উত্তরবঙ্গের অন্যতম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ দিনের দাবি ছিল লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করা। বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানের পর এ দাবি আরো জোরালো হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থীরা সহিংসতামুক্ত, শিক্ষাবান্ধব ও শান্তিপূর্ণ ক্যাম্পাস চেয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রশাসনের কাছে দাবি জানাতে থাকেন।
শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৮তম সিন্ডিকেট সভায় ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় ১৫ সদস্যের মধ্যে আটজন উপস্থিত ছিলেন এবং সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে ক্যাম্পাসে রাজনীতির ইতি টানার কথা বলা হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থীরা।
সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কেউ যদি ব্যানার-ফেস্টুন ব্যবহার করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালায় বা চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সিট বাণিজ্য, সহিংসতা কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়, তবে তদন্ত সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি—আজীবন বহিষ্কার ও ছাত্রত্ব বাতিল—আরোপ করা হবে। প্রয়োজনে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হবে।
এছাড়া, অভিযোগ দ্রুত তদন্তের জন্য তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। অভিযোগ পাওয়ার পর তিন কার্য দিবসের মধ্যে কমিটিকে সুপারিশপত্র জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সিন্ডিকেটের সভায় নেওয়া এমন কঠোর নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলে অভিযোগ করছেন শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ক্যাম্পাসে দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধের দাবি করলেও বিভিন্ন সময় শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ক্যাম্পাসে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের কমিটি গঠন, রাজনৈতিক আলোচনা সভা, ইফতার মাহফিল ও বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করা হচ্ছে। প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের দলীয় রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ এবং অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক বৈঠক ও সমাবেশও পালিত হচ্ছে।
বিশেষ করে, জাতীয়তাবাদী ফোরামের উদ্যোগে আয়োজিত একটি আলোচনা সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ প্রশাসনিক ব্যক্তিদের উপস্থিতি নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। একইভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে প্রশাসনের সংশ্লিষ্টতা নিয়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
শিক্ষার্থীদের মতে, এসব কার্যক্রম প্রমাণ করে যে নিষেধাজ্ঞা কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে তার পূর্ণ প্রয়োগ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
এদিকে, রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সংগঠনের কমিটি ঘোষণার ঘটনা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। জাতীয়তাবাদী কর্মকর্তা ফোরাম কণ্ঠভোটের মাধ্যমে দুই বছরের জন্য নতুন কমিটি ঘোষণা করেছে। এতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়।
অন্যদিকে, ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শিবির ও ছাত্রদলের মতো সংগঠনগুলোর আংশিক কমিটির ঘোষণা ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ।
স্থবির ছাত্র সংসদ নির্বাচন
লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের পর শিক্ষার্থীরা একটি প্রতিনিধিত্বশীল ছাত্র সংসদ নির্বাচনের প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু সেই প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি।
কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (ব্রাকসু) ও হল সংসদের নির্বাচন একাধিকবার পিছিয়ে যাওয়ার পর চলতি বছর ২৫ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করা হলেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে তা স্থগিত করা হয়।
কিন্তু সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো নতুন তফসিল ঘোষণা করা হয়নি। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের দাবিতে তারা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেছেন, তবে এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মো. শামসুর রহমান সুমন বলেন, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেরোবিতে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের ইতিহাস একটু ভিন্ন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বেরোবির শিক্ষার্থী আবু সাঈদ শহীদ হওয়ার পর ভবিষৎতে আর যেন কোনো ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন শিক্ষার্থীদের ওপর সহিংস হয়ে না ওঠে সেজন্য বেরোবিতে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। এছাড়া, বিশ্ববিদ্যালয়ে সিট বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য, ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক মিছিল মিটিংসহ যেসব কাজ শিক্ষা, মননশীলতা ও গবেষণার অন্তরায়Ñ সেগুলো বন্ধ রাখতে রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়।
তিনি আরো বলেন, সেই স্বপ্ন লালন করেই শিক্ষার্থীরা গণস্বাক্ষর সংবলিত স্মারকলিপি দিয়ে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি করলে প্রশাসন ১০৮তম সিন্ডিকেটে সিদ্ধান্ত নিয়ে এটি বাস্তবায়ন করে এবং শাস্তির বিধান করে। কিন্তু বারবার সেটি লঙ্ঘিত হলেও প্রশাসন যেন নীরব। এতে করে তাদের ভঙ্গুর প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রকাশ পায়। ইদানিং প্রশাসন নিজেই লেজুড়বৃত্তির সঙ্গে জড়িয়ে এই আইন ‘বেড়া ক্ষেত খাওয়ার ন্যায়’ অবস্থায় পরিণত হয়েছে। সুতরাং শক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা না থাকলে এসব আইন খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে এবং বিশৃঙ্খলাকে উসকে দেবে।
বিশ্ববিদ্যালয় আরেক শিক্ষার্থী এসএম আশিকুর রহমান বলেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ; কিন্তু তা শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। এর দায়ভার সম্পূর্ণ প্রশাসনের। কারণ আইন অনুযায়ী লেজুড়বৃত্তিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে শাস্তির আইন থাকলেও প্রশাসন এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বরং প্রশাসন নিজে রাজনৈতিক প্রোগ্রামে উপস্থিত থাকে এবং যারা এসব কর্মকাণ্ড করে তাদের সেফ এক্সিট দেয়।
তিনি আরো বলেন, শিক্ষার্থীদের গণস্বাক্ষরই প্রমাণ করে তারা আসলে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি চায় না। প্রশাসন যদি এসব ব্যাপারে কঠোর হয় এবং যারা এসব কর্মকাণ্ড করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় তাহলে সম্ভব লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি বন্ধ রাখা। আমরা এই লেজুড়বৃত্তির রাজনীতির কারণে আর কোনো আবু সাঈদকে হারাতে চাই না।
মো. নয়ন নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, দলীয় ছাত্ররাজনীতি একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের নিজেদের মধ্যেই সংঘাত, মারামারি ও হানাহানি সৃষ্টি করে। রাজনৈতিক নেতারা দলীয় ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে ছাত্রদের মধ্যে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি’ প্রয়োগ করে। এভাবে রাজনৈতিক স্বার্থে বন্ধু-বন্ধুর গায়ে হাত তুলতে এমনকি খুন পর্যন্ত করতেও পরোয়া করে না । অথচ যেই রাজনৈতিক নেতার পিছনে সে দৌড়ায় তাকে সেই নেতা চিনেও না। তিনি আরো বলেন, বেরোবিতে দলীয় ছাত্র রাজনীতি ১০৮তম সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই বিষয়ে নীরব। শিবির ও ছাত্রদল উভয়ে আইন অমান্য করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রোগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। এই বিষয়ে প্রশাসনকে অভিযোগ করলেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। বরং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরেই আইন অমান্য করে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রোগ্রাম আয়োজন করছে এবং অংশগ্রহণ করছে ।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. ফেরদৌস রহমান বলেন, এখন পর্যন্ত সিন্ডিকেট মোতাবেক বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের লেজুড়ভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ আছে। তবে শিবিরের কমিটি বা ছাত্রদলের কমিটি এগুলোতো আমরা দিই না। এগুলো কেন্দ্র থেকে দেয়।
তিনি আরো বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আপাতত কোনো প্রকার রাজনীতি করার কোনো সুযোগ নেই। তবে জাতীয়তাবাদী ফোরাম সংগঠন এরকম পেশাজীবী কিছু সংগঠন আছে যেগুলো সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না। যে সংগঠনগুলো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত আছে সেগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে নিষিদ্ধ আছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

