ট্রাইব্যুনালে তদন্ত কর্মকর্তার জবানবন্দি

হাসিনার বিরোধী মত দমনের কারিগর জিয়াউল, হত্যা করেন কমপক্ষে ১৫০

হাসিনার বিরোধী মত দমনের কারিগর জিয়াউল, হত্যা করেন কমপক্ষে ১৫০

ষড়যন্ত্রমূলক নীল নকশার নির্বাচনের মাধ্যমে ২০০৯ সালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী ও নিষ্কণ্টক করতে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোকে ব্যবহার করে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও ভিন্নমত দমন এবং নির্মূলের পথ বেছে নেয় তারা। বলপূর্বক অপহরণ, আটক, গুম, নির্যাতন ও হত্যার মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছিল এক ভয়ের সংস্কৃতি। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অনুমোদনে একশ্রেণির পদলেহী ও ক্ষমতালিপ্সু কর্মকর্তা বর্বরতম এসব অপকর্মে জড়িত ছিলেন। হাসিনার এসব মানবতাবিরোধী অপরাধের অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন সেনাকর্তা জিয়াউল আহসান। এ সময়ে কমপক্ষে ১৫০ জনকে হত্যা করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামের জবানবন্দিতে এসব বর্ণনা উঠে আসে।

আওয়ামী লীগের দেড় দশকের দুঃশাসনের সময় শতাধিক মানুষকে গুম, নির্যাতন ও খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বরখাস্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে পঞ্চদশ সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি।

জবানবন্দিতে রফিকুল ইসলাম বলেন, ২০০৯ সালে জিয়াউল আহসান মেজর অবস্থায় র‍্যাবে পোস্টিং পাওয়ার পর থেকে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শেখ হাসিনার অত্যন্ত আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। ফলে ২০২৪ সালে মেজর জেনারেল হিসেবে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর আগ পর্যন্ত তাকে কখনোই তার মাতৃবাহিনী তথা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ফেরত যেতে হয়নি। তিনি সবসময়ই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন বাহিনী বা সংস্থায় কাজ করেছেন। পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় কোর্স বা প্রশিক্ষণ গ্রহণ না করে এবং কোনো ব্যাটালিয়ন, ব্রিগেড বা ফরমেশন কমান্ডের অভিজ্ঞতা ছাড়াই জিয়াউল মেজর জেনারেল পর্যন্ত পদোন্নতি পান, যা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গৌরবময় পেশাদারিত্বের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা।

জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ২০০৯ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত জিয়াউল র‍্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন অসংখ্য বলপূর্বক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে তিনি সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। অগণিত হত্যাকাণ্ড ও গুমসহ অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধে তার সরাসরি নির্দেশ, অনুমোদন ও জ্ঞাতসারে তার বিশ্বস্ত র‍্যাব সদস্যরা এসব সংঘটিত করত। বলপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেরই শেষ পরিণতি কী হয়েছিল, তা আমাদের অজানাই রয়ে গেছে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের কাউকে কাউকে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হতো, আবার কাউকে কাউকে বনদস্যু নির্মূলের অভিযানের নামে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে সাজানো নাটক মঞ্চস্থ করা হতো। কাউকে কাউকে দীর্ঘদিন আটক রাখার পর মিথ্যা মামলা দিয়ে বিভিন্ন আদালতে চালান দেওয়া হতো। কাউকে গুলি করে পেট ফেঁড়ে নদীতে তলিয়ে দেওয়া হতো। যেসব ক্ষেত্রে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি জনগণের সামনে চলে আসত, সেসব ক্ষেত্রে লোকদেখানো প্রশাসনিক নির্বাহী তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের বৈধতা দেওয়া হতো। এ ছাড়া তদন্ত রিপোর্টে সুরতহাল, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ও পুলিশ প্রতিবেদনে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার উদ্দেশ্যে মৃত্যুর কারণ গোপন রেখে ভুল ও অসত্য রিপোর্ট প্রদানে বাধ্য করা হতো; যা আমার তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে। যেমন—এই মামলার ভিকটিম নজরুল ইসলামের সুরতহাল রিপোর্ট ও পোস্টমর্টেম রিপোর্ট সঠিকভাবে প্রস্তুত করা হয়নি, যার সঙ্গে জিয়াউল সরাসরি জড়িত।

জবানবন্দিতে মামলার এই তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, আমার তদন্তে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে, তা হলো—২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে দেশব্যাপী পদ্ধতিগতভাবে, ব্যাপক মাত্রায় এবং লক্ষ্য নির্ধারণপূর্বক বলপূর্বক অপহরণ, আটক, গুম, নির্যাতন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিলেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের অংশ হিসেবে ২০১১ সালের ১১ জুলাই রাতে র‍্যাবের তৎকালীন গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক জিয়াউল আহসান র‍্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের একটি দল এবং র‍্যাব-৩ ব্যাটালিয়নের একটি দল নিয়ে আগে থেকেই র‍্যাবের অবৈধ হেফাজতে থাকা ভিকটিম সজলসহ তিনজন বন্দীকে নিয়ে র‍্যাব সদর দপ্তর থেকে রওনা হন। টঙ্গী হয়ে ঢাকা বাইপাস সড়ক ধরে কিছুদূর যাওয়ার পর গাড়ি থামিয়ে জিয়াউলসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা বন্দীদের গুলি করে হত্যা করেন।

জবানবন্দিতে রফিকুল বলেন, সাবেক বিডিআর সদস্য নজরুল ইসলাম মল্লিক নিজ পরিচয় গোপন করে গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ায় মধুমতি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কর্মরত থাকা অবস্থায় র‍্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের সদস্যরা ২০১৫ সালের ১৫ মার্চ তাকে আটক করে গোপন স্থানে বন্দি রাখেন। মে মাসের ১০ থেকে ১৫ তারিখের মধ্যে নজরুল ইসলাম মল্লিকসহ আরও ৩ থেকে ৪ জনকে নিয়ে জিয়াউলের নেতৃত্বে র‍্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের একটি দল এবং র‍্যাব-৮ ব্যাটালিয়নের দুজন সদস্যকে বরগুনার বলেশ্বর নদীতে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। হত্যার পর তাঁদের পেট ছুরি দিয়ে ফেঁড়ে ফেলে এবং শরীরে সিমেন্টের ব্লক বেঁধে পানিতে ডুবিয়ে দেয়। আলকাছ মল্লিকসহ বিভিন্ন মাঝিদের ট্রলার ভাড়া করে বলেশ্বর নদীতে এসব হত্যা করা হতো। বিষয়টি আলকাছ মল্লিক তার কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তিকে জানিয়ে দেন। বিষয়টি জিয়াউল জানতে পেরে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। পরে জিয়াউলের নির্দেশে র‍্যাবের কিছু সদস্য আলকাছ মল্লিককে তাঁর নিজ এলাকা থেকে ডেকে নিয়ে যান। এরপর থেকে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, জিয়াউলের নেতৃত্বে ২০১১ সালের ১২ নভেম্বর সুন্দরবনের নিশানখালীতে বনদস্যু দমনের নাটকের নামে মাসুদ ও মান্নান নামের দুজন বন্দীকে হত্যা করা হয়। ২০১২ সালের ১৬ মার্চ সুন্দরবনের দক্ষিণ অংশে ভোলা নদীর মরাভোলা খালের দক্ষিণে বনদস্যু অভিযানের নামে জিহাদ, সোহাগ, আল-আমিন, আসাদ ও বেল্লালকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ২০১২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি র‍্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের একটি দল নিয়ে বরগুনার পাথরঘাটায় চরদুয়ানী ঘাট থেকে সুন্দরবনের কটকা এলাকার উদ্দেশে ট্রলারে রওনা হন তিনি। এ সময় শিশির কুমার মণ্ডল, হেমন্ত মেম্বার, বাচ্চু, জামালসহ ৮ জন ব্যক্তিকে চোখ ও হাত বেঁধে ট্রলারে ওঠানো হয়। ট্রলারটি সুন্দরবনের দিকে অগ্রসর হওয়ার পথে অজ্ঞাতনামা ৪ জন ব্যক্তিকে জিয়াউলের নির্দেশে গুলি করে হত্যা করা হয়। তারপর তাঁদের পেট ফেঁড়ে সিমেন্টের ব্লক বেঁধে বলেশ্বর নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। এরপর সুন্দরবনের কটকা ফরেস্ট পেট্রোল পোস্ট থেকে ২ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে নিয়ে শিশির কুমার মণ্ডল, হেমন্ত মেম্বার, বাচ্চু, জামাল মুন্সী ও অজ্ঞাতনামা একজনসহ মোট ৪ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, জিয়াউল আহসান আইন ও বিচারের তোয়াক্কা না করে ভিকটিম সজল, সাবেক বিডিআর সদস্য নজরুল, আলকাছ মল্লিক, মাসুদ, মান্নান, জিহাদ, সোহাগ, আল-আমিন, আসাদ, বেল্লাল, শিশির কুমার মণ্ডল, হেমন্ত মেম্বার, বাচ্চু, জামাল মুন্সিসহ অজ্ঞাতনামা কমপক্ষে ১৫০ জন ব্যক্তিকে হত্যা করেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন