জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডির ৪১ বছর

জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডির ৪১ বছর

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডির ৪১ বছর পূর্ণ হয়েছে আজ বৃহস্পতিবার। ১৯৮৫ সালের এই দিনে হলের তৎকালীন অ্যাসেম্বলি হলের (বর্তমান টিভি রুম) ছাদ ধসে ২৬ জন শিক্ষার্থী এবং ১৪ জন অতিথি ও কর্মচারীসহ মোট ৪০ জন নিহত হন। এ ঘটনায় আহত হন শতাধিক মানুষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে অন্যতম শোকাবহ এ দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে শোক, শ্রদ্ধা ও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)।

বিজ্ঞাপন

দিবসটি উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের নেতৃত্বে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা জগন্নাথ হল স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে হলের কিশোরীলাল রায় চৌধুরী অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। এতে সভাপতিত্ব করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।

আলোচনা সভায় নিহতদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে উপাচার্য বলেন, ১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবরের মর্মান্তিক ঘটনা জাতি, ধর্ম ও বর্ণনির্বিশেষে সমগ্র বাংলাদেশকে একত্রিত করেছিল। সেই ঐক্যের বন্ধন আরও সুদৃঢ় করতে হবে এবং সমাজের সর্বস্তরে তা ছড়িয়ে দিতে হবে।

তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে নিরাপদ রাখতে তাঁরা কাজ করছেন। এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে চান, যেখানে আবাসিক হলসহ নিজ নিজ বাসস্থানে সবাই নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে বসবাস করতে পারবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সবার উল্লেখ করে উপাচার্য বলেন, সবাইকে নিয়েই এই বিশ্ববিদ্যালয়। নিরাপদ ক্যাম্পাস বিনির্মাণে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা, কর্মচারীসহ সব অংশীজনের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টায় জগন্নাথ হল স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে দিবসের কর্মসূচি শুরু হয়। এরপর কিশোরীলাল রায় চৌধুরী অডিটোরিয়ামে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, জগন্নাথ হলের বর্তমান ও সাবেক প্রাধ্যক্ষ, হল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ, ছাত্রসংগঠনের প্রতিনিধি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারী সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন।

আলোচনা সভায় প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. দেবাশীষ পাল, হলের সাবেক প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. অজয় কুমার দাস, জগন্নাথ হল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তপন চন্দ্র মজুমদার ও সাধারণ সম্পাদক নিবাস চন্দ্র মাঝি বক্তব্য দেন।

এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন এবং জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডিতে আহত শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. হিমাদ্রি শেখর চক্রবর্তী বক্তব্য রাখেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন, কর্মচারী সমিতি, কারিগরি কর্মচারী সমিতি ও চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারী ইউনিয়নের নেতারাও সভায় বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদ। এ সময় বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভিন্ন হলের প্রাধ্যক্ষ, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও অ্যালামনাই সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডির ৪১তম বার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব হল, হোস্টেল ও প্রধান প্রধান ভবনে কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। পাশাপাশি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা কালো ব্যাজ ধারণ করেন।

নিহতদের আত্মার শান্তি কামনায় জগন্নাথ হল প্রাঙ্গণে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের প্রার্থনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সকালে হল প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় রক্তদান কর্মসূচির।

এ ছাড়া বাদ আসর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ মসজিদুল জামিআসহ সব হলের মসজিদে নিহতদের আত্মার শান্তি কামনায় মোনাজাতের কর্মসূচি রাখা হয়েছে।

জগন্নাথ হল প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত নিহতদের তৈলচিত্র ও তাদের স্মৃতিসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দ্রব্য প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় হলের উপাসনালয়ে শোকসংগীত ও কবিতা আবৃত্তির আয়োজন করা হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে হল প্রশাসনের উদ্যোগে ‘অক্টোবর স্মৃতি রচনা প্রতিযোগিতা’ ও ‘অক্টোবর স্মৃতি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা’রও আয়োজন করা হবে।

উল্লেখ্য, ১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের তৎকালীন অ্যাসেম্বলি হলের ছাদ ধসে মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে। এতে ২৬ জন শিক্ষার্থী এবং ১৪ জন অতিথি ও কর্মচারীসহ মোট ৪০ জন প্রাণ হারান। এ ঘটনায় আহত হন অসংখ্য শিক্ষার্থী ও অতিথি।

সেই দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে প্রতিবছর ১৫ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শোক দিবস পালন করা হয়। দিনটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের কাছে শোক ও স্মৃতিচারণের পাশাপাশি পারস্পরিক সম্প্রীতি, মানবিক ঐক্য এবং নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়ে তোলার অঙ্গীকারের প্রতীক হয়ে আছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন