একাকিত্ব উপভোগ করতে একাই ভ্রমণ

একাকিত্ব উপভোগ করতে একাই ভ্রমণ

একা একা ঘুরতে আবার ভালো লাগে নাকি! তাছাড়া মেয়েদের মনে একা ঘোরার বিষয়ে শঙ্কা থাকে, নিরাপত্তা নিয়ে থাকে হাজারো চিন্তা। তা ছাড়া বাংলাদেশে একা ঘোরা এখনো কঠিন। তবে ইচ্ছাশক্তি তীব্র হলে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। মন যার ডানা মেলে আকাশে উড়তে চায়, তাকে আটকাবে কোন জুজুর ভয়, কোন বাহুবল!

বিজ্ঞাপন

মানুষ সত্যিকার অর্থে একা

মানুষ সবসময়ই একা। জন্ম হয় একা, মরতেও হবে একা। তাই ঘোরাঘুরি একা নয় কেন? তাছাড়া প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য একাকী ভ্রমণই ভালো। প্রকৃতির সঙ্গে কথা বলা, প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়ার এর চেয়ে উত্তম সুযোগ আর নেই। নিজের কাছে নিজেকে স্পষ্ট করে তোলার অসাধারণ একটা প্রক্রিয়া একা বেড়ানো।

নির্জনতা খুঁজে পেতে কিছু বিষয় মানিয়ে নিতে হবে, কিছু ক্ষেত্রে শক্ত কণ্ঠে ‘না’ বলা শিখতে হবে। ভয় দূর করে মনে তৈরি করতে হবে কৌতূহল। তবেই নিজেকে একা ঘুরতে প্রস্তুত বলে ভাবতে পারেন।

কেন একা ঘুরবেন

অচেনা কোনো জায়গায় একা একা ভ্রমণ করার অভিজ্ঞতা জীবনকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ করে দেয়। ব্যস্ততা আর পরিচিত গণ্ডি পেরিয়ে যখন কেউ সম্পূর্ণ অপরিচিত পরিবেশে পা রাখেন, তখন প্রতিটি মুহূর্ত নিজের সঙ্গে একধরনের বোঝাপড়ার ক্ষেত্র তৈরি করে। অচেনা রাস্তায় একা হাঁটা, নতুন মানুষের মুখ দেখা, কিংবা অজানা সংস্কৃতির মুখোমুখি হওয়া মানুষের ভেতরের ভীতি দূর করে আত্মবিশ্বাস জোগায়।

নিজেকে আবিষ্কার ও সময় দিতে একা ভ্রমণ

সবার সঙ্গে কিছু ভ্রমণ করতে চাইলে দলেবলে যান। নিজেকে সময় দিন। যদি নিজেকে খুঁজতে চান, বুঝতে চান, ভালোবাসতে চান, তাহলে একা ঘুরতে যান। ডিজিটাল যুগে ইন্টারনেটের এই সময়ে নিজের সঙ্গে সময় কাটানো কঠিন।

মোবাইল ফোন জীবনের প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ। আবার এই যন্ত্রটিই যেন আমাদের জীবনের সব মূল্যবান সময় কেড়ে নিচ্ছে। আমরা যেন বেঁচে আছি অন্যের চোখে, অন্য কারো জীবনে। একদিন হাতের ফোনটা নষ্ট হয়ে গেলে বুঝে উঠতে পারি না—কী করব, কী ভাবব, কীভাবে ভালো সময় কাটবে। ধীরে ধীরে নিজের কাছে নিজের পরিচয়টাই যেন অস্পষ্ট হয়ে আসে।

নিজের কাছে নিজেকে স্পষ্ট করে তোলার অসাধারণ একটা প্রক্রিয়ার নাম একা ঘোরা বা সলো ট্রাভেলিং। কথায় বলে, একজন ব্যক্তিকে চেনার সেরা উপায় তিনটি—অর্থ লেনদেন করা, ভ্রমণ করা এবং কিছুকাল একসঙ্গে বাস করা। এই তিনটিই সম্ভব একা ট্রাভেলে।

V

মানুষ কেন একা ঘোরে

আত্মোপলব্ধি ও মানসিক শক্তি বৃদ্ধি করতে একা ঘোরার প্রয়োজন আছে। একা ভ্রমণে গেলে নিজেকে নতুনভাবে চেনা যায়; নিজের সক্ষমতা ও নিজের দুর্বলতা পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। অচেনা পরিবেশে একা থাকা মানে নিজের সব সিদ্ধান্ত নিজেই নেওয়া। তখন বোঝা যায়, আপনি আদতেই মিশুক কি না এবং অপরিচিত মানুষের সঙ্গে সহজে মিশতে পারেন কি না। জীবনের নানা জটিল পরিস্থিতিতে আপনি কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান, তা একা ভ্রমণের সময় স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।

আপনি সামর্থ্য অনুযায়ী কেমন বাজেট করতে পারেন? ভ্রমণকালের ঝুঁকি, আনন্দ, মেলামেশা, নিজের নিরাপত্তার বিষয়ে আপনার দক্ষতা কেমন? সবচেয়ে বড় কথা, যখন আশপাশে পরিচিত কেউ থাকবে না, সে সময় নিজেকে কী কাজে বা ভাবনায় ব্যস্ত রাখেন?

নিজের সত্তাকে আবিষ্কারের অসাধারণ উপায় হতে পারে একা ঘোরা। একবার একা ঘুরে এলেই আপনি জানবেন, নিজের জীবন, মন ও মানসিকতার কোন বিষয়টিতে কাজ করা এখনো বাকি আছে।

আরেকটা বড় সুবিধা হলো জীবনের মূল বিনিয়োগ—সময় বণ্টনে। মনে করুন, পতেঙ্গা সি বিচ যাবেন বলে বের হয়েছেন। চট্টগ্রাম পৌঁছে মনে হলো, একটা দিন শহরটাই দেখি। নিরিবিলি ঘুরে কাটাই একটা দিন। চলে গেলেন একাই ফয়েজ লেকে। স্থানীয় পাহাড় অথবা চুপচাপ একটা দোকানে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বসে হরেক রকম মানুষ দেখলেন।

কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই, ঘড়ির কাঁটার শাসন নেই। নিজের সময়, নিজের ভাবনা, নিজের জীবনের ছোট ছোট কিছু মুহূর্ত থাকুক না কেবল নিজের কাছে।

নিরাপত্তা রক্ষায় করণীয়

সবার আগে দরকার, যেখানে ঘুরতে যাচ্ছেন সেখানকার নিরাপত্তা কেমন ভালোভাবে জেনে নেওয়া। ভ্রমণে গিয়ে যাকে-তাকে বিশ্বাস করা যাবে না। একা ট্রাভেলে আপনাকে সবসময় শতগুণ বেশি সতর্ক থাকতে হবে। নিজেকে রক্ষা করা মানুষের সবচেয়ে প্রয়োজন। একা ঘুরতে গেলেই আপনার জেনেটিক কোডিং কীভাবে আপনাকে সচেতন করে তুলবে, টেরও পাবেন না।

একা মানুষ সবার ভিড়ে মিশে যেতে পারে, এটা বড় সুবিধাই বটে। তবে মিশে যাওয়া মানে হারিয়ে যাওয়া নয়। নিজের উপস্থিতি ঢেকে রাখা আর নিজের বোধ হারিয়ে ফেলা যাবে না। সলো ট্রাভেলিংয়ের সবচেয়ে বড় কৌশল হলো দেখবেন সব, বলবেন কম, শুনবেন বেশি, বুঝবেন তারও বেশি।

ঘর থেকে বের হওয়ার আগে দরজা ঠিকমতো বন্ধ করেছেন কি না, তা যেমন দেখে নিতে হয়, তেমনি বেড়াতে বের হওয়ার আগেও কিছু বিষয় মাথায় রাখা দরকার। কোথায় যাচ্ছেন, কীভাবে যাচ্ছেন, কোথায় থাকবেন, কার নম্বর কাছে আছে, ফোনে চার্জ আছে কি না, নেটওয়ার্ক থাকবে কি না—সবই নিরাপত্তার অংশ। সাহস মানে কিছু না ভেবে বেরিয়ে পড়া নয়; সাহস হলো—ভয় মনে রেখেই বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সব নিয়ন্ত্রণ করা।

ফোন, নেটওয়ার্ক আর লোকেশন

একা ভ্রমণে গেলে নানারকম মানুষ ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় হয়। এ সময় ফোন শুধু ছবি তোলার যন্ত্র নয়; বরং ফোনই হয়ে ওঠে আপনার মানচিত্র, টিকিট কাউন্টার, ব্যাংক, টর্চলাইট ও পরিচয়পত্র—সবকিছু। তাই ভ্রমণের সময় ফোনের চার্জকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিন। অবশ্যই সঙ্গে একটি পাওয়ার ব্যাংক রাখুন। যে গন্তব্যে যাচ্ছেন, সেখানে কোন অপারেটরের নেটওয়ার্ক ভালো, তা আগে থেকেই জেনে নেওয়ার চেষ্টা করুন।

পরিবারের কাউকে বা বিশ্বস্ত বন্ধুকে মোটামুটি রুট জানিয়ে রাখুন। কোথায় থাকছেন, কোন গাড়িতে উঠলেন, কোথায় পৌঁছালেন—তার লাইভ আপডেট দিতে কখনো ভুলবেন না। সবসময় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলো জানিয়ে রাখা ভালো।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সব ঠিক টাইমে দিয়ে দেবেন না। আপনি কখন, কোথায়, কোন হোটেলে, একা আছেন কি না—এসব তথ্য পৃথিবীর সবার জানার দরকার নেই। ছবি দিন, গল্পও অবশ্যই শেয়ার করবেন; তবে সময় বুঝে পরে দেওয়াই ভালো। কিছু আনন্দ একটু দেরিতে শেয়ার করলেও তার রং ফিকে হয় না; বরং নিরাপদ থাকে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন