লালমনিরহাটে তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিদ্যুতের এই নজিরবিহীন বিভ্রাটের কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক কার্যক্রম।
প্রচণ্ড গরমে ফ্যান ও ফ্রিজ বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীরা। ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্যে নেমেছে ধস। এ অবস্থা থেকে কবে নাগাদ মুক্তি মিলবে, তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা।
লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন থমকে যাওয়ায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের মালিকরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। দিন শেষে শ্রমিকদের মজুরি মেটাতে হলেও বিদ্যুতের অভাবে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।
লালমনিরহাট শহরের বাসিন্দা কামাল উদ্দিন বলেন, দিনে যেমন-তেমন, রাতে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কারণে পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।
শহরের থানা পাড়া এলাকার গৃহিণী মরিয়ম বেগম জানান, রাতে ঘুমানোর সময়ও বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। গরমে ঘুমোনো যাচ্ছে না। কয়েক দিন ধরে এই সমস্যা আরো বেড়েছে। বিশেষ করে মধ্যরাতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়াটা বেশ ভোগান্তির।
ভুক্তভোগী মানুষের অভিযোগ, মাস শেষে বিদ্যুৎ বিল ঠিকই পরিশোধ করতে হচ্ছে। প্রিপেইড মিটারে অগ্রিম টাকা দিয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা। দিন-রাত মিলিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না—বিদ্যুৎ যাচ্ছে নাকি আসছে, সেটাই বুঝে ওঠা দায় হয়ে পড়েছে। কেবল লালমনিরহাট নয়, সারা দেশের চিত্রই প্রায় একই রকম। বিদ্যুতের এমন বিভ্রাটে পরীক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক, ভ্যান ও অটোরিকশাচালকসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যুৎ অফিসের এক কর্মকর্তা জানান, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। এখানে আমাদের করার কিছু নেই।
সোমবার জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সন্ধ্যার পর থেকেই লোডশেডিংয়ের তীব্রতা বাড়ে, যা চলে ভোর পর্যন্ত।
কালিগঞ্জ উপজেলার শিয়ালখাওয়া এলাকার কৃষি শ্রমিক মনসুর আলী বলেন, সারা রাত বিদ্যুৎ থাকে না, গরমে একফোঁটাও ঘুমাতে পারি না। শরীর এত দুর্বল লাগে যে সকালে খেতখামারে কাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। কাজ না করলে পেটে ভাত যায় না, পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম কষ্টে আছি।
জানা গেছে, রাতে মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে সর্বস্তরের মানুষের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। শহরের পাশাপাশি গ্রাম অঞ্চলেও চলছে বিদ্যুতের অবাধ লুকোচুরি। সেচকাজ ব্যাহত হওয়ায় কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন, আর লালমনিরহাট বিসিক শিল্পনগরীর কলকারখানা ও ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর চাকা অচল হয়ে পড়েছে। চার্জের অভাবে শিক্ষার্থীরা অনলাইন অ্যাসাইনমেন্ট সম্পন্ন করতে পারছে না। ফ্রিজে রাখা খাবার ও মাছ নষ্ট হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, গৃহিণীদের রান্নাবান্নাসহ দৈনন্দিন কাজ কঠিন হয়ে পড়েছে। কম্পিউটার কম্পোজ ও ফটোকপি ব্যবসায়ীরা সময়মতো গ্রাহকদের কাজ সরবরাহ করতে পারছেন না। বিসিকের এক কারখানা মালিক জানান, ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে তাদের লোকসানের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে।
ভোগান্তির কথা জানিয়ে স্থানীয় অটোরিকশাচালক বোরহান উদ্দিন বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে অটোর ব্যাটারি ঠিকমতো চার্জ দিতে না পারায় তার উপার্জনের পথ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে ভ্যানচালক আকবর আলী বলেন, সরকার আসে, সরকার যায়; দেশের টাকা বাইরে পাচার হয়, ধনীরা আরও ধনী হয়, আর গরিবদের ভাগ্যে দুবেলা দুমুঠো খাবার জোটে না—এই হলো আমাদের অবস্থা।
জেডএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

