শিল্পখাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ সাশ্রয়, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে সমন্বিত ‘সোলার ইকোসিস্টেম’ উন্মোচন করেছে দেশের প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ওয়ালটন। এ ব্যবস্থার আওতায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সংরক্ষণের পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সৌরশক্তির সাহায্যে ফ্রিজ, এসি, টিভিসহ বিভিন্ন গৃহস্থালি পণ্য পরিচালনার প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে।
শনিবার রাজধানীর বসুন্ধরায় ওয়ালটন করপোরেট অফিসে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ‘ওয়ালটন সোলার ইকোসিস্টেম’ উদ্বোধন করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
ওয়ালটন জানিয়েছে, নিজস্ব কারখানায় ছাদভিত্তিক (রুফটপ) ও ভাসমান (ফ্লোটিং) সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ৩২ মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এ পরিমাণ বিদ্যুৎ একটি বড় জেলা শহরের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার সমান। উৎপাদিত সৌরবিদ্যুতের বড় অংশ নিজস্ব উৎপাদন কার্যক্রমে ব্যবহারের পাশাপাশি নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডেও বছরে গড়ে প্রায় ১১৫০ মেগাওয়াট-ঘণ্টা সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহ করছে ওয়ালটন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির চেয়ারম্যান এস এম শামছুল আলম, ভাইস চেয়ারম্যান এস এম আশরাফুল আলম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম মাহবুবুল আলম, পরিচালক এস এম রেজাউল আলম, এস এম মঞ্জুরুল আলম অভি এবং তাহমিনা আফরোজ তান্না।
উদ্বোধনের পর অর্থমন্ত্রী ওয়ালটনের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন প্যানেল, সোলার পাওয়ার কেবল, স্টোরেজ ইনভার্টার ও ব্যাটারি এবং সোলার হাইব্রিড প্রযুক্তিনির্ভর ফ্রিজ, এসি ও স্মার্ট টিভিসহ বিভিন্ন পণ্য ঘুরে দেখেন। এ ছাড়া সৌরবিদ্যুৎচালিত ওয়াশিং মেশিন, ইলেকট্রিক কুকার, ওভেন, রাইস কুকার, বিএলডিসি ফ্যান, সোলারভিত্তিক পেডেস্টাল ও টেবিল ফ্যান, বাল্ব এবং স্ট্রিট লাইটের প্রযুক্তি ও জ্বালানিসাশ্রয়ী বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অবহিত হন তিনি।
সৌরবিদ্যুৎ ও প্রচলিত গ্রিড বিদ্যুতের সমন্বয়ে সোলার হাইব্রিড প্রযুক্তির এসি, রেফ্রিজারেটর ও স্মার্ট টিভি পরিচালনার মাধ্যমে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নতুন সুযোগ তৈরি করায় ওয়ালটনের প্রশংসা করেন অর্থমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সৌরবিদ্যুৎ পরিবেশবান্ধব। ওয়ালটন সৌরশক্তির মাধ্যমে যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা সারা বাংলাদেশে সম্প্রসারিত হবে বলে তিনি আশা করেন।
তিনি বলেন, “সোলারের মাধ্যমে আগামী এক-দুই বছরে দেশে বড় অঙ্কের বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। এর ফলে কম খরচে জনগণের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। বিদেশ থেকে জ্বালানি আমদানি কমবে। ফলে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে। পরনির্ভরশীলতা কমে যাবে।”
সৌরশক্তির বহুমুখী ব্যবহার সম্পর্কে তিনি বলেন, “সোলারের মাধ্যমে শুধু বাতি নয়, ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিন, ওভেন থেকে শুরু করে সব ধরনের ইলেকট্রনিকস পণ্য ব্যবহার করা যাবে। আমরা আশা করছি, দেশের সব মানুষ সৌরশক্তি ব্যবহারের বিষয়ে এগিয়ে আসবেন।”
সবুজ ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়তে ভূমিকা রাখবে: ওয়ালটন চেয়ারম্যান
ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির চেয়ারম্যান এস এম শামছুল আলম বলেন, ‘ওয়ালটন সোলার ইকোসিস্টেম’ গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে সবুজ ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলতেও এ উদ্যোগ সহায়ক হবে।
প্রতিষ্ঠানটির ভাইস চেয়ারম্যান এস এম আশরাফুল আলম বলেন, ওয়ালটন সোলার ইকোসিস্টেম পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও জাতীয় গ্রিডে সঞ্চালনের পাশাপাশি গৃহস্থালির দৈনন্দিন কাজে সৌরশক্তিনির্ভর পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতাসম্পন্ন একটি সমন্বিত প্রযুক্তিব্যবস্থা।
তিনি বলেন, এ উদ্যোগ ওয়ালটনের ব্যবসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। এর মাধ্যমে কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা ও মৌলভিত্তি আরও শক্তিশালী করে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মূল্য সৃষ্টি করাই তাঁদের লক্ষ্য।
‘মেড ইন বাংলাদেশ’ থেকে বিশ্ববাজারে প্রযুক্তির সক্ষমতা
ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম মাহবুবুল আলম বলেন, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও কার্যকর ব্যবহারের সমন্বিত প্রযুক্তিব্যবস্থাই ওয়ালটন সোলার ইকোসিস্টেম।
তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ নয়; বরং বাংলাদেশেই প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও উন্নয়ন ঘটিয়ে বিশ্ববাজারে দেশের সক্ষমতা তুলে ধরা।”
ওয়ালটনের এ সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশের হাই-টেক শিল্পখাতের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, অগ্রগতি ও সক্ষমতা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে মনে করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ওয়ালটনের সোলার ইকোসিস্টেমের আওতায় হাইব্রিড প্রযুক্তিতে পরিচালিত হবে ফ্রিজ, এসি ও টিভি। পর্যাপ্ত সূর্যালোক থাকলে এসব পণ্য ব্যাটারি ছাড়াই সরাসরি সৌরবিদ্যুতে চলতে পারবে। সৌরবিদ্যুতের সরবরাহ প্রয়োজনের তুলনায় কম হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জাতীয় গ্রিড থেকে ঘাটতি বিদ্যুৎ গ্রহণ করে পণ্যগুলো চালু থাকবে। ফলে সৌরবিদ্যুতের প্রাপ্যতা অনুযায়ী গ্রিডের বিদ্যুতের ব্যবহার কমানো সম্ভব হবে।
এ ব্যবস্থায় এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (ইএসএস) প্রযুক্তির সমন্বয়ে সৌরবিদ্যুৎনির্ভর নতুন মডেলের ওয়াশিং মেশিন, ইলেকট্রিক কুকার ও ওভেন যুক্ত করা হয়েছে। দিনের বেলায় সৌর প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যাটারিতে সংরক্ষণ করে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার করা যাবে। এ ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে ওয়াশিং মেশিন, ইলেকট্রিক কুকার, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, রাইস কুকার এবং বিএলডিসি ফ্যানের মতো পণ্যও পরিচালনা করা যাবে।
ওয়ালটনের ইনভার্টার ব্যাটারিতে সোলার চার্জার ও এসি চার্জার সমন্বিত থাকায় সৌরবিদ্যুৎ এবং জাতীয় গ্রিড—উভয় উৎস থেকে ব্যাটারি চার্জ করা যাবে।
ওয়ালটনের সোলার ইকোসিস্টেমের আওতায় নতুন মডেলের তাকিওন ই-বাইকে যুক্ত করা হয়েছে ইন্টেলিজেন্ট ব্যাকআপ পাওয়ার সাপ্লাই সিস্টেম। এতে রয়েছে স্মার্ট, পরিবেশবান্ধব ও বহুমুখী এনার্জি সল্যুশনসমৃদ্ধ ব্যাটারি।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, এ প্রযুক্তির ব্যাটারি ই-বাইককে একটি মোবাইল এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমে রূপান্তর করবে। এর মাধ্যমে পরিবহন, সৌরশক্তি সংরক্ষণ এবং জরুরি বিদ্যুৎ সরবরাহের সুবিধা একসঙ্গে পাওয়া যাবে।
সোলার ইকোসিস্টেমের আওতায় সৌরবিদ্যুতের নিরাপদ ও স্বাভাবিক সঞ্চালন নিশ্চিত করতে ফটোভোলটাইক বা সোলার কেবলও এনেছে ওয়ালটন। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এসব কেবল অতিবেগুনি রশ্মি (ইউভি), আর্দ্রতা ও বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশে ব্যবহারের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে।
সোলার কেবলে নমনীয় টিনড কপার কন্ডাক্টর ও বিশেষ ইনসুলেশন ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নিরাপদ ও দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ সংযোগের সুবিধা পাওয়া যাবে।
ওয়ালটনের এ সমন্বিত সোলার ইকোসিস্টেমের মাধ্যমে শিল্পকারখানায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি গৃহস্থালি পর্যায়েও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, এ ধরনের প্রযুক্তির বিস্তার বিদ্যুৎ সাশ্রয়, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


