জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) ক্যাম্পাসে পশু জবাই থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দিয়ে জারি করা বিজ্ঞপ্তির প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু)। এ সময় বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহার ও প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছেন সংগঠনটির নেতারা।
বুধবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্য চত্বর থেকে জকসুর উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয় এবং শেষে রফিক ভবনের নিচে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে জকসুর সমাজসেবা সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সম্মানিত উপস্থিতি, আজকের দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রক্টোরিয়াল প্রক্টরের পক্ষ থেকে একটা নোটিশ দেখে আমরা খুবই মর্মাহত হয়েছি। বাংলাদেশের ৯২ ভাগ মুসলমানদের দেশে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কীভাবে গরু জবাইকে নিষিদ্ধ করতে পারে, এটা আমরা জানতে চাই।’
বক্তব্যে তিনি প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে ধর্মীয় সংস্কৃতির ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেন। একই সঙ্গে এ ধরনের সিদ্ধান্তের পেছনে সাম্প্রদায়িক প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ তুলে তা প্রত্যাহারের দাবি জানান।
সমাবেশে জকসুর এজিএস মাসুদ রানা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জারি করা বিজ্ঞপ্তির তীব্র সমালোচনা করে উপাচার্যকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা অবিলম্বে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানিয়ে দিতে চাই, নোটিশ দিয়েছেন ভালো কথা, মাননীয় ভাইস চ্যান্সেলর স্যার, আপনি ক্ষমা চান! অবিলম্বে ক্ষমা চান! নোটিশ বাতিল করুন! জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে আগামী শুক্রবার বাদ জুমা গরুভোজ হবে, সেই গরুভোজে আপনি উপস্থিত থেকে আমাদের সাথেও খান।’
মাসুদ রানা অভিযোগ করেন, প্রশাসনের বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম শিক্ষার্থীদের নয়, দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় অনুভূতিতেও আঘাত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সংগ্রামী উপস্থিতি, আজ আপনারা দেখেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টোরিয়াল দপ্তর থেকে একটি নোটিশ দেওয়া হয়েছে যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার মধ্যে গরু জবাই করা যাবে না, কোন পশু জবাই করা যাবে না।’
এর আগেও ক্যাম্পাসে ধর্মীয় অনুষ্ঠান বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। ভবিষ্যতে এমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলে শিক্ষার্থীদের নিয়ে তা প্রতিহত করার হুঁশিয়ারি দেন জকসুর এজিএস।
সমাবেশে জকসুর ভিপি রিয়াজুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সমালোচনা করে বলেন, ‘আমরা অনেক কথা বলতে চাই, কিন্তু আমরা সময় সংক্ষিপ্ততার কারণে আজকের এই প্রোগ্রাম থেকে স্পষ্ট ঘোষণা করতে চাই, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই দলকানা দলদাস প্রশাসনকে জনসম্মুখে ক্ষমা চাইতে হবে।’
তিনি অভিযোগ করেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের মৌলিক সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলেও ক্যাম্পাসে পশু জবাই থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দিয়েছে। প্রশাসনকে ‘শিক্ষার্থীবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীকে বসার জায়গা দিতে পারে না, কিন্তু মসজিদে তালা দিতে পারে। তারা ক্যান্টিনে ভালো খাবারের ব্যবস্থা করতে পারে না, কিন্তু নোটিশ দিয়ে গরু জবাইকে নিষিদ্ধ করতে পারে।’
গত সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চের সামনে শিক্ষার্থীদের নৈশভোজের আয়োজনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ঘোষণা করতে চাই, গত সোমবার মুক্তমঞ্চের সামনে, আবারও বলছি মুক্তমঞ্চের সামনে শিক্ষার্থীদের একটি ব্যাচের অনুষ্ঠানকে যারা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তিকে নষ্ট করেছে, যারা দেশের সম্প্রীতিকে নষ্ট করেছে, তাদেরকে চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ায় গরুর মাংস নিয়মিত খাবারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা দাবি জানাই, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থীর খাদ্যতালিকাকে পছন্দ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনের মেনুতে গরুর গোশতকে নিয়মিত মেনুর অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।’
এছাড়া ক্যাম্পাসে সব ধর্মের শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মীয় উৎসবের বরাদ্দ শিক্ষার্থীদের ধর্মভিত্তিক আনুপাতিক হারে বণ্টনের দাবিও জানান জকসু ভিপি।
সমাবেশ থেকে জকসুর পক্ষ থেকে চার দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলো হলো, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিতর্কিত বিজ্ঞপ্তির জন্য প্রশাসনকে দুঃখ প্রকাশ করে সেটি প্রত্যাহার করতে হবে এবং বিজ্ঞপ্তি জারির পেছনে সংশ্লিষ্টদের কোনো অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে; গত সোমবার মুক্তমঞ্চের সামনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নৈশভোজের আয়োজনকে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে সাম্প্রদায়িক উসকানিতে রূপ দিয়েছে, তাদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে; শিক্ষার্থীদের খাদ্যচাহিদা ও পছন্দের প্রতি সম্মান রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ার খাবারের তালিকায় গরু ও খাসির মাংস অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং ক্যাম্পাসে সব ধরনের ধর্মীয় বৈষম্য ও বিদ্বেষ দূর করে ধর্মীয় সম্প্রীতি, পারস্পরিক সম্মান ও সহাবস্থান নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
এর আগে বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মো. আজম খান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে ক্যাম্পাসে যেকোনো ধরনের পশু জবাই থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানানো হয়। তবে সেই বিজ্ঞপ্তি নিয়ে বিতর্কের মধ্যে জকসুর কর্মসূচির প্রায় একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর থেকে প্রশাসনের অবস্থান স্পষ্ট করে দুঃখ প্রকাশ করা হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

