ইনুর সাজা বাড়াতে চলতি সপ্তাহেই আপিল

ইনুর সাজা বাড়াতে চলতি সপ্তাহেই আপিল

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ আট অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুর রায়ের বিরুদ্ধে চলতি সপ্তাহে আপিল করবে প্রসিকিউশন।

রোববার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানান প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল-২। তবে এ সাজা বাড়াতে আপিলের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। চলতি সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা হবে।

গত ৩০ জুন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল। একই সঙ্গে এ মামলার দুটি চার্জে ১ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

ইনুর বিরুদ্ধে আটটি অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। এর মধ্যে ৩ নম্বর অভিযোগে তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে ৬ ও ৭ নম্বর অভিযোগে ১ লাখ করে ২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং উভয় চার্জে ১০ বছর করে দণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া ১, ২, ৪, ৫ ও ৮ নম্বর অভিযোগে খালাস দেয় আদালত। আলাদা আলাদা দণ্ড হলেও তাকে ১০ বছরের সাজা ভোগ করতে হবে।

প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ থেকে হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের তদন্ত সংস্থা। দীর্ঘ তদন্ত শেষে একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর চিফ প্রসিকিউটরের কাছে প্রতিবেদন জমা দেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা। আর এ প্রতিবেদন যাচাই-বাছাইয়ের পর ২৫ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। একই দিন আমলে নিয়ে ইনুর বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল-২। এরপর প্রসিকিউশন-আসামিপক্ষের দীর্ঘ শুনানি শেষে ২ নভেম্বর সুনির্দিষ্ট আটটি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেয় আদালত।

গত বছরের ৩০ নভেম্বর এ মামলায় সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করে প্রসিকিউশন। সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় ১ ডিসেম্বর। তদন্ত কর্মকর্তাসহ জাসদের এই নেতার বিরুদ্ধে মোট ১০ জন সাক্ষ্য দেয়। আসামিপক্ষে সাফাই সাক্ষ্য নেওয়া হয় দুজনের। সাক্ষ্যগ্রহণের এই ধাপের পর চলতি বছরের ২ এপ্রিল থেকে চলতে থাকে যুক্তিতর্ক। এ মামলায় প্রথমেই যুক্তি উপস্থাপন করে আসামিপক্ষ। এরপর প্রসিকিউশনের যুক্তি তুলে ধরা হয়। আর এই পর্ব সম্পন্ন হয় ১৪ মে। ওই দিনই রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে ট্রাইব্যুনাল-২। এরপর ২২ জুন রায় ঘোষণার জন্য দিন নির্ধারণ করা হয়।

এ মামলায় ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছেন ১০ জন। এর মধ্যে চাক্ষুষ সাক্ষী তিনজন, বিশেষজ্ঞ দুজন, ভুক্তভোগী পরিবারের একজন, জব্দতালিকা সাক্ষী দুজন, জেলার সাক্ষী একজন ও তদন্তকারী কর্মকর্তা একজন। এছাড়া ডকুমেন্ট প্রদর্শন করা হয় ২০ সিরিজ ও পাঁচটি বস্তু প্রদর্শনী ।

প্রসিকিউশনের আনা ৮ অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ভারতের মুম্বাইভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘মিরর নাউ’-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আন্দোলনকারীদের বিএনপি-জামায়াত ও সন্ত্রাসী-জঙ্গি হিসেবে আখ্যায়িত করে সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগের উসকানি দেন হাসানুল হক ইনু। ১৯ জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে হওয়া সভায়ও অংশ নেন তিনি। ১৪ দলীয় জোটের ওই বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত তথা নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে দমনে ‘শ্যুট অ্যাট সাইট’ নির্দেশনা কার্যকরেও ভূমিকা রাখেন জাসদের এই সভাপতি।

২০ জুলাই দুপুরে আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে নিজ জেলা কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে আন্দোলনকারীদের ছবি দেখে তালিকা প্রণয়নসহ ব্যবস্থা নিতে ফোনে নির্দেশ দেন। তার এমন নির্দেশনা বাস্তবায়নে পুলিশসহ ১৪ দলীয় জোটের সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে গত বছরের ৫ আগস্ট পর্যন্ত কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি ছোড়েন তৎকালীন এসপি। তাদের গুলিতে নিহত হন শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ। আহত হন বহু নিরীহ মানুষ।

জুলাই আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহার, ছত্রীসেনা নামানো, হেলিকপ্টার দিয়ে গুলি ছুড়ে হত্যা, বোম্বিং, আটক-নির্যাতনের ষড়যন্ত্র কিংবা পরিকল্পনাসহ সব ধরনের উসকানি দিয়ে শেখ হাসিনাকে নির্দেশনা দিতেন ইনু। একইসঙ্গে কারফিউ জারির মাধ্যমে মারণাস্ত্র ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ড সংঘটনসহ নির্যাতন-নিপীড়নকে কৌশলে সমর্থন করেন তিনি।

এছাড়া ২৯ জুলাই শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে হওয়া জোটের আরেকটি সভায় উপস্থিত ছিলেন ইনু। সেখানেও নানা উসকানি দিয়ে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধের প্রস্তাব দেন। ফলে এর মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ১৪ দলীয় জোটের সশস্ত্র ক্যাডারের হত্যাকাণ্ড আর নির্যাতনকে বৈধতা দেন এই আসামি। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের একদিন আগে ৪ আগস্ট কারফিউ জারি করে গুলি ছুড়ে ছাত্র-জনতাকে হত্যাসহ শেখ হাসিনার গৃহীত পদক্ষেপ অনুমোদন করেন ইনু।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...