সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) গত দেড় বছরে গবেষণা, অবকাঠামো, প্রশাসন ও শিক্ষার্থীসেবায় বহুমাত্রিক পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিনের অস্থিরতা ও স্থবিরতা কাটিয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, গবেষণায় নতুন গতি সঞ্চার, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আধুনিকতা, পরিবহন সংকট নিরসন এবং সেশনজট কমাতে একযোগে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ছাত্রছাত্রীদের তিনটি করে মোট ছয়টি আবাসিক হল রয়েছে। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের আগে আবাসিক হলগুলো নিয়ন্ত্রণ করত ছাত্রলীগ, সে সময় তাদের ইচ্ছেমতো আসন বণ্টন করা হতো। তবে বর্তমানে বিভাগভিত্তিক আসন বরাদ্দ চালু হওয়ায় শিক্ষকদের মাধ্যমে স্বচ্ছভাবে আসন বণ্টন হচ্ছে। এতে ‘অবৈধ’ প্রভাবের সুযোগ কমে গেছে। একইসঙ্গে হলগুলোতে দলীয় আধিপত্য ও গভীর রাতে শিক্ষার্থীদের বের করে দেওয়ার মতো ঘটনাও বন্ধ হয়েছে।
গবেষণায় আমূল পরিবর্তন
শিক্ষকদের গবেষণা অনুদান পেতে এখন বাধ্যতামূলকভাবে অনলাইনে হালনাগাদ প্রোফাইল, পূর্বের গবেষণাপত্র এবং তত্ত্বাবধানে থাকা শিক্ষার্থীদের তথ্য জমা দিতে হচ্ছে। গবেষণাকেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ জানান, গবেষণা খাতকে আরো গতিশীল ও যুগোপযোগী করতে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রথমবারের মতো স্নাতকোত্তর পর্যায়ের থিসিস শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণা অনুদান চালু করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ১৮৪ শিক্ষার্থীকে প্রায় ৪৬ লাখ টাকা প্রদান করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি নবীন গবেষকদের উৎসাহিত করবে। একইসঙ্গে বন্ধ থাকা বিভিন্ন বৃত্তির ফান্ডও পুনরায় চালু করা হয়েছে।
চীন এবং মালয়েশিয়ার তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিক্ষা ও গবেষণা বিনিময়ে চুক্তি হয়েছে। এছাড়া ইউরোপ, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ডিজিটাল সেবা
নিয়োগ, পদোন্নতি ও আপগ্রেডেশন সহজ করতে চালু হয়েছে ‘স্মার্ট রিক্রুটমেন্ট সিস্টেম’। ‘ক্যারিয়ার সাস্ট’ ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এখন আবেদন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ফলাফল, কোর্স রেজিস্ট্রেশন, ফি পরিশোধসহ একাডেমিক কার্যক্রম একটি অ্যাপসের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে, যেখানে ‘এক ক্লিকেই’ মিলছে সেবা।
কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে চালু হয়েছে ‘ইনস্টিটিউশনাল রিপোজিটরি’, যার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব প্রকাশনা সংরক্ষণ করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা এখন অনলাইনে বই, জার্নাল ও সাময়িকী পড়তে এবং সার্চ দিয়ে গ্রন্থাগার থেকে বই খুঁজে বের করতে পারছেন।
প্রকল্পে দৃশ্যমান উন্নয়ন
প্রায় এক হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় একটি ১০ তলা করে ছাত্র ও ছাত্রী হল, গ্র্যাজুয়েট ও বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সাততলা হোস্টেল, চারটি ১০ তলা একাডেমিক ভবন, কেন্দ্রীয় ওয়ার্কশপ, হল এলাকার চারতলা মসজিদ, ইউনিভার্সিটি স্কুল অ্যান্ড কলেজের জন্য ছয়তলা ভবন, ১১ তলা আবাসিক ভবন, কেন্দ্রীয় গ্যারেজ সম্প্রসারণ, দুটি সেতু, বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন, ১০ তলা ক্লাব কমপ্লেক্স এবং তৃতীয় প্রশাসনিক ভবন নির্মাণকাজ দ্রুত এগোচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ২০২২ সালের বন্যার পর জলাবদ্ধতা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ালেও খাল খননের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করা হয়েছে; ফলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ভোগান্তি কমেছে।
পাঁচটি বিভাগে চাহিদার অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ করে দিয়েছেন উপাচার্য। আগে যেখানে অতিরিক্ত নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেখানে হস্তক্ষেপ করে একজন করে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
করোনা মহামারি, ভিসিবিরোধী আন্দোলন, বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগে সৃষ্ট প্রায় দুবছরের সেশনজট কমাতে সেমিস্টারের সময়সীমা ছয় মাস থেকে চার মাসে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে; ফলে কিছুটা অগ্রগতি এসেছে।
অতীতে ছাত্রলীগের মদতে তিন শতাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও গত দেড় বছরে ক্যাম্পাসে সহিংসতা কমে শৃঙ্খলা ফিরেছে। দলীয় শোডাউন ও মারামারির ঘটনা এখন আর দেখা যায় না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ রুদ্র সেনের নামে একটি লেকের নামকরণ করা হয়েছে, যা উপাচার্য অধ্যাপক এএম সরওয়ার উদ্দিন চৌধুরী উদ্বোধন করেন। দুটি দোতলা ও একটি ৬০ আসনের বাস চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্যাম্পাসে ‘শাটল কার’ চালুর ফলে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে স্বস্তি ফিরেছে।
গুচ্ছ পদ্ধতি থেকে বের হয়ে আবারও স্বতন্ত্র ভর্তি পরীক্ষা চালু করা হয়েছে, যা শিক্ষার মানোন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিয়োগ ও পদোন্নতিতে বৈষম্য দূরীকরণে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে অতীতের অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে ২৩টি কমিটি গঠন করে অধিকাংশ তদন্ত সম্পন্ন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের আড্ডা ও স্বল্প খরচে খাবারের সুযোগ নিশ্চিত করতে টংদোকান পুনরায় চালু এবং নতুন ফুডকোর্ট নির্মাণ করা হয়েছে।
উপাচার্য অধ্যাপক সরওয়ারউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং বৈষম্য দূরীকরণের পাশাপাশি গবেষণা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

