আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

জবির ভবনগুলো মৃত্যুফাঁদ, ঝুঁকিতে হাজারও শিক্ষার্থী

লিমন ইসলাম, জবি

জবির ভবনগুলো মৃত্যুফাঁদ, ঝুঁকিতে হাজারও শিক্ষার্থী

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) অধিকাংশ ভবন এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। ফাটলধরা ছাদ, দেয়াল থেকে খসে পড়া পলেস্তারা আর জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ— সব মিলিয়ে শিক্ষা নয়, শঙ্কা নিয়েই ক্লাস করতে হচ্ছে হাজারও শিক্ষার্থীদের। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক ভবন ব্যতীত অন্য কোথাও মেরামতের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। প্রতিষ্ঠার দুই দশক পেরিয়ে গেলেও শহীদ সাজিদ একাডেমিক ভবন ছাড়া আর কোনো নতুন অবকাঠামো নির্মিত হয়নি।

বিজ্ঞাপন

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন ভবনের ছাদে, রুমে এবং দেয়ালে অনেক ফাটল রয়েছে। এগুলোর মধ্যে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবন-২, কলা ভবন, অবকাশ ভবনের সকল স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, বিজ্ঞান অনুষদের চারটি ভবনের অবস্থা জরাজীর্ণ। এর মধ্যে সামাজিক বিজ্ঞান ভবন-২-এর অর্থনীতি বিভাগের বেহালদশা। এদিকে ভাষা শহিদ রফিক ভবন ছাদ থেকে পলেস্তারা ও ইট খসে পড়ে। ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ কি-না তার রিপোর্ট এখনও হাতে আসেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে।

এসব ভবনে থাকা বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা জানান, তারা প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে ক্লাস করছেন। অর্থনীতি বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘যে কোনো সময় ছাদ ধসে পড়তে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও সেই কক্ষেই বসে ক্লাস ও পরীক্ষা দিতে বাধ্য হচ্ছি।

20

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলী সূত্রে জানা গেছে, প্রশাসনিক ভবনের নির্মাণকাজ বর্তমানে পুরোদমে চলেছে। নতুন প্রশাসনের তিন দফা বৈঠকের পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভবনটির বিশেষায়িত কাজ শুরু করার জন্য একটি কমিটিকে নির্দেশ দেয়। প্রায় ৬০ লাখ টাকার এ কাজটি বাস্তবায়ন করছে ‘ফাহাদ বিল্ডার্স’। প্রকল্প অনুযায়ী, আগামী মাসের মধ্যেই প্রশাসনিক ভবনের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হবে। এদিকে, ভবনটিতে মাত্র দুই তলার জন্য একটি লিফট স্থাপনে ৫৩ লাখ টাকা বাজেট অনুমোদন করা হয়েছে। বিষয়টি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

গত ১৩ মে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের একটি ক্লাস চলাকালে ছাদের কিছু অংশ ভেঙে পড়ে, তবে অল্পের জন্য বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পান শিক্ষার্থীরা। ঘটনাস্থলে উপস্থিত শিক্ষার্থী আসাদ ইসলাম বলেন, "ভাগ্য ভালো সেদিন প্রথম বেঞ্চে কেউ বসেনি, নাহলে বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারত।" তিনি আরও বলেন, "জবি প্রশাসনকে নিয়ে বলার কিছু নেই, পুরো সায়েন্স ফ্যাকাল্টিরই এই অবস্থা। ভবনের অবস্থা এতটাই খারাপ যে, দেয়ালের ফাঁক দিয়ে গাছের শিকড় পর্যন্ত ভিতরে প্রবেশ করেছে। যদি কোনো শিক্ষার্থীর ওপর এসব ভাঙা অংশ পড়ে যেত, তাহলে এর দায়ভার কে নিতো?" শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ঘটনার পরও প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভবন সংস্কার কিংবা নিরাপত্তা নিশ্চিতে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

30

এর আগে গত ২৯ এপ্রিল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাশ ভবনের তৃতীয় তলার ছাদের ড্রপ ওয়ালের একটি অংশ হঠাৎ ভেঙে পড়ে। এতে একজন কর্মচারী আহত হন। ঘটনার পর থেকে ভবনটি ঘিরে শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপক আতঙ্ক বিরাজ করছে। অবকাশ ভবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র কেন্দ্রীয় ক্যান্টিন অবস্থিত, যেখানে প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষার্থী খাবার গ্রহণ করেন। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কার্যক্রমও এ ভবন থেকেই পরিচালিত হয়। নিয়মিত যাতায়াত ও অবস্থানের কারণে ভবনটির দুরবস্থা শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।

প্রাণিবিদ্যার ঝুঁকিপূর্ণ ভবন থেকে প্রতিদিনই একটু একটু করে খসে পড়ছে ছাদের প্লাস্টার। এছাড়া নষ্ট হচ্ছে বিভাগের ল্যাবরেটরির প্রায় অর্ধকোটি টাকার রাসায়নিক দ্রব্য ও যন্ত্রপাতি। এ ব্যাপারে একাধিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী বলেন, পুরানো ভবনে একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অল্প মাত্রার ভূমিকম্প হলেই প্রাণহানি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অতি ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় ২০২৩ সালের ১২ মার্চ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি ভবন ভাঙার সুপারিশ করেছিল রাজউক। এ প্রতিষ্ঠানের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ ভবন, অর্থনীতি বিভাগ ভবন, কলা ভবনের দুটি অংশ। তারপর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ওই বছরের এপ্রিল মাসে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোসহ অন্যান্য ভবন সংস্কারে উদ্যোগ নিলেও নানা কারণে সেই উদ্যোগ ভেস্তে যায়।

40

ভূগোল ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষক বলেন, যে কোনো সময় ছাদ ধসে পড়তে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ জানার পরও এসব কক্ষে বসেই ক্লাস ও পরীক্ষা নিতে বাধ্য হচ্ছি আমরা। ভবনের বেশ কয়েক জায়গায় ফাটল রয়েছে। কিছুদিন আগে সিমেন্ট ও রঙের প্রলেপ দেওয়া হলেও দুর্ঘটনার আশঙ্কা কমছে না।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, রাজউকের দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো নিয়ে বিশেষায়িত কাজগুলোর জন্য এখনো কোন নির্দেশনা আসেনি, আসলে আমরা কাজ শুরু করতে পারবো।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম বলেন,"ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর বিষয়ে আমরা খুব শিগগিরই একটি জরুরি বৈঠক ডাকবো। ভবনগুলোর সংস্কার ও পুনঃনির্মাণের জন্য একটি প্রকল্প প্রণয়ন করা হবে। এ বিষয়ে আমরা দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করবো এবং সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধানের চেষ্টা করবো।"

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন