জুলাই বিপ্লবের উত্তাল সময়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ছাত্রজনতার কর্মসূচিতে অংশ নেন বাবা-মায়ের আদরের সন্তান মাহমুদুর রহমান সৈকত। ফারহান ফাইয়াজ শহীদ হওয়ার ঘটনা জেনে আরও দৃঢ়ভাবে আন্দোলনের অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সে। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই দুপুরের খাবার খেয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যায় সৈকত। এরপর আন্দোলনে অংশ নিয়ে পুলিশের গুলিতে নির্মমভাবে শহীদ হন। পরে হাসপাতালে তার গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত লাশ পাওয়া যায়। ফ্যাসিবাদের বর্বর হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে একটি পরিবারে আশা-স্বপ্ন চিরদিনের জন্য নিভে যায়। প্রিয়তম সন্তান হারিয়ে এক বুক হাহাকার নিয়ে বিচারের অপেক্ষায় দিন পার করছেন বাবা-মা।
বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ শহীদ মাহমুদুর রহমান সৈকতের বোন সাবরিনা আফরোজ সেবন্তীর জবানবন্দিতে এসব তথ্য উঠে আসে।
জুলাই বিপ্লবে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ৯ জনকে হত্যার ঘটনায় ঢাকা দক্ষিণ সিটির সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপস এবং সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে নবম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি।
জবানবন্দিতে সাবরিনা আফরোজ সেবন্তী জানান, তার বর্তমান বয়স ২৪ বছর। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি জানান, সৈকত আন্দোলনে অংশ নিতে চাইলে প্রথমে তার মা তাকে বাধা দেন। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তন্বীকে ছাত্রলীগ নির্যাতন করলে তার রক্তাক্ত ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয়। তখন সে আবারও আন্দোলনে যেতে চায়। ওইদিন বিকেলে সৈকত মাকে না জানিয়ে সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেয়। পরে আন্দোলনস্থল থেকে সে মাকে ফোন করে বাসার দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখতে বলে। কারণ আশপাশে অনেক গোলাগুলি হচ্ছে। পুলিশ ও ছাত্রলীগ এবং যুবলীগের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গুলি করছে। ওইদিন রাতে ফেসবুকে শহীদ ফারহান গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হওয়ার ঘটনা জানলে সে আরও ইমোশনাল হয়ে পড়ে।
জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, পরবর্তীতে ১৯ জুলাই শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে দুপুরের খাবার খেয়ে নূরজাহান রোডে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয় সৈকত। পরে আমার মা সৈকতকে বারবার কল করলেও ধরে না। এরপর মা আমাকে ফোন করে সৈকতের খবর নিতে বলে। আমি ফোন করলে সে কলটি রিসিভ করে। তখন আমি তাকে ধমক দিয়ে বাসায় যেতে বলি। সে জানায়, একটু পরে বাসায় চলে যাবে। পরে আমার বাবা বারবার সৈকতকে কল করছিলেন। তখন একজন সহযোদ্ধা ফোনটি রিসিভ করে বলে, এই ফোনটি যার, সে পুলিশের গুলিতে মারা গেছেন। আপনারা দ্রুত সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে যান—পরে লাশও পাবেন না। তখন বাবা আমার কাজিন সাইফুর রহমান হায়দার কনক ও আমার বন্ধু আরাফাত হোসেনকে ফোনে বলেন, সৈকত গুলিবিদ্ধ হয়ে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আছে। তোমরা দ্রুত হাসপাতালে চলে যাও। তারা দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে দেখে, মর্গের সামনে স্ট্রেচারে সৈকতের রক্তাক্ত লাশ পড়ে আছে। তার মাথার বাম পাশের কানের উপর দিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে ডান পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়।
জবানবন্দিতে শহীদের বোন আরও বলেন, পরবর্তীতে বিষয়টি আমি আমার মায়ের কাছ থেকে শুনে দ্রুত সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা করি। আমি হাসপাতালে যাওয়ার পথে অনেক জায়গায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে পুলিশকে গুলি করতে দেখি। হাসপাতালে গিয়ে আমার ভাইয়ের লাশ দেখতে পাই এবং পাশেই শহীদ রাজুর লাশসহ আরও ৫টি লাশ দেখতে পাই। পরে সেখান থেকে আমার ভাইয়ের লাশ নিয়ে ওইদিন রাত ৯টার দিকে মোহাম্মদপুরের মারকাজুল ইসলামে লাশ গোসল করিয়ে সেখানেই রেখে দিই। আমার ফুফাতো ভাই জানায়, আমার বাসার নিচে পুলিশ ও ছাত্রলীগ, যুবলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা অবস্থান করছিল। রাতেই কারফিউ জারি হয়। পরের দিন বেলা ১১টায় কারফিউ শিথিল থাকায় লাশ নিয়ে দাফন করি।
জবানবন্দি শেষে ভাই হত্যার জন্য তিনি ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা, আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, আসাদুজ্জামান খান কামাল, ফজলে নূর তাপস, জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ মামলার আসামিদের দায়ী করেন এবং তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


