ছাত্রদল-শিবির সংঘাতে শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা

ছাত্রদল-শিবির সংঘাতে শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা
ফাইল ছবি

জুলাই বিপ্লবের দুই বছর পূর্ণ হওয়ার দিনেই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। দুই বছর আগে যারা একসঙ্গে রাজপথে আন্দোলন করেছেন, লড়াই করেছেন তারা এখন রক্তক্ষয়ী সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে চলছে আলোচনা-সমালোচনা।

দেশের একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে গত কয়েক দিনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। আবাসিক হল দখল এবং কক্ষ ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। সংঘর্ষের রেশ গিয়ে পৌঁছায় হাসপাতালের জরুরি বিভাগ পর্যন্ত।

বিজ্ঞাপন

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্রলীগ ক্যাডাররা হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছিল। সেই ঘটনার দুই বছর না পেরোতেই একই ধরনের সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ছাত্ররাজনীতির বর্তমান চিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত বা নিজেদের ‘জুলাই বিপ্লবের পক্ষের শক্তি’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যেই এমন রক্তক্ষয়ী সংঘাত ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি বা আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সীমাবদ্ধ থাকেনি। হেলমেট, লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র হাতে পাল্টাপাল্টি মহড়া, ককটেল বিস্ফোরণ, আবাসিক হলে প্রবেশ, কক্ষ ভাঙচুর এবং শিক্ষার্থীদের বের করে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

স্লোগান দিতে দিতে দলে দলে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ঢুকে চিকিৎসারত আহতদের ওপর হামলার দৃশ্য দেখা গেছে পুরান ঢাকার ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) সংঘর্ষের ঘটনায় আহতদের অনেকে চিকিৎসা নিতে গেলে মঙ্গলবার বিকেলে তাদের ওপর হামলা করতে ছাত্রদল-যুবদলের নেতাকর্মীরা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ঢোকেন। এ সময় চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ রোগীদেরও মারধর করেন তারা।

জবিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর, অস্থায়ী আবাসন প্রকল্পের কাজ দ্রুত শুরু এবং মেডিকেল সেন্টার উন্নয়নের দাবিতে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনুষ্ঠানে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে জকসু, ইসলামী ছাত্রশিবির, ইনকিলাব মঞ্চ, জাতীয় ছাত্রশক্তিসহ কয়েকটি সংগঠন ও প্ল্যাটফর্মের নেতাকর্মী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ বাধে। এতে জকসুর ভিপি-জিএস, সাংবাদিকসহ শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। সংঘর্ষে আহত অন্তত ৭০ জন ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।

তবে সংঘর্ষের কারণ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্য ভিন্ন। জবি প্রক্টর অধ্যাপক ড. নাসির উদ্দীন বলেন, এটি জকসু ও শিবিরের পরিকল্পিত কর্মকাণ্ড। তাদের কোনো দাবি থাকলে বক্তব্যের মাধ্যমে তা উপস্থাপন করতে পারত। প্ল্যাকার্ড নিয়ে ইউজিসির চেয়ারম্যানকে অপদস্থ করার উদ্দেশ্যে এসব ইস্যু সামনে আনা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

জবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন বলেন, কয়েকজন শিক্ষার্থী ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে অনুষ্ঠানে প্রবেশ করতে চাইলে প্রক্টরিয়াল টিম ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা তাদের বাধা দেন। পরে ছাত্রসংগঠনগুলোর সঙ্গে প্রক্টরিয়াল বডির তর্কে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়। তিনি বলেন, কোনো সংঘাতকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সমর্থন করে না। ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করতে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।

ববিতে সংঘর্ষ, আহত ১৫

জবির ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গতকাল বুধবার বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সকালে ছাত্রশিবির ‘অদম্য জুলাই’ শীর্ষক শোভাযাত্রা বের করলে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে উভয়পক্ষের অন্তত ১৫ শিক্ষার্থী আহত হন। সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

বেরোবিতে সংঘর্ষ

সাম্প্রতিক সহিংসতার ধারাবাহিকতায় আলোচনায় এসেছে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ও (বেরোবি)। জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত প্রদর্শনী ঘিরে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত সাতজন আহত হন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা স্মারকে আয়োজিত প্রদর্শনীতে ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ শিরোনামে একটি ব্যানার টানানো হয়। ওই ব্যানারে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির ছয় নেতার ছবি ছিল। ব্যানারটি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়।

সংশ্লিষ্ট একাধিক শিক্ষার্থীর দাবি, এই সংঘর্ষের নেপথ্যে ছাত্রলীগপন্থি কিছু অ্যাক্টিভিস্টের উসকানি ছিল। একপর্যায়ে দুপক্ষ মারমুখী হয়ে ওঠে এবং সংঘাতে লিপ্ত হয়। পরে ওই ব্যানারে ফাঁসিতে হত্যার শিকার জাতীয় নেতাদের প্রতিকৃতিতে জুতা দিয়ে আঘাতের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। তাতে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে অনেককে তীব্র ক্ষোভ ঝাড়তে দেখা গেছে।

ঢাকা আলিয়ায় হলে ছাত্রদলের ভাঙচুর

রাজধানীর বকশীবাজারের সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়ায় সংঘাত ছড়ায় আবাসিক হলকে কেন্দ্র করে। ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের পর একপর্যায়ে শিবিরের নেতাকর্মীরা এলাকা ছেড়ে যান। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শিবিরের নেতাকর্মীরা সরে যাওয়ার পর মাদরাসার একমাত্র আবাসিক হল আল্লামা কাশগরী (রহ.) হলে ছাত্রদল ও যুবদলের কয়েকশ নেতাকর্মী প্রবেশ করেন। পরে হলের কয়েকটি কক্ষে ভাঙচুর চালিয়ে ফটকে তালা দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে আহত হন মাদরাসার অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ওবায়দুল হকও।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, বিকাল থেকে মাদরাসার সামনে দুইপক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ চলে। এ সময় ইট-পাটকেল নিক্ষেপ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া এবং সাত থেকে আটটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পুলিশ দুই পক্ষের মাঝখানে অবস্থান নিলেও শুরুতে সদস্যসংখ্যা কম থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়। পরে পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানো হয়। সন্ধ্যার পর যুবদলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব রবিউল ইসলাম নয়নের নেতৃত্বে ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীরা হলে ঢোকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে শিবিরের নিয়ন্ত্রণে থাকা কয়েকটি কক্ষে ভাঙচুর চালানো হয়। পরে হলের শিক্ষার্থীদের বের করে দিয়ে ফটকে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়।

এদিকে ছাত্রদল নেতা মো. ইব্রাহীম বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য হল তালাবন্ধ করা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তা খুলে দেওয়া হবে।

আলিয়া মাদরাসা শাখা শিবিরের সভাপতি আবদুল আলীম বলেন, ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হলে ঢুকে শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও বিভিন্ন জিনিসপত্র নিয়ে গেছে। রুমের বিভিন্ন সামগ্রী ভাঙচুর এবং শিক্ষার্থীদের জামাকাপড় বাইরে ফেলে দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।

তার ভাষ্য, ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে হলের আশপাশে মহড়া দিয়েছেন। সংঘর্ষে শিবিরের প্রায় ২৫ নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন সংগঠনটির ঢাকা মহানগর পূর্বের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক দাউদ খান। ফুয়াদ নামের এক কর্মীর মাথায় ১২টি সেলাই লেগেছে এবং তার অবস্থা সংকটাপন্ন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

অন্যদিকে ছাত্রদল নেতা সাদ চৌধুরী দাবি করেন, তাদের ৩০ জনের বেশি নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ছাত্রদল ও যুবদলের দুজনের অবস্থা গুরুতর বলেও দাবি করেন তিনি।

থমথমে ঢাকা কলেজ

জবিতে সংঘর্ষের পর ঢাকা কলেজেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়। সংঘর্ষের পর ছাত্রদল নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসের বাইরে প্রধান সড়কে অবস্থান নেন। অন্যদিকে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসের ভেতরে অবস্থান করেন। এ অবস্থায় পুরো এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে নিউমার্কেট এলাকায় দুটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে। এর পরদিন ৫ আগস্ট ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ঢাকা কলেজের আবাসিক হলগুলোর বিভিন্ন কক্ষে সিট দখল শুরু করেছেন বলে কয়েকজন শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন।

ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ এ কে এম ইলিয়াস বলেন, সকাল থেকে ক্যাম্পাসে নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা চলছিল আর ছাত্রদলের একটি মিছিলকে কেন্দ্র করে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হয়। বড় ধরনের কোনো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি।

গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউটে হল দখল

রাজধানীর সরকারি গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউটের আবাসিক হলেও সংঘাতের ছায়া পড়েছে। সেখানে ছাত্রশিবিরের ১০-১৫ শিক্ষার্থীকে হল থেকে জোরপূর্বক বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। গত মঙ্গলবার রাত পৌনে একটার দিকে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় মেহেদী নামে এক শিবিরকর্মী আহত হন বলেও দাবি করা হয়।

হল থেকে বের করে দেওয়ার পর কয়েকজন শিক্ষার্থীকে মারধর করতে করতে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের দিকে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

ইনস্টিটিউটের নিরাপত্তাকর্মী খশিয়ার জানান, রাত ১২টার দিকে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা এক শিক্ষার্থীকে মারধর করেন। পরে আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ইনস্টিটিউটের সামনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়।

হেলমেট, দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় বিভিন্ন ক্যাম্পাসে সংঘাতের সময় হেলমেট, লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র ব্যবহারের চিত্রও সামনে এসেছে। কোথাও কর্মীদের মাথায় হেলমেট, হাতে লাঠি নিয়ে সংঘর্ষে অংশ নিতে দেখা গেছে। কোথাও আবার দলবদ্ধভাবে মহড়া ও পাল্টাপাল্টি অবস্থান নিতে দেখা গেছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের মধ্যে এমন সংঘাত নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেÑ যে গণঅভ্যুত্থানে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে দেশে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন এনেছিল, সেই আন্দোলনের অংশ মনে করা সংগঠনগুলোই আবার সংঘাতের রাজনীতিতে ফিরছে?

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন