ভুটানে বাংলাদেশের নয়নাভিরাম দূতাবাস

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

ভুটানে বাংলাদেশের নয়নাভিরাম দূতাবাস

নির্মাণকাজ শেষে গত বছর উদ্বোধন করা হয় ভুটানে অবস্থিত বাংলাদেশের নতুন দূতাবাস। নান্দনিক এ ভবনের নকশায় ফুটে উঠেছে দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের অনন্য প্রকাশ। স্থপতিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভবনটি কেবল একটি কূটনৈতিক স্থাপনা নয়; বরং এটি বাংলাদেশ ও ভুটানের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও বন্ধুত্বের স্থাপত্যিক প্রতীক।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ভুটানের বিশেষ অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দূতাবাসটির নকশা করা হয়েছে। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ভুটান আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। সে সময় ভুটানের রাজা জিগমে দর্জি ওয়াংচুক এক টেলিগ্রামে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি সমর্থন এবং স্বাধীনতার সাফল্যের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছিলেন। এই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক বন্ধুত্বই দূতাবাসটির নকশার মূল অনুপ্রেরণা।

স্থাপত্য পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত পানির অবিচ্ছিন্ন প্রবাহের ধারণা।
স্থাপত্য পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত পানির অবিচ্ছিন্ন প্রবাহের ধারণা।

স্থাপত্য পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত পানির অবিচ্ছিন্ন প্রবাহের ধারণা। সেই ভাবনা থেকেই ভবনের কেন্দ্রে একটি 'ওয়াটার কোর্ট' বা জলপ্রাঙ্গণ নির্মাণ করা হয়েছে, যা প্রতীকীভাবে বঙ্গোপসাগরকে প্রতিনিধিত্ব করে। এর মাধ্যমে হিমালয় যেন নিজের উৎসারিত পানির প্রতিফলন দেখতে পায় এমন একটি কাব্যিক স্থাপত্যিক ধারণা বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

নকশায় আরও স্থান পেয়েছে বাঙালি বৌদ্ধ পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্করের ঐতিহাসিক অবদান। ইতিহাসে বৌদ্ধধর্মের সংস্কার ও বিস্তারে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বাংলাদেশ ও ভুটানের সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে আরো গভীর করেছে, যা ভবনের ভাবনায় প্রতিফলিত হয়েছে।

জলপ্রাঙ্গণসহ ভবনের কিছু দৃশ্য।
জলপ্রাঙ্গণসহ ভবনের কিছু দৃশ্য।

ভুটানের রাজধানী থিম্পুর আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভবনটিতে পরিবেশবান্ধব নকশা গ্রহণ করা হয়েছে। শীতকালে সূর্যের আলোকে কাজে লাগিয়ে প্রাকৃতিকভাবে উষ্ণতা ধরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা ভবনের জ্বালানি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি আরামদায়ক অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিশ্চিত করবে।

ভুটানের রাজধানী থিম্পুর আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভবনটিতে পরিবেশবান্ধব নকশা গ্রহণ করা হয়।
ভুটানের রাজধানী থিম্পুর আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভবনটিতে পরিবেশবান্ধব নকশা গ্রহণ করা হয়।

প্রচলিত দূতাবাস ভবনের নিরাপত্তাকেন্দ্রিক ও বিচ্ছিন্ন নকশার পরিবর্তে এখানে উন্মুক্ততার ধারণাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সামনের সীমানা প্রাচীরের একটি অংশ স্বচ্ছ রাখা হয়েছে, যাতে পথচারীরা জলপ্রাঙ্গণ এবং পেছনের হিমালয়ের মনোরম দৃশ্য দেখতে পারেন। স্থপতিদের মতে, এটি দুই দেশের পারস্পরিক বিশ্বাস, সম্মান ও দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের প্রতীক।

ভুটানে স্থাপত্য নির্মাণের কঠোর নীতিমালা থাকলেও দূতাবাস ভবনকে আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে নির্মাণ করা হয়েছে। ভুটানের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য, নির্মাণ উপকরণ, কারুশিল্প এবং নকশার বৈশিষ্ট্য গভীরভাবে অধ্যয়ন করে তা আধুনিক স্থাপত্যে সংযোজন করা হয়েছে।

দূতাবাস কমপ্লেক্সের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি উন্মুক্ততা ও প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখা। এজন্য ভবনটি নিম্ন-উচ্চতার রাখা হয়েছে, যাতে হিমালয়ের প্রাকৃতিক দৃশ্য অক্ষুণ্ন থাকে এবং ঢালু ভূমির সঙ্গে ভবনটি স্বাভাবিকভাবে মিশে যেতে পারে।

ভবনের পাশে নান্দনিক ওয়াটার কোর্ট বা জলপ্রাঙ্গণ।
ভবনের পাশে নান্দনিক ওয়াটার কোর্ট বা জলপ্রাঙ্গণ।

পুরো কমপ্লেক্সের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জলপ্রাঙ্গণ, যার চারপাশে চ্যান্সারি ভবন (কূটনৈতিক মিশনের প্রধান কার্যালয়), রাষ্ট্রদূতের বাসভবন এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন গড়ে তোলা হয়েছে। এটি শুধু একটি নান্দনিক উপাদান নয়; বরং জলবায়ু, সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও কূটনীতিকে একত্রিত করার কেন্দ্রীয় প্রতীক হিসেবে কাজ করছে।

ভুটানি কাঠের অলংকরণে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথার নকশা সংযোজনের মাধ্যমে দুই দেশের শিল্প-সংস্কৃতির এক অনন্য সংলাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।
ভুটানি কাঠের অলংকরণে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথার নকশা সংযোজনের মাধ্যমে দুই দেশের শিল্প-সংস্কৃতির এক অনন্য সংলাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।

নির্মাণে স্থানীয় পাইন কাঠ, পাথর এবং রিইনফোর্সড কংক্রিট ব্যবহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভুটানের ঐতিহ্যবাহী র‌্যামড-আর্থ স্থাপত্যের দৃঢ়তা বজায় রেখে ভূমিকম্প-সহনশীল কাঠামো নিশ্চিত করা হয়েছে। ভুটানি কাঠের অলংকরণে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথার নকশা সংযোজনের মাধ্যমে দুই দেশের শিল্প-সংস্কৃতির এক অনন্য সংলাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।

ভবন নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে স্থানীয় পাইন কাঠ, পাথর এবং রিইনফোর্সড কংক্রিট।
ভবন নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে স্থানীয় পাইন কাঠ, পাথর এবং রিইনফোর্সড কংক্রিট।

স্থপতিদের মতে, এই দূতাবাস ভবন কেবল একটি প্রশাসনিক বা কূটনৈতিক স্থাপনা নয়; বরং এটি এমন এক স্থাপত্যিক নিদর্শন, যেখানে প্রতীকীভাবে বঙ্গোপসাগর ও হিমালয়ের মিলনের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভুটানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব, সাংস্কৃতিক ঐক্য এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের স্থায়ী স্মারক গড়ে উঠেছে।

উল্লেখ্য, ভুটান এবং বাংলাদেশ নিজ নিজ রাজধানীতে দু’দেশের দূতাবাস ভবন নির্মাণের জন্য পরস্পরকে জমি প্রদান করেছে। বাংলাদেশ দূতাবাসের জন্য ভুটান সরকার থিম্পুর সুপ্রিম কোর্টের পাশে নির্ধারিত কূটনৈতিক এলাকায় ১ দশমিক ৫ একর জমি প্রদান করে। এ জমিতে দূতাবাস ভবন, রাষ্ট্রদূতের বাসভবন, স্টাফ কোয়ার্টার্স ও মাল্টিপারপাস হলসহ মোট চারটি ভবন নির্মিত হবে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং ভুটানের রাজা দূতাবাস ভবন নির্মাণের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। নির্মাণকাজ শেষে ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর দূতাবাস কমপ্লেক্সের উদ্বোধন করেন ভুটানের রাজকন্যা ইউফেলমা চোডেন ওয়াংচুক।

সূত্র: আর্চডেইলি

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...