ওই সময় দেখেছি, যাদের সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি ছিল, তারা সবাই যেন জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে। একজন সৎ, যোগ্য, মেধাবী এবং ন্যায়পরায়ণ অফিসার হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে আমার আর পদোন্নতি হলো না। আমি ২০১৩ সালে অবসরের মেয়াদকাল ১২ বছর বাকি থাকতেই স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করে নতুন কর্মজীবন শুরু করি।”
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


