জুলাই বিপ্লবের প্রথম শহীদ রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বেরোবির সাবেক ভিসি হাসিবুর রশীদসহ ৩০ আসামির সাজার ৮০৯ পৃষ্ঠার বিররণ রয়েছে।
সোমবার চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল প্রেস ব্রিফিংয়ে এই তথ্য তুলে ধরেন। গত বৃহস্পতিবার স্বাক্ষরের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় প্রকাশ করে বলে জানান তিনি। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, রায়ের বিবরণ আমারা যাচাই-বাছাই করে দেখবো। যদি কারো সাজার বিরুদ্ধে আপিল করার প্রয়োজন মনে হয়,তাহলে আমরা অবশ্যই আপিল করবো।
রায়ে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার তথ্য-অনুসন্ধানকারী মিশন কর্তৃক কঠোর ফরেনসিক এবং প্রমাণভিত্তিক পদ্ধতি থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত দ্বারা রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে পেরেছে, রাষ্ট্র-নির্দেশিত সহিংস দমননীতির অধীনে পুলিশের সদস্যদের দ্বারা আবু সাঈদকে ইচ্ছাকৃতভাবে এবং বেআইনিভাবে হত্যা করা হয়েছে।
এই ট্রাইব্যুনালের সামনে উপস্থাপিত প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, ভিডিও প্রমাণ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আচরণের ধরণ ও জাতিসংঘের অনুসন্ধান আরো প্রতিষ্ঠা করে যে, আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং এটি বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে একটি ব্যাপক ও পরিকল্পিতভাবে দমনের অংশ ছিল। যার ফলে এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ধারা ৩(২)(ক)-এর অধীনে মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞার আওতায় পড়ে।
সুতরাং, এই ট্রাইব্যুনাল সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন যে, আবু সাঈদের মৃত্যু একাধিক আঘাতের ফলে সৃষ্ট শক এবং অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের কারণে হয়েছিল। যার মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্রের গুলির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভেদকারী আঘাতও রয়েছে। ট্রাইব্যুনাল এই মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে যে, মৃত্যুটি ছিল পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
গত ৯ এপ্রিল ট্রাইব্যুনাল-২ আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করে। রায়ে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যদণ্ড দেওয়া হয়।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় তিনজনকে। তারা হলেনÑসাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার সাবেক অফিসার ইনচার্জ রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন এবং বেরোবির সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধব।
১০ বছরের সাজাপ্রাপ্তরা হলেনÑরংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. হাসিবুর রশিদ ওরফে বাচ্চু, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টু, বেরোবির গণিত বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল ওরফে আসাদ এবং ছাত্রলীগের বেরোবি শাখার সভাপতি পোমেল বড়ুয়া।
৫ বছরের কারাদণ্ড পাওয়া আসামিরা হলেনÑআরএমপির সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী ওরফে সুমন, সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার আবু মারুফ হোসেন ওরফে টিটু, সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ ওরফে দিশা, ছাত্রলীগের বেরোবি শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসান ওরফে মাসুদ, বেরোবির অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাহাবুবার রহমান ওরফে বাবু ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ডা. সারোয়ার হোসেন ওরফে চন্দন।
তিন বছরের সাজা পাওয়া আসামিরা হলেনÑবেরোবির সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান ওরফে তুফান, সেকশন অফিসার মনিরুজ্জামান পলাশ, বেরোবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমান শামীম, সহ-সভাপতি ফজলে রাব্বী ওরফে গ্লোরিয়াস ফজলে রাব্বী, সহ-সভাপতি আখতার হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহম্মেদ ওরফে আরিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক ধনঞ্জয় কুমার ওরফে টগর, দপ্তর সম্পাদক বাবুল হোসেন, বেরোবির এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুন্নবী মণ্ডল, এমএলএসএস একেএম আমির হোসেন ওরফে আমু ও সিকিউরিটি গার্ড নূর আলম মিয়া।
এ ছাড়া বেরোবির প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ ওরফে আপেলের হাজতবাসকে সাজার মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে বলে গণ্য করে ট্রাইব্যুনাল।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

