তদন্ত কমিটি গঠনের পরও নেই প্রতিবেদন

জুলাই আসে, জুলাই যায় কুবিতে হামলাকারীরা আজও অধরা

জুলাই আসে, জুলাই যায় কুবিতে হামলাকারীরা আজও অধরা
ছবি: সংগৃহীত

জুলাই আসে, জুলাই যায়। কিন্তু কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিচার আজও অধরাই রয়ে গেছে। হামলায় জড়িতদের শনাক্ত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করলেও এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, প্রকাশ হয়নি কোনো তদন্ত প্রতিবেদন। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ধরনের ঘটনায় তদন্ত শেষে বহিষ্কারসহ নানা ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও কুবিতে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা ও রাজনীতিক সংগঠনগুলো।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জুলাই বিপ্লবের সময় আওয়ামীপন্থি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও কিছু শিক্ষকের মদতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী। এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করতে ২০২৫ সালের ২৮ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তবে কমিটি গঠনের পর দীর্ঘসময় পার হলেও এখন পর্যন্ত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি।

বিজ্ঞাপন

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৩তম সিন্ডিকেট সভায় প্রক্টর অধ্যাপক ড. আব্দুল হাকিমকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তবে কমিটিকে কত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে, সে বিষয়ে কোনো সময়সীমা নির্ধারণ ছিল না।

পরে পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ না পাওয়ায় তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি বলে জানান কমিটির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, কমিটির কার্যক্রমে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছিলেন মাত্র দুজন শিক্ষার্থী। পরে সাক্ষ্য দিতে ডাকা হলেও তারা আর উপস্থিত হননি। এছাড়া হামলাকারীদের বিষয়ে তথ্য দিতে একাধিকবার আহ্বান জানানো হলেও প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যায়নি। লিখিত অভিযোগেও নির্দিষ্টভাবে ঘটনার বিস্তারিত উল্লেখ না করে শুধু কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল।

তবে তদন্ত কমিটির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়নি বলে জানিয়ে আব্দুল হাকিম বলেন, এখনো কেউ যদি তথ্যপ্রমাণ দেয়, আমরা তা গ্রহণ করব। প্রয়োজনীয় দলিলপত্রের ভিত্তিতে তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করে সিন্ডিকেটে উপস্থাপন করা হবে। তবে তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কোনো স্বাধীন তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়নি।

জানা যায়, ২০২৪ সালের ১১ জুলাই শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএফএম আব্দুল মঈন, তৎকালীন প্রক্টর ড. কাজী ওমর সিদ্দিকীসহ ৩৬ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরো ৫০-৬০ জন আসামি করে ওই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় বিস্ফোরক আইনে মামলা দায়ের করা হয়। মামলার বাদী ছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক সাখাওয়াত হোসেন।

এছাড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কুমিল্লা মহানগরের আহ্বায়ক আবু রায়হান ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর তদন্ত কমিটির কাছে পৃথক লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগে তৎকালীন উপাচার্য, প্রক্টরসহ মোট ২০ জনের নাম উল্লেখ করে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১১ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে আনসার ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলা, গুলি, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জের ঘটনায় তাদের ভূমিকা ছিল।

জুলাই বিপ্লবের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তদন্ত শেষে দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার অভিযোগে ১২৮ শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। পাশাপাশি তিন শিক্ষক ও এক কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত এবং আরো দুই শিক্ষককে একাডেমিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬৪ জন বর্তমান শিক্ষার্থীকে স্থায়ী বহিষ্কার, ৭৩ জন সাবেক শিক্ষার্থীর সনদ বাতিল এবং বিভিন্ন মেয়াদে আরো বহু শিক্ষার্থীকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ১২ শিক্ষক ও এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৩ শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার, ১৯ শিক্ষক এবং ১১ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এছাড়া রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট) চার শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার এবং ৪৪ জনের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এসব উদাহরণের বিপরীতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ কিংবা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এদিকে হামলাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা। তাদের অভিযোগ, দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে, সেখানে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিযুক্ত ছাত্রলীগকর্মীরা নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। একইভাবে অভিযোগের মুখে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও আগের মতোই চাকরিতে বহাল রয়েছেন।

আইন বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী বায়েজিদ হাসান বলেন, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় যারা জড়িত ছিলেন, তাদের পরিচয় ও ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ক্যাম্পাসে আলোচনা রয়েছে। কিন্তু হামলার দুই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় আমরা হতাশ। আমরা নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান শুভ বলেন, ছাত্রদল বরাবরের মতোই ঐতিহাসিক আন্দোলনে হামলাকারীদের বিচারের দাবি জানিয়ে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও এ বিষয়ে সক্রিয় থাকবে। শুধু জুলাই বিপ্লবের সময় হামলাকারীরাই নয়, গত ১৭-১৮ বছরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ওপর যারা নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়েছে, তাদের প্রত্যেকেরই বিচার হওয়া উচিত। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল হামলাকারীদের শনাক্ত করে প্রশাসনের কাছে বিচারের দাবি জানিয়েছে এবং সামনে এ বিষয়ে সামনে আরো পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

নতুন উপাচার্যের প্রতি প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, প্রয়োজনে তদন্ত কমিটি পুনর্গঠন করে আরো কার্যকরভাবে দায়িত্ব দিতে হবে। তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে হামলাকারীদের শনাক্ত করে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।

শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোজাম্মেল হোসেন আবির বলেন, জুলাই বিপ্লবে হামলাকারী ইন্ধনদাতাদের বিচার ছাত্রশিবিরের অন্যতম দাবি। আমরা বারবার এ বিষয়ে প্রশাসনের কাছে বিচার চেয়ে আসছি, কিন্তু দুঃখজনকভাবে দুই বছর পার হয়ে গেলেও অদৃশ্য কারণে এর কোনো অগ্রগতি দেখছি না। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হলেও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে তা সম্ভব হয়নি, যা অত্যন্ত হতাশাজনক। বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি প্রত্যাশা থাকবে, তারা বিচার নিশ্চিত করতে আরো বেশি তৎপর হবে।

এ বিষয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমএম শরিফুল করিম বলেন, জুলাই-আগস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে মামলাগুলো হয়েছে, সেগুলোর কোনো মামলার বাদী আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নন। তবে ওই মামলাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্টদের আমরা কোনো ধরনের পদোন্নতি বা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োগ দিচ্ছি না। যেহেতু তদন্ত কমিটি আছে, তাই আমরা তাদের তদন্তকাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার জন্য বলব।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন