রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে গণহত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য বুধবার দিন ধার্য রয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে এই মামলার শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। অপর দুই সদস্য হলেনÑবিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
এর আগে গত ২৭ আগস্ট হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। ওই দিন অভিযোগ আমলে নিয়ে হাসিনাসহ পলাতক ৩১ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল। পরে এই মামলায় সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে মোট ১১ জন আসামি গ্রেপ্তার রয়েছেন।
গত ৩ সেপ্টেম্বর হাসিনাসহ পলাতক ৩০ আসামিকে আদালতে হাজিরে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির আদেশ দেওয়া হয়। এরপর পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিলেও তারা হাজির হয়নি। পরে মামলার পরবর্তী প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত ১৬ সেপ্টেম্ব ৩০ আসামিকে পলাতক বিবেচনায় তাদের পক্ষে স্টেট ডিফেন্স বা রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগের আদেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি ৭ অক্টোবর দিন ধার্য করা হয়েছে।
এই মামলায় গ্রেপ্তার আসামিরা হলেনÑতৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, সাবেক ডিআইজি আব্দুল জলিল মণ্ডল, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, ৭১ টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু ও ফারজানা রুপা।
পলাতক আসামিরা হলেনÑফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, তৎকালীন বন ও পরিবেশমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, তৎকালীন যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন মাহমুদ, গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ও মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, সাবেক আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক মো. মোখলেছুর রহমান, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, তৎকালীন র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপস) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মজিবুর রহমান, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি শেখ মুহাম্মাদ মারুফ হাসান, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি) মাহবুব হোসেন, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি) মনিরুল ইসলাম, তৎকালীন ডিএমপির ডিসি (সদর দপ্তর ও প্রশাসন) মো. আনোয়ার হোসেন, তৎকালীন ডিএমপির ডিসি (ট্রাফিক-দক্ষিণ) আশরাফুজ্জামান, তৎকালীন ডিএমপির এডিসি (মতিঝিল জোন) এসএম মেহেদী হাসান, সাবেক ডিআইজি হারুন-অর-রশীদ, সাবেক ডিআইজি বিপ্লব কুমার সরকার, সাবেক ডিআইজি সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম, তৎকালীন ডিএমপির এডিসি (মতিঝিল বিভাগ) মো. আসাদুজ্জামান, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এসএম শিবলী নোমান এবং তৎকালীন মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিএম ফরমান আলী।
অভিযোগের বিবরণে বলা হয়েছে, তৎকালীন সরকার ২০১৩ সালের ৫ মে পরিকল্পিতভাবে হেফাজতের নিরস্ত্র নেতাকর্মীদের ওপর গণহত্যা চালায়। ওই দিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ম খা আলমগীর, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামছুল হক টুকু, খাদ্যমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এবং সরকারের দায়িত্বশীল বিভিন্ন মন্ত্রী, এমপি, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীদের যেকোনো উপায়ে রাতের মধ্যেই শাপলা চত্বর থেকে বিতাড়িত করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরকে নির্দেশ দেন। ওপরের নির্দেশ পেয়ে পুলিশের তৎকালীন আইজিপি হাসান মাহামুদ খন্দকারের নেতৃত্বে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির প্রধানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে পুলিশ কন্ট্রোলরুমে যৌথ সভা করেন। শাপলা চত্বর ও এর আশপাশের এলাকায় সশস্ত্র অভিযানের সিদ্ধান্ত নেন। অভিযান পরিচালনার লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিজ নিজ বাহিনীর নামে অভিযানের নামকরণ করে। পুলিশের অভিযানের নামকরণ করা হয় ‘অপারেশন সিকিউরড শাপলা’, র্যাব অভিযানের নাম দেয় ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’ এবং বিজিবি কর্তৃক ‘অপারেশন ক্যাপচার শাপলা’ নাম দেওয়া হয়। তবে অভিযানটি ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’ নামে পরিচিতি পায়। অভিযানের নামকরণের ধরন থেকে এটা স্পষ্ট যে, এটা কোন সাধারণ অভিযান ছিল না।
অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, রাত আড়াইটার দিকে সর্বোচ্চ স্কেলে অভিযান শুরু হয়। সমাবেশস্থলে উপস্থিত থাকা হেফাজতের নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সাউন্ড গ্রেনেড, কালার স্মোক গ্রেনেড, মাল্টি ইমপ্যাক্ট গ্রেনেড, খ্রি-বল প্রজেক্টাইল, টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে। ফলে ঘটনাস্থলে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়। এ সময় হেফাজতের নেতাকর্মীরা জীবন বাঁচাতে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করেন। হতবিহ্বল হেফাজতের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন আশ্রয় খুঁজে নিজেদের জীবন রক্ষার চেষ্টা করেন। এর মধ্যেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হেফাজতের নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে বেপরোয়াভাবে শর্টগান ও মরণাস্ত্র দিয়ে গুলি চালায়। হেফাজতের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন পথে ঢাকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। যাওয়ার পথে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের দ্বারা হামলা ও হতাহতের স্বীকার হন। রাতের অভিযান এবং দিনব্যপী হামলা ও আক্রমণে শাপলা চত্বর, মতিঝিল ও এর আশপাশের এলাকায় হেফাজতে ইসলামের ৩২ জন নেতাকর্মী শহীদ ও নিখোঁজ হওয়ার তথ্য-প্রমাণ হওয়া গেছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানার মাদানীনগরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও আশপাশের এলাকায় ২০ জন শহীদ হন, চট্টগ্রামে পাঁচজন এবং কুমিল্লায় একজন শহীদ হন ।
এ ঘটনায় আসামিদের বিরুদ্ধে একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর ওপর পরিকল্পিতভাবে গণহত্যা চালানোর অভিযোগ আনা হয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


