এসএসসি পাস করেই কি বিদেশে পড়তে যাওয়া যায়? বিদেশে গেলে বাংলাদেশের এসএসসি ফলাফলের গুরুত্ব কতটা? নাকি সেখানে গিয়ে আবার নিচের কোনো শ্রেণিতে ভর্তি হতে হয়—এমন প্রশ্ন এখন অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের।
কুমিল্লার শিক্ষার্থী জিসান চৌধুরীও এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন। কয়েক দিন আগেই এসএসসি পাস করেছেন তিনি। ফল প্রকাশের পর উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি ও কলেজ বাছাইয়ের পাশাপাশি বিদেশে পড়াশোনার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছেন।
বিশ্বের এক দেশ থেকে অন্য দেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়ার প্রবণতা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ প্রবণতা বেড়েছে। একসময় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই স্নাতকোত্তর বা পিএইচডি করতে বিদেশে যেতেন। এখন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
ইউনেস্কোর সম্প্রতি প্রকাশিত ‘হায়ার এডুকেশন গ্লোবাল ট্রেন্ডস রিপোর্ট’ অনুযায়ী, গত দুই দশকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়েই উচ্চশিক্ষায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের চলাচল বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বিদেশে পড়াশোনা নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আগ্রহও বেড়েছে। বিশেষ করে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর বাংলাদেশের এই ফল বিদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে কতটা কাজে আসে, তা জানতে চাইছেন অনেকে।
বিদেশে পড়তে যাওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী, তাদের অভিভাবক এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে কাজ করা পরামর্শক ও গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে বিবিসি বাংলা।
বিদেশে মাধ্যমিকের ফলের মূল্য কতটা
বাংলাদেশ থেকে ইংরেজি মাধ্যমের ও-লেভেল শেষ করে ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন শিক্ষার্থী পুষ্পিতা হক। সেখানে এ-লেভেল শেষ করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান তিনি।
অন্যদিকে, এইচএসসি পাস করে বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় যান আনিসুর রহমান সুরেল। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার আগে তাকে ইংরেজি ভাষাগত দক্ষতার পরীক্ষা আইইএলটিএস দিতে হয়। তার অভিভাবক মোমেনা সরকার জানান, ভর্তির ক্ষেত্রে এসএসসি ও এইচএসসির ফলও গুরুত্ব পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশে পড়াশোনার ক্ষেত্রে এসএসসি বা মাধ্যমিকের ফলাফল একেবারে মূল্যহীন নয়। তবে এটি সাধারণত মূল নির্ধারকও নয়।
যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষার আগে ১২ বছরের স্কুলশিক্ষা সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ১২ বছরের শিক্ষা সাধারণত এইচএসসি পর্যন্ত।
তাই এসএসসি শেষ করে কেউ বিদেশে পড়তে গেলে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ সাধারণত থাকে না। তাকে সংশ্লিষ্ট দেশে ফাউন্ডেশন কোর্স বা ডিপ্লোমা প্রোগ্রামে ভর্তি হতে হয়। ইংরেজি মাধ্যমের ও-লেভেল শেষ করা শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সেখানে গিয়ে এ-লেভেল সম্পন্ন করার প্রয়োজন হতে পারে।
বিদেশে পড়তে যেতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দেন তামান্না তমা। তার ভাষ্য, বাংলা মাধ্যমে মাধ্যমিক পড়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের তুলনায় ইংরেজি মাধ্যমের ও-লেভেল সম্পন্ন শিক্ষার্থীদের আবেদন বেশি গ্রহণ করা হয়।
তামান্না তমা বলেন, কিছু দেশ, যেমন মালয়েশিয়া, ফাউন্ডেশন কোর্সের সুযোগ দেয়। আবার অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছরের ফাউন্ডেশন কোর্সের মাধ্যমে ব্যাচেলর পর্যায়ে ভর্তির সুযোগ রয়েছে।
তার মতে, কোনো শিক্ষার্থী এইচএসসি পাস করার পর বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে ভর্তি হতে চাইলে এসএসসির ফলও বিবেচনায় নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট ন্যূনতম নম্বর বা বেঞ্চমার্ক থাকে। শিক্ষার্থীকে তা পূরণ করতে হয়। যেসব দেশে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের যাওয়ার প্রবণতা বেশি, সেসব দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো অন্তত ৬০ শতাংশ নম্বর দেখতে চায়।
তামান্না তমা মনে করেন, উচ্চমাধ্যমিক শেষ করার পর বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া ভালো। তবে সার্টিফিকেট ও ভাষাগত দক্ষতার পাশাপাশি আর্থিক সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
এসএসসির ফল কেন দেখা হয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও মূল্যায়নকারী সংস্থাগুলো সাধারণত তিনটি বিষয় যাচাই করতে এসএসসির ফল বিবেচনায় নেয়।
প্রথমত, শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা। একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় কোনো বিরতি বা ‘গ্যাপ’ আছে কি না, তা যাচাই করা হয়। এ ক্ষেত্রে এসএসসি সার্টিফিকেট একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে কাজ করে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীর একাডেমিক অগ্রগতি। সময়ের সঙ্গে ফলাফল ভালো হচ্ছে, নাকি খারাপ হচ্ছে, তা দেখা হয়। যেমন, এসএসসিতে জিপিএ ৩ দশমিক ৫০, এইচএসসিতে ৪ দশমিক ৫০ এবং স্নাতকে ৩ দশমিক ৭৫ হলে ফলাফলে একটি ঊর্ধ্বমুখী ধারা দেখা যায়। এটি ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তৃতীয়ত, ন্যূনতম যোগ্যতা। কোনো কোনো দেশে ফাউন্ডেশন বা ডিপ্লোমা প্রোগ্রামে ভর্তির জন্য এসএসসিতে নির্দিষ্ট গ্রেড থাকা বাধ্যতামূলক।
অর্থাৎ এসএসসির পর বিদেশে পড়তে যেতে চাইলে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ভালো একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট থাকতে হবে। বিশেষ করে গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞানে ভালো ফল থাকা প্রয়োজন হতে পারে।
এ ছাড়া আইইএলটিএস বা পিটিইর মতো ভাষাগত দক্ষতা পরীক্ষার ফল, পড়াশোনায় গ্যাপ না থাকা এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে কি না, সেসবও বিবেচনা করা হয়।
কোন পর্যায়ে এসএসসির গুরুত্ব কতটা
ইউনেস্কোর ‘গ্লোবাল ফ্লো অব টারশিয়ারি লেভেল স্টুডেন্টস’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫৩ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনার জন্য বিশ্বের ৫৫টি দেশে গেছেন।
২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪৯ হাজার ১৫১। ২০২১ সালে বিদেশে পড়তে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৪৪ হাজার ৩৩৮।
আর ২০১৩ সালে বিদেশে পড়তে গিয়েছিলেন ২৪ হাজার ১১২ জন। অর্থাৎ ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ১০ বছরে বিদেশে পড়তে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।
এসএসসি পাস করে বিদেশে গেলে ফাউন্ডেশন বা ডিপ্লোমা কোর্সের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। এরপর উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সুযোগ পাওয়া যায়।
তবে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর সর্বশেষ শিক্ষাগত যোগ্যতাই বেশি গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে গিয়ে স্নাতক পর্যায়ে ভর্তি হতে চাইলে তাই এইচএসসি বা এ-লেভেলের ফলাফল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এসএসসির ফল সাধারণত সহায়ক নথি হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে মেডিসিন, ইঞ্জিনিয়ারিং ও আইনের মতো প্রতিযোগিতামূলক বিষয়ে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। এসব বিষয়ে আবেদনকারীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় মাধ্যমিক পর্যায়ে গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞানে শিক্ষার্থী কী ফল করেছেন, তা বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে।
অন্যদিকে, কেউ যদি মাস্টার্স, এমফিল বা পিএইচডির জন্য আবেদন করেন, সে ক্ষেত্রে এসএসসি বা মাধ্যমিকের ফলাফলের গুরুত্ব প্রায় নেই।
এসব ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর সর্বশেষ ডিগ্রির ফলাফল, অর্থাৎ অনার্স বা মাস্টার্সের সিজিপিএ, গবেষণা ও কাজের অভিজ্ঞতা, প্রকাশনা, থিসিস, ইন্টার্নশিপ, কেন নির্দিষ্ট বিষয় পড়তে চান এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী—এসব বিষয় বেশি গুরুত্ব পায়। ভাষাগত দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের শিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক অধ্যাপক মনিনুর রশিদের মতে, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে পারেনি। এ কারণে দীর্ঘ শিক্ষাজীবন শেষ করার পরও বিদেশে পড়তে যাওয়ার সময় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নিজেদের যোগ্যতা আবার প্রমাণ করতে হয়।
তিনি বলেন, এ-লেভেল ও ও-লেভেলের মতো পরীক্ষাগুলো মানসম্মত বা স্ট্যান্ডার্ডাইজড হওয়ায় বিশ্বজুড়ে এগুলোর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের এসএসসি ও এইচএসসি এখনো সে ধরনের স্ট্যান্ডার্ডাইজড পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এসব পরীক্ষার গ্রহণযোগ্যতাও তুলনামূলক কম।
সব মিলিয়ে, এসএসসি ফল বিদেশে পড়াশোনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি নথি হলেও সব পর্যায়ে এর গুরুত্ব সমান নয়। এসএসসির পর সরাসরি বিদেশে উচ্চশিক্ষায় যেতে চাইলে ফাউন্ডেশন বা ডিপ্লোমা কোর্সের প্রয়োজন হতে পারে। আর এইচএসসি বা এ-লেভেল শেষ করে স্নাতকে ভর্তি হতে চাইলে সর্বশেষ ফলাফলই মূল বিবেচনার বিষয়। উচ্চশিক্ষার আরো ওপরের ধাপে গেলে এসএসসির ফলাফলের গুরুত্ব আরো কমে যায়।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


