বেসিক ব্যাংক পিএলসির শাখা ব্যবস্থাপক সম্মেলন ও ব্যবসায়িক পর্যালোচনা সভা শনিবার রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনের মুক্তি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হেলাল আহমেদ চৌধুরী প্রধান অতিথি হিসেবে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু মো. মোফাজ্জেল। তিনি স্বাগত বক্তব্যে সম্মেলনে উপস্থিত শাখা ও উপশাখা ব্যবস্থাপকসহ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অভিনন্দন জানান।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ব্যাংকের পরিচালক—সাবেক অতিরিক্ত সচিব এবং বর্তমানে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সদস্য মুন্সি আব্দুল আহাদ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের যুগ্ম সচিব শেখ ফরিদ, সরকারের অবসরপ্রাপ্ত গ্রেড-১ কর্মকর্তা ড. আবু সালেহ মোস্তফা কামাল, সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফারুক আহম্মেদ, আইনজীবী মো. লুৎফুর রহমান এবং অবসরপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ ব্যাংকার মো. খায়রুল কবির, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও বেসিক ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের পর্যবেক্ষক রূপ রতন পাইন।
এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপব্যবস্থাপনা পরিচালকদ্বয় সুভাষ চন্দ্র দাস, এফসিএ, এফসিএমএ, মো. হাসান ইমাম, মহাব্যবস্থাপক মো. ইসমাইল, মো. মমিনুল হক, মো. নাসির উদ্দীন, সুমিত রঞ্জন নাথ, মো. গোলাম সাঈদ খান, সাইদুর রহমান সোহেল, শাখা ও উপশাখা ব্যবস্থাপকরা এবং প্রধান কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে চেয়ারম্যান হেলাল আহমেদ চৌধুরী বলেন, একসময় বেসিক ব্যাংক নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সেই সংকট মোকাবিলা করে ব্যাংককে ক্রমান্বয়ে উন্নতির পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকের আমানত প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা বৃদ্ধির প্রতিফলন। এ আস্থা ধরে রাখতে হবে এবং গ্রাহকসেবার মানোন্নয়নের মাধ্যমে টেকসই ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, একসময় যে ব্যাংক অন্যদের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করত, বর্তমানে সেই বেসিক ব্যাংক দেশীয় ও বৈদেশিক মুদ্রায় বাজারে ঋণ প্রদান করছে। এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেদের সমন্বয় করতে হবে। প্রযুক্তিগত উন্নয়নে কোনোভাবেই পিছিয়ে থাকা যাবে না। বিশেষ করে বাংলা কিউআর সেবার সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
খেলাপি ঋণ আদায়ের ওপর গুরুত্বারোপ করে চেয়ারম্যান বলেন, ব্যাংকিংয়ের প্রচলিত নিয়মনীতি যথাযথভাবে অনুসরণ করে খেলাপি ঋণ আদায় কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে। ঋণ আদায়ে আইনি প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও কার্যকর করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সব নির্দেশনা কঠোরভাবে পরিপালন, কর্মক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। লোকসানি শাখাগুলোকে লাভজনক শাখায় রূপান্তরের মাধ্যমে ব্যাংকের আয় বৃদ্ধিতে তিনি সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিকভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। এ সময় ব্যাংকের সার্বিক উন্নয়নে সহযোগিতার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের যুগ্ম সচিব শেখ ফরিদ দেশের ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতির সঙ্গে বেসিক ব্যাংকের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের তুলনামূলক পর্যালোচনা তুলে ধরে ব্যাংকের উন্নয়নে কর্মকর্তাদের আরও আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। তিনি নতুন করে খেলাপি ঋণ সৃষ্টি রোধ, স্বল্পসুদে আমানত সংগ্রহ বৃদ্ধি এবং কমিশন আয়সহ সুদবহির্ভূত আয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। শেখ ফরিদ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মহোদয়ের সভাপতিত্বে বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সভায় প্রদত্ত বিস্তারিত নির্দেশনা যথাযথভাবে পরিপালনের ওপর জোর তাগিদ দেন।
সরকারের অবসরপ্রাপ্ত গ্রেড-১ কর্মকর্তা ড. আবু সালেহ মোস্তফা কামাল ব্যাংকের শাখায় সেবার গুণগত মান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি ব্যাংকের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরও সুদৃঢ় করতে নিয়মিত সমন্বয় সভা আয়োজনের পরামর্শ দেন।
সাবেক অতিরিক্ত সচিব মুন্সি আব্দুল আহাদ ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ছোট-বড় সব শ্রেণির গ্রাহককে সমান গুরুত্ব ও সম্মানের সঙ্গে সেবা প্রদান করতে হবে। কোনো গ্রাহক যেন অবহেলার শিকার না হন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। তিনি নতুন ঋণ প্রদান এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে সর্বোচ্চ তাগিদ দেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও বেসিক ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের পর্যবেক্ষক রূপ রতন পাইন দেশের ভালো ব্যাংকগুলোর অভিজ্ঞতা ও কার্যকর কৌশল থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে বেসিক ব্যাংকের উন্নয়নে তা কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার আওতায় ঋণ বিতরণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি ব্যাংকের নতুন ঋণ বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক জারীকৃত সব সার্কুলার যথাযথভাবে পরিপালনের তাগিদ দেন।
অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার মো. খায়রুল কবির দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যমান শিল্পসম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন। তিনি স্থানীয় শিল্পের সম্ভাবনা বিবেচনায় ক্লাস্টারভিত্তিক পদ্ধতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতে অর্থায়ন বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অভিজ্ঞ আইনজীবী মোঃ লুৎফুর রহমান ব্যাংকের স্বার্থ সংরক্ষণে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স আহরণ বৃদ্ধির ওপর বিশেষ তাগিদ দেন। তিনি খেলাপি ঋণ আদায়ে আইনি প্রক্রিয়া জোরদার করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফারুক আহম্মেদ আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং রেমিট্যান্স আহরণ বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যাংকের ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরামর্শ দেন। এছাড়া তিনি স্বল্প সুদের আমানত সংগ্রহের ওপর জোর দেন।
সভাপতির বক্তব্যে ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু মো. মোফাজ্জেল বলেন, ব্যাংকের নির্ধারিত ব্যবসায়িক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থার সব বিধিবিধান কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। গ্রাহকসেবার মানোন্নয়ন, আমানত সংগ্রহ বৃদ্ধি, ঋণ আদায় জোরদার এবং নতুন খেলাপি ঋণ সৃষ্টি রোধে শাখা ও উপশাখা ব্যবস্থাপকদের আরও দায়িত্বশীল ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি ব্যাংকের সার্বিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে সম্মিলিত উদ্যোগ, পেশাদারত্ব ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সম্মেলনে ব্যাংকের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সার্বিক অগ্রগতি পর্যালোচনার পাশাপাশি আমানত সংগ্রহ, ঋণ বিতরণ ও আদায়, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণ, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য, রেমিট্যান্স আহরণ এবং আয় বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কৌশলগত বিষয়ে আলোচনা করা হয়। এ সময় শাখা ও উপশাখা ব্যবস্থাপকদের ব্যবসায়িক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, সেবার মানোন্নয়ন এবং ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


