ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার সাত লাখের বেশি বইয়ের বিশাল ভাণ্ডার। কিন্তু এই জ্ঞানভাণ্ডারের দরজা শিক্ষার্থীদের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত নয়। অদ্ভুত ও সেকেলে কিছু নিয়মের কারণে বই স্পর্শ করা দূরের কথা, র্যাক থেকে নিজ হাতে বই বেছে নেওয়ার সুযোগও নেই শিক্ষার্থীদের। ফলে অনেকেই এই গ্রন্থাগার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আয়েশা সিদ্দিকা তামান্না নিয়মিত শাহবাগের পাঠক সমাবেশে গিয়ে বই পড়েন। সেখানে দেখে, ছুঁয়ে, উল্টেপাল্টে পছন্দের বই বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা আছে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে সেই অভিজ্ঞতা একেবারেই অনুপস্থিত।
তামান্না বলেন, ‘শেলফ থেকে বই বেছে নিতে আমার ভালো লাগে। অনেক সময় পুরো বই না পড়লেও বিষয়বস্তু দেখে নেওয়া যায়। কিন্তু কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে সে সুযোগই নেই। তাই যাওয়া হয় না।’
শুধু তামান্না নন, এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে আরো অনেক শিক্ষার্থীর। উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করা শাহীন আলম জানান, লাইব্রেরির পাশ দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করলেও ভেতরে ঢোকার আগ্রহ জন্মায় না। তার ভাষায়, এখানে এমন কিছু অদ্ভুত নিয়ম আছে, যা পৃথিবীর অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে আছে বলে মনে হয় না।
গ্রন্থাগারের বাস্তব চিত্রও যেন সে কথারই প্রতিফলন। পাঠকক্ষের পাশেই বইয়ের কক্ষ, কিন্তু সেখানে প্রবেশ নিষিদ্ধ। দরজার সামনে টেবিল বসিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয় প্রবেশ। কোনো বই দরকার হলে শিক্ষার্থীকে স্লিপে লিখে দিতে হয়; এরপর লাইব্রেরিয়ান তা এনে দেন। র্যাকের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পছন্দের বই বেছে নেওয়ার সুযোগ নেই। এক শিক্ষার্থীর ভাষায়, বইয়ের রাজ্যে হেঁটে বেড়ানোর আনন্দটাই এখানে নিষিদ্ধ।
এমন সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক শিক্ষার্থী কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পরিবর্তে নিজ নিজ বিভাগের লাইব্রেরির ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছেন।
ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী সাইদুল ইসলাম জানান, বিভাগীয় গ্রন্থাগার থেকেই প্রয়োজনীয় বই সংগ্রহ করেন এবং সেখানে নিজ হাতে বই বেছে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সমাজবিজ্ঞান, আইন, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরাও একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
তবে গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছে। তাদের দাবি, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে নিয়মের এই কড়াকড়ি। বিষয়টি নিয়ে তথ্যকেন্দ্র থেকে জানানো হয়, শিক্ষার্থীরা নিজের হাতে বই নিলে এলোমেলো হয়ে যেতে পারে এবং পরে তা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে এ যুক্তিকে একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজির অধ্যাপক ড. শরিফুল ইসলাম বলেন, এখন আর শিক্ষার্থীদের বই ছুঁতে না দেওয়ার যুগ নেই। সিসিটিভি ও আরএফআইডি প্রযুক্তি ব্যবহার করে সহজেই এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।
তিনি আরো বলেন, আধুনিকায়নের নামে যদি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বইয়ের দূরত্ব বাড়ে, তাহলে তা জ্ঞানচর্চার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। বর্তমান পদ্ধতিতে একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, শিক্ষার্থীরা শুধু নির্দিষ্ট বইয়ের নাম জানলেই তা সংগ্রহ করতে পারেন। কিন্তু বইয়ের জগতে অনেক সময় আকস্মিক আবিষ্কারই হয়ে ওঠে জ্ঞানার্জনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই র্যাক থেকে বই দেখে আগ্রহ তৈরি হওয়া প্রক্রিয়াটিই এখানে অনুপস্থিত।
এদিকে গ্রন্থাগারের পরিবেশ নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। অনেক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, শৌচাগার থেকে আসা দুর্গন্ধের কারণে প্রথম অভিজ্ঞতাই হয়ে ওঠে তিক্ত। এ কারণে অনেকেই পরবর্তীতে আর যেতে যান না।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ভারপ্রাপ্ত গ্রন্থাগারিক অধ্যাপক ড. কাজী মোস্তাক গাউসুল হক জানান, দীর্ঘদিন ধরেই ‘ক্লোজড অ্যাক্সেস’ পদ্ধতিতে গ্রন্থাগার পরিচালিত হয়ে আসছে, যা এখন ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা নিজেরা বই নিয়ে আবার যথাস্থানে না রাখলে পুরো ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। তাছাড়া পর্যাপ্ত জনবলও নেই।
তবে ভবিষ্যতে আংশিকভাবে ‘ওপেন অ্যাক্সেস’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে এবং ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে গ্রন্থাগারকে আরো শিক্ষার্থীবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আইসিটি সেলের পরিচালক ড. মোসাদ্দেক কামাল তুষার বিদ্যমান পদ্ধতিকে ‘বেমানান’ উল্লেখ করে বলেন, ‘অটোমেশন পদ্ধতি চালুর পর বই ও শিক্ষার্থীদের মাঝে এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়েছে। আমি নিজেও এ বিষয়গুলো এক সময় ফেইস করেছি। বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবা উচিত।
নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেগা প্রকল্পে আধুনিক গ্রন্থাগার নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

