ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী তাসলিমা ইসলামের নামে থাকা স্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দিয়েছেন আদালত।
মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক মো. শাহজাহান কবির এ আদেশ দেন।
এর আগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপপরিচালক মশিউর রহমান ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে নজরুল ইসলাম, তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা স্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের আবেদন করেন।
দুদকের আবেদনে বলা হয়, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের সঞ্চয়ের অর্থ দিয়ে বিভিন্ন ব্যাংকে রাখা এমটিডিআর (এফডিআর)-এর অর্থ আত্মসাৎ, প্রতিষ্ঠানের নামে অতিরিক্ত দামে জমি কেনার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানাধীন রয়েছে।
আবেদনে আরো বলা হয়, বর্ণিত স্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করা না হলে তা হস্তান্তরের আশঙ্কা রয়েছে। পরবর্তীতে এসব সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা সম্ভব নাও হতে পারে। তাই সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে ওই সম্পত্তি ক্রোকের প্রয়োজন রয়েছে।
দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তার দাখিল করা আবেদন ও অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালা, ২০০৭-এর (সংশোধিত বিধিমালা-২০১৯) বিধি ১৮ অনুযায়ী উল্লিখিত স্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দেন আদালত।
আদালতের আদেশে নজরুল ইসলামের নামে থাকা রাজধানীর উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, সূত্রাপুর ও গুলশানসহ ময়মনসিংহের ভালুকা, পটুয়াখালীর কুয়াকাটা, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এবং মুন্সীগঞ্জে থাকা মোট ২০টি দলিলের স্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের আওতায় এসেছে।
দুদকের আবেদনে এসব সম্পত্তির সরকারি বা দাপ্তরিক ক্রয়মূল্য হিসেবে মোট ৩৮ কোটি ৩৯ লাখ ১৩ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্রোক করা সম্পত্তির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রাজধানীর গুলশানে ৮ কাঠা জমির ওপর বাড়ি, যার দলিলমূল্য ১০ কোটি টাকা। এছাড়া পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় ৬ দশমিক ১৮ একর জমি, যার দলিলমূল্য ১০ কোটি ৫৫ লাখ টাকা এবং উত্তরায় ২১ দশমিক ২১ কাঠা জমি রয়েছে।
নজরুল ইসলামের স্ত্রী তাসলিমা ইসলামের নামে থাকা গুলশান, খিলক্ষেত, ক্যান্টনমেন্ট, বাড্ডা, সূত্রাপুর, টঙ্গীবাড়ী ও গাজীপুরের মোট ২২টি দলিলের স্থাবর সম্পত্তিও ক্রোকের আদেশের আওতায় এসেছে।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, এসব সম্পত্তির দাপ্তরিক ক্রয়মূল্য ১৯ কোটি ২২ লাখ ৫৪ হাজার টাকা।
এর মধ্যে গুলশান ও বাড্ডায় বিভিন্ন ফ্ল্যাট ও জমি এবং খিলক্ষেতে আবাসিক প্লট ও ভবন রয়েছে।
নজরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী তাসলিমা ইসলামের নামে রেজিস্ট্রিকৃত ক্রোককৃত এসব সম্পত্তির সরকারি বা দাপ্তরিক ক্রয়মূল্য মিলিয়ে ৫৭ কোটি ৬১ লাখ টাকার বেশি। তবে এসব সম্পত্তির বর্তমান বাজারমূল্য সরকারি ক্রয়মূল্যের তুলনায় বহুগুণ বেশি বলে দুদকের আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদক জানিয়েছে, নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সংস্থাটির সমন্বিত জেলা কার্যালয় (সজেকা), ঢাকা-১-এ একাধিক মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই দায়ের করা মামলাও রয়েছে।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর একটি মামলায় নজরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি বিভিন্ন স্থাবর সম্পদের তথ্য দিয়েছেন বলেও দাবি করেছে দুদক।
এদিকে নজরুল ইসলাম ও তার স্ত্রীর বিদেশে থাকা সম্পদের বিষয়েও তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে দুদক। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সম্পদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিতে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
দুদকের তথ্যমতে, নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সংস্থাটিতে মোট ১০টি অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি অভিযোগের তদন্ত শেষে মামলা করা হয়েছে। বাকি চারটি অভিযোগের তদন্ত এখনো চলমান।
উল্লেখ্য, দুদকের দায়ের করা ৩৫(০৭)২৫ নম্বর মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে নজরুল ইসলাম বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
এ ছাড়া ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রায় ৪০ লাখ গ্রাহকের জমাকৃত অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে দায়ের করা মামলার তদন্ত শেষে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ১ হাজার ৯৪ কোটি টাকার অভিযোগ এনে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছে। আদালত ওই চার্জশিট গ্রহণ করেছেন।
তবে আদালতে অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এসব অভিযোগকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায় না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


