মানুষের ব্যক্তিত্বের ধরন নানা রকম। কেউ খুবই মিশুক, যেকোনো আড্ডা জমাতে যাদের কোনো জুড়ি নেই। অন্যদিকে কেউ খুব চুপচাপ, ঘরের কোণে চায়ের কাপ ও পছন্দের বই নিয়ে তারা হারিয়ে যায় নিজের জগতে।
মনোবিজ্ঞানীরা মানুষের ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন ধরনকে পাঁচটি বড় শ্রেণিতে ভাগ করেন। ‘বিগ ফাইভ’ হিসেবে পরিচিত এ ধরনগুলো হলো— বহির্মুখিতা (এক্সট্রাভারসন), অভিজ্ঞতা অর্জনে উন্মুক্ততা (অপেননেস টু এক্সপেরিয়েন্স), মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা (অ্যাগ্রিয়েবলনেস), উদ্বেগপ্রবণতা (নিউরোটিসিজম) ও দায়িত্বশীলতা (কনশিয়েনশাসনেস)।
মানুষের মধ্যে কীভাবে এরকম ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটে তা নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে গবেষকরা গবেষণা চালিয়ে আসছেন। সম্প্রতি এ নিয়ে এক গবেষণায় উঠে এসেছে, মানুষের জন্মগত জিন কীভাবে তার ব্যক্তিত্ব নির্ধারণে প্রভাব ফেলে। গত ২ সেপ্টেম্বর গবেষণাটি ব্রিটেনের বিজ্ঞান সাময়িকী ন্যাচারে প্রকাশিত হয়। গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ১০ লাখের বেশি ব্যক্তির জিন পরীক্ষণ করেন। একই সঙ্গে ব্যক্তিত্ব প্রকাশের নির্ধারিত প্রশ্ন-উত্তরের পরীক্ষা নেওয়া হয় তাদের।
মনোবিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই ধারণা করে আসছেন, মানুষের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে জিনের সম্পর্ক রয়েছে। এ নিয়ে আগে বিভিন্ন সময় গবেষণা হলেও তাতে এ সম্পর্ক স্পষ্টভাবে ধরা পড়েনি। ক্রোয়েশিয়ার জাগরেব বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী ডেনিস ব্র্যাটকো বলেন, ‘কয়েক দশকের গবেষণা ব্যর্থ হয়েছে কেননা তারা একটি বা অল্প কিছু জিনের সন্ধানে ছিল যার বিপুল প্রভাব রয়েছে।’
এ সমস্যা সমাধানে নতুন গবেষণায় সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীদের কাছে জমা থাকা হাজার হাজার মানুষের জিনগত তথ্য ও ব্যক্তিত্বের বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ব্রিটেনের ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাইকেল নিভার্ড বলেন, ‘আমরা মনে করি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য তার ব্যক্তিত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’ মানুষের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তার মানসিক স্বাস্থ্যগত বিষয় জড়িত। বিশেষ করে নিউরোটিসিজমের সঙ্গে উদ্বেগের বিষয়টি জড়িত।
মানুষের স্বাস্থ্যের বিষয়ে তার ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে পূর্বাভাস করা সম্ভব হয়। তার সুস্থতা, অসুস্থতা বা কী ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন, তার অনেকখানি ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে নির্ধারণ সম্ভব।
গবেষণায় ১,০০০ জিনগত ধরন নিয়ে পরীক্ষণ করা হয়, যা মানুষের ব্যক্তিত্ব করতে অংশ নেয়। জেনেটিকের এ বিচিত্র প্রোফাইলে গবেষকরা দেখেন, করোনা মহামারির শুরুর দিকেই বহির্মুখী স্বভাবের লোকরা বেশি সংক্রমিত হয়েছেন। অধ্যাপক নিভার্ডের মতে, এটি আসলেই বোধগম্য। কেননা যখন আপনি চারপাশের সামাজিক যোগাযোগে বাধন আলগা করেন, তখন আপনি সহজ শিকারে পরিণত হবে।
ব্যক্তিত্ব একই সঙ্গে পূর্বাভাস করতে পারে, মধ্যবয়সে ব্যক্তি কোথায় গিয়ে বাস করবে। ব্রিটেনের বায়োব্যাংকের তথ্য ব্যবহার করে গবেষকরা এ বিষয়টি উদঘাটন করেন। যারা নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য আগ্রহী, তারা বহুজাতিক কোনো শহরে বাস করেন। অন্যদিকে যাদের মধ্যে উদ্বেগপ্রবণতা কাজ করে তারা সচ্ছল শহরতলি এলাকায় বাস করেন।
গবেষণায় আরো দেখা যায়, অল্প হলেও ব্যক্তিত্বের ১৩ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণ জিন ভূমিকা রাখে। এর পরিপ্রেক্ষিতে মনোবিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, মানুষের ব্যক্তিত্ব মূলত জিন ও পরিবেশের সমন্বয়। তবে সব সময়ই যে উত্তরাধিকার সূত্রে ব্যক্তিত্ব নির্ধারিত হবে তা নয়। একজন বহির্মুখী ব্যক্তির সন্তানও যে বহির্মুখী হবে তা নয়। বিষয়টি বরং আরো জটিল।
নিভার্ড বলেন, গবেষণায় উদঘাটিত সংখ্যার চেয়ে আরো বেশি জিন ব্যক্তিত্ব নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। এগুলো মস্তিষ্কের কাজকে প্রভাবিত করে। তিনি বলেন, আমাদের ব্যক্তিত্ব গঠনে শরীর ও অভিজ্ঞতার প্রভাব নিয়ে অন্তহীন বিতর্ক রয়েছে। তবে এ গবেষণার ফলাফল নিয়ে আমি উচ্ছ্বসিত।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

