আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি

জমটুপি পরানোর পরও যেভাবে ডিজিএফআই কর্মকর্তাকে চিনেছেন আযমী

স্টাফ রিপোর্টার

জমটুপি পরানোর পরও যেভাবে ডিজিএফআই কর্মকর্তাকে চিনেছেন আযমী
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আব্দুল্লাহ হিল আমান আল আযমী

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আযমীকে ২০১৬ সালের ২২ আগস্ট গুম করা হয়। মগবাজারের বাসা থেকে তুলে নেওয়ার সময় তাকে হাতকড়া পরানো হয় এবং চোখ বাঁধা হয়। এরপর জমটুপি পরানো হলে চোখের বাঁধন খানিকটা নিচে নেমে যায়। এসময় তিনি অপহরণকারীদের একজন ডিজিএফআই কর্মকর্তা লেফটেনেন্ট কর্নেল মকছুরুলকে চিনতে পারেন। তবে তিনি তা বুঝতে দেননি।

রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) বা আয়নাঘরে গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাাপ্ত শেখ হাসিনা ও সাবেক-বর্তমান ১২ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দিতে এসব কথা বলেন।

বিজ্ঞাপন

জবানবন্দিতে আযমি বলেন, আমি অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা। ১৯৮১ সালে আমি সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করি। ২০০৯ সালের ২৪ জুন আওয়ামীলীগ সরকার বিনা অপরাধে, বিনা তদন্তে, বিনা বিচারে সেনাবাহিনীর সকল রীতিনীতি ভঙ্গ করে নজিরবিহীনভাবে পেনশনের সকল সুবিধা হরণ করে আমাকে চাকুরি হতে বরখাস্ত করে। এরপর সেনানিবাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে। আমাকে অপহরণের আগ পর্যন্ত সাত বছর দুই মাস গোয়েন্দাবাহিনী দিয়ে তৎকালীন সরকার নানাভাবে হয়রানি করে। ২০২৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর অন্তর্বতীকালীন সরকার অবৈধ বরখাস্তের আদেশ বাতিল করে আমাকে অবসর প্রদান করে।

জবানবন্দিতে আযমি বলেন, ২০১৬ সালের ২২ আগস্ট রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে আমার বড় মগবাজারের বাসায় অনেকগুলো মাইক্রোবাসে করে ৫০/৬০জন সাধারণ পোশাকধারী লোক আসে। বাসার ভিতরে বেশকিছু সংখ্যক লোক প্রবেশ করে। তারা আমাকে হাতকড়া পড়ানোর জন্য হাত এগিয়ে দিতে বলে। একপর্যায়ে নিরুপায় হয়ে আমি দুই হাত এগিয়ে দেই । তারা প্রথমে আমার হাতে হাতকড়া পরায় ও চোখ বাঁধে। লিফটে করে নিচে নামিয়ে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে মাথা ও মুখের ওপর জমটুপি পরিয়ে দেয়। এর কিছুক্ষণ পরে তারা আমাকে নিয়ে রওনা করে। আমার চোখের বাঁধন খানিকটা সরে যাওয়ায় আবছা দেখতে পাই। তাই কোন রাস্তা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল তা আমি বুঝতে পারি। তারা মগবাজার ফ্লাইওভার দিয়ে মহাখালী ব্রিজের নিচে দিয়ে এয়ারপোর্টের পূর্ব দিকের রাস্তা দিয়ে র‍্যাব-১ এর দক্ষিণ গেট দিয়ে ঢুকে এবং উত্তর দিক দিয়ে বেরিয়ে যায় । এরপর মূল রাস্তা পার হয়ে পশ্চিম দিকে র‍্যাব সদর দপ্তরের সামনে দিয়ে এয়ারপোর্টের পূর্ব দিক দিয়ে অভ্যন্তরীণ টার্মিনালের সামনে দিয়ে ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশ করে। তারা কচুক্ষেতে অবস্থিত ডিজিএফআই কমপ্লেক্সে প্রবেশ করে। গাড়ি থেকে নামিয়ে আমাকে ধরে ধরে একটি সেলের ভিতরে ঢুকিয়ে আমার জমটুপি, চোখের বাঁধন ও হাতকড়া খুলে দেয়।

জবানবন্দিতে আমান আযমি বলেন, পরদিন ২৩ আগস্ট ভোরের আলো হলে সেলের দক্ষিণ দিকে দুটো ভেন্টিলেটর দিয়ে ডিজিএফআই কমপ্লেক্সের দক্ষিণে অবস্থিত ঢাকা স্টেশন অফিসার্স মেস-বি চিনতে পারি। এই মেসটি ১৯৮২ সালে নির্মিত হয়েছিল। আমি তখন ঢাকা ক্যান্টমেন্টে চাকুরিরত ছিলাম এবং আমি ওই মেসের প্রথম বাসিন্দাদের মধ্যে একজন ছিলাম। ১৯৮২-৮৩ সালে আমি ওই মেসে থেকেছি। তখন থেকেই আমার জানতাম মেসের উত্তর দিকে ডিজিএফআই কমপ্লেক্সের সর্বদক্ষিণে যে ভবনটি অবস্থিত সেটা জেআইসি (জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল)। তাই আমি বুঝতে পারি আমাকে জেআইসিতে আনা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত আমাকে ওই সেলে রাখা হয়েছিল। তবে মাঝে দুবার কয়েক দিনের জন্য অন্য সেলে নিলেও পরে আবার নিয়ে আসা হয়। এ সেলটি ১১ নম্বর সেল হিসাবে চিহ্নিত এবং চাবির রিংয়ে আমি ১১ ও ভিআইপি লেখা দেখতে পেয়েছি।

জবানবন্দিতে তিনি বলেন, আমি যে ডিজিএফআইএর কচুক্ষেত কমপ্লেক্সের জেআইসিতে ছিলাম তা আমি আরো অন্যান্যভাবে নিশ্চিত হয়েছিলাম। প্রথমত, আমি নিয়মিত আমার সেল থেকে দুটো আযান শুনতে পেতাম একটি ছিল বিএনএস হাজী মহসিন থেকে। আরেকটি ছিল মেসের দক্ষিণে অবস্থিত অফিসারদের বাসভবন এলাকার মসজিদ থেকে। অন্যান্য যে সমস্ত আলামত দ্বারা আমি আমার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলাম সেগুলো হচ্ছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমান উড্ডয়নের সময় কচুক্ষেতের ওপর দিয়ে যেত। এছাড়া কচুক্ষেত কমপ্লেক্সের পশ্চিম দিকে একটি হাসপাতাল রয়েছে। আমি মাঝে মাঝেই সেই এলাকা থেকে এ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের আওয়াজ পেতাম। স্টেশন মেস-বিতে সেনাবাহিনীর প্রথা অনুযায়ী বিভিন্ন পার্টিতে যে ধরনের ব্যান্ড বাজানো হয় সেই ব্যান্ডের আওয়াজও আমি শুনতে পেতাম। ১৯৮২-৮৩ সালে আমি মেস-বিতে থাকাকালীন পূর্বদিকে বনানী এমপি চেকপোস্টের পাশ দিয়ে নিয়মিত যে ট্রেন চলাচলের আওয়াজ পেতাম; সেলে থাকাকালীন অবসস্থাতেও ঠিক একই দিক থেকে আমি নিয়মিত সেই আওয়াজ পেতাম। এছাড়াও, সেলে যারা ডিউটি করতে আসতো, এমওডিসির (মিনিস্ট্রি অফ ডিফেন্স কন্সট্যাবুলারি) সিপাহী, তাদের মধ্যে থেকেও কয়েকজন নিশ্চিত করেছে আমাকে কচুক্ষেতে অবস্থিত ডিজিএফআই কমপ্লেক্সের ভিতরে জেআইসিতে রাখা হয়েছে।

জবানবন্দিতে আমান আযমি বলেন, আমি আটক থাকাকালীন খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য বিষয়ে সীমাহীন নির্যাতনের শিকার হয়েছি। সেলে কোন প্রাকৃতিক আলো বাতাস ছিল না। দুই হাজার ৯০৮ দিন আমি আকাশ দেখিনি, চাঁদ-সূর্য দেখিনি, মেঘ-বৃষ্টি দেখিনি, গাছ-মাটি দেখিনি। দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে দীর্ঘদিন নির্যাতনের শিকার হয়েছি তা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। এছাড়াও, সেলের চারিদিকে ২৪ ঘন্টা নানা রকমের আওয়াজ হতো, যার ফলে আমার সার্বক্ষণিক মাথা ব্যাথা নিয়ে থাকতে হয়েছে। যখন মসজিদে আযান দিতো অথবা মসজিদ থেকে কোন ব্যক্তির মৃত্যু বা অন্য কোন বিষয়ে কোন ঘোষণা দেওয়া হতো, তখন নানা রকম মেশিন দিয়ে আরো আওয়াজ করা হতো। আমি জানতে পেরেছি এই আওয়াজ করার উদ্দেশ্য হলো বাইরে থেকে কোন শব্দ যেন ভিতরে প্রবেশ করতে না পারে কিংবা সেলে কাউকে নির্যাতন করা হলে তার আর্তনাদের আওয়াজ যেন বাইরে না যায়।

জবানবন্দিতে তিনি বলেন, সেখানের খাবার অত্যন্ত নিম্নমানের ছিল। এজন্য ছয় বছর চার মাস পর্যন্ত আমি কখনও তিন বেলা খাবার খেতে পারিনি। ডিজিএফআই এর ডাক্তারের অব্যাহত চাপের ফলে ২০২৩ সালের শুরু থেকে আমি তিন বেলা খাবার শুরু করি। এই দীর্ঘ আট বছর কোনদিন তৃপ্তি করে পেট ভরে খেতে পারিনি। কখনও এক বেলা খেয়েছি, কখনও দুই বেলা খেয়েছি। খাবার এতো নিম্ন মানের ছিল কখনও কখনও সামান্য ভাত খেয়েই থেকেছি। চিকিৎসা সেখানে অত্যন্ত অপ্রতুল ছিল। আমার চোখ, কান, দাঁতের সমস্যা সহ চর্মরোগ ও পেটের পীড়ায় সম্পূর্ণ সময় আমাকে ভূগতে হয়েছে। আমি মোট চারবার অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। আমার একিউট কিডনি ইনফেকশন হয়, করোনা হয় ও দুটো দাঁত ভেঙ্গে যায়। ওখানে যে টয়লেট ব্যবহার করতে দেওয়া হয়েছিল তা আমার সেল থেকে আনুমানিক ৪০/৪৫ কদম হবে। টয়লেটে যাবার প্রয়োজন হলে তারা আমাকে হাতকড়া পরাতো, চোখ বাঁধতো এবং জমটুপি পরিয়ে নিয়ে যেত। কোন কোন সময় চোখ এতো জোরে বাঁধতো আমার চোখের মণিতে প্রচনণ্ড ব্যাথা করতো এবং নাকে এতো চাপ লাগতো যে শ্বাস-প্রস্বাসে অসুবিধা হতো।

জবানবন্দিতে তিনি আরো বলেন, আমি উপযুক্ত চিকিৎসা না পাওয়ায় নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়ি। একসময় শারীরিক যন্ত্রণায় কাতরাতাম। কখনও কখনও অবস্থা এতো খারাপ হয় আমাকে একজন বা কখনও দুইজন ধরে বিছানা থেকে ওঠানো হতো। খাবার সময় আমার চেয়ারের পাশে একজন দাড়িয়ে থাকতো যেন দূর্বলতার কারণে আমি যেন মাটিতে পরে না যাই। সেলটি গরমের সময় অত্যন্ত গরম এবং শীতের সময় প্রচণ্ড ঠাণ্ডা থাকতো । গরমের সময় আমার অতিরিক্ত ঘামানের ফলে হতো ইলেক্ট্রোলাইট ইম্ব্যালেন্স হতো। লবণের ঘাটতি পূরণের জন্য কখনও কখনও আমাকে তিন বেলা খাবারের সঙ্গে তিনটা করে লবণের ট্যাবলেট (সোডিক্লোর) খাওনো হতো। ডাক্তার খাবারের সময় কাচা লবণও খেতে বলেছিল। সোডিয়াম ঘাটতির জন্য প্রথম তের মাসে রমজান মাস ছাড়া প্রতিমাসে চার থেকে পাঁচদিন স্যালাইন লাগানো হতো। চোখ বেঁধে রাখার ফলে দুচোখের দুই ধারে এবং গালে ঘা হয়ে গিয়েছিল। জবানবন্দি শেষ না হওয়ায় অবশিষ্ট অংশের জন্য আগামীকাল দিন ধার্য করে ট্রাইব্যুনাল।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...