চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে বৈষম্য করে বিএনপি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে: সাদিক কায়েম

চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে বৈষম্য করে বিএনপি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে: সাদিক কায়েম

চাকরিপ্রার্থীদের নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনা ও ‘ভেরিফিকেশন’-এর নামে বৈষম্য করা হচ্ছে অভিযোগ করে বিএনপি সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নেতারা। ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেছেন, চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে একের পর এক বৈষম্য করে বিএনপি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং তাদের ‘পায়ের তলায় আর মাটি নেই’।

৪৯তম বিসিএসের চূড়ান্ত গেজেট থেকে ৫৭ জন প্রার্থীর নাম বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে এসব কথা বলেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

এদিন দুপুরের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে থেকে ডাকসুর উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। মিছিলটি কলাভবন ও মধুর ক্যানটিন প্রদক্ষিণ করে ডাকসু ভবন প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ থেকে চাকরিতে দলীয়করণ ও ‘ভেরিফিকেশন’-এর নামে হয়রানি বন্ধ এবং ৪৯তম বিসিএসের চূড়ান্ত গেজেট থেকে বাদ পড়া প্রার্থীদের আগামী ১২ অক্টোবর যোগদানের আগেই গেজেটভুক্ত করার দাবি জানানো হয়।

সমাবেশে সাদিক কায়েম বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম আপনারা পাঁচ বছর ভালোভাবে দেশ পরিচালনা করুন। কিন্তু এখন বিএনপির যে অবস্থা, বিএনপি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তাদের পায়ের তলায় আর মাটি নেই। এ কারণে তারা এমন অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আজকে তারেক রহমানের হাতে দেশের নিয়ন্ত্রণ নেই। তার এমপি-মন্ত্রীরা সবাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছেন।’

‘ভেরিফিকেশন’-এর নামে শিক্ষার্থীদের বাদ দেওয়া এবং নিয়োগে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে সাদিক কায়েম বলেন, বর্তমান প্রশাসন সংবিধানের ২৯ নম্বর ধারা উপেক্ষা করে রাজনৈতিক বিবেচনায় বিরোধী মতাদর্শের শিক্ষার্থীদের চাকরির অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে।

তিনি বলেন, ‘আপনারা বলে দেন, সংবিধানের ২৯ নম্বর ধারায় যে ছাত্রদল, যুবদল, বিএনপির এমপি-মন্ত্রীদের সুপারিশ ছাড়া আর কারও চাকরি হবে না।’

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সার সংকট এবং সারা দেশে লোডশেডিংয়ের জন্যও সরকারের ‘সীমাহীন ব্যর্থতা ও অযোগ্যতাকে’ দায়ী করেন তিনি।

সাদিক কায়েম বলেন, বিএনপি সরকার মেধাকে ধ্বংস করে দলীয়করণের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে চায়। তার দাবি, এর আগে এনটিআরসিএ এবং প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও ‘ভেরিফিকেশন’-এর নামে চাকরিপ্রার্থীদের বঞ্চিত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘হাসিনা কোটা ব্যবস্থার মাধ্যমে এ দেশের মেধাকে ধ্বংস করেছিলেন এবং কোটা আন্দোলনের মাধ্যমে হাসিনার পতন হয়েছিল। সেই একই রাস্তা আজ বিএনপি সরকার গ্রহণ করেছে। তারা আবার দলীয়করণ শুরু করেছে।’

বিএনপিকে হুঁশিয়ার করে ডাকসু ভিপি বলেন, ‘আপনারা যদি হাসিনার মতো আচরণ করতে চান, তাহলে বাংলাদেশে হাসিনার যে পরিণতি হয়েছিল, তার চেয়ে ভয়াবহ পরিণতি আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছে।’

ডাকসুর সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) মুহা. মহিউদ্দিন খান বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর চাকরি ও নিয়োগসংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ভাইভায় মার্ক বাড়ানো থেকে শুরু করে এনটিআরসিএর নিয়োগ বাতিলের যে ইচ্ছা, সর্বশেষ পিএসসি এবং বিসিএসের ভেরিফিকেশন নামক যে দৌরাত্ম্য—এসবের মধ্য দিয়ে তারা প্রমাণ করতে চায় যে, তারা বাংলাদেশকে আবার পিছিয়ে নিয়ে ফ্যাসিবাদী কায়দায় সরকারকে দলীয়করণ করতে চায়।’

মহিউদ্দিন খান আরও বলেন, চাকরির ক্ষেত্রে মেধার বাইরে কোনো বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া যাবে না। রাজনৈতিক পরিচয়, মত বা বর্ণের ভিত্তিতে কোনো প্রার্থীকে বিবেচনা করা হলে তার পরিণতি ‘ভয়াবহ’ হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সমাবেশে ডাকসুর নেতারা বলেন, বিসিএস ও প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগসহ বিভিন্ন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ‘ভেরিফিকেশন’-এর মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই করে বিরোধী মতের প্রার্থীদের বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। পরীক্ষায় ও বিভাগে ভালো ফল করেও শুধু রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে যোগ্য প্রার্থীরা গেজেট থেকে বাদ পড়ছেন বলে তারা অভিযোগ করেন।

মেধায় প্রথম হয়েও গেজেটে নাম নেই

৪৯তম বিসিএসে সমাজকল্যাণ ক্যাডারে প্রথম হয়েও গেজেটে নাম না আসায় নিজের ক্ষোভ ও হতাশার কথা তুলে ধরেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মামুন বেলাল।

সমাবেশে তিনি বলেন, ‘৪১তম বিসিএসে সমাজকল্যাণ ক্যাডারে প্রথম হয়েও আমার গেজেটে নাম আসেনি। শুরু থেকেই বিসিএসের জন্য পরিশ্রম করেছি। জুলাইয়ের আন্দোলনেও সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছি। আমার বিরুদ্ধে এমন কোনো মামলা বা অভিযোগ নেই, যার কারণে গেজেট থেকে বাদ পড়তে পারি।’

তিনি বলেন, ‘বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলনের পরও আজ আমি বৈষম্যের শিকার। আমার দাবি, ১২ অক্টোবরের যোগদানের আগেই বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে গেজেটে নাম অন্তর্ভুক্ত করা হোক।’

৪৯তম বিসিএসের গেজেট থেকে বাদ পড়া আরেক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী রেজোয়ান আহমেদ তাহমিদও সমাবেশে নিজের দীর্ঘ অপেক্ষা ও পারিবারিক কষ্টের কথা তুলে ধরেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।

রেজোয়ান আহমেদ বলেন, দীর্ঘ পরিশ্রম করে ৪১তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর প্রায় ১০ মাস অপেক্ষা করেও শেষ পর্যন্ত গেজেটে তার নাম আসেনি।

তিনি বলেন, ‘ভেরিফিকেশনের সময় আমার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও পারিবারিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। আমি কখনো ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার বাবা বিরোধী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত—এটাই জানিয়েছিলাম। বাবার রাজনৈতিক পরিচয়ের দায় আমার ওপর কেন চাপানো হবে?’

সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জুবায়ের, ছাত্র পরিবহন সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ এবং সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ।

এদিন ডাকসু নেতারা ৪৯তম বিসিএসের চূড়ান্ত গেজেট থেকে বাদ পড়া ৫৭ জন প্রার্থীর বিষয় পুনর্বিবেচনা করে দ্রুত গেজেট প্রকাশ এবং চাকরিতে রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে মেধা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়ার দাবি জানান।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন