শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনির্বাচিত কমিটি নিয়ে ক্ষোভ, বাড়ছে জটিলতা

Md. Raquibul Haque
রকীবুল হক

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনির্বাচিত কমিটি নিয়ে ক্ষোভ, বাড়ছে জটিলতা

দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য কলেজ পর্যায়ে গভর্নিং বডি এবং নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুলে ম্যানেজিং কমিটি গঠনের বিধান রয়েছে। দাখিল ও আলিম পর্যায়ের মাদরাসা এবং সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতেও আলাদা নিয়মে কমিটি গঠন করা হয়।

এতে শিক্ষক ও অভিভাবক প্রতিনিধি নির্বাচিত হন ভোটের মাধ্যমে। তবে গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটি পুনর্গঠনে ব্যর্থ হলে নির্ধারিত নিয়মে অ্যাডহক কমিটি এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে বিশেষ কমিটি গঠনেরও সুযোগ আছে সংশ্লিষ্ট।

বিজ্ঞাপন

আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে অনির্বাচিত কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে। এতে অনিয়ম-দুর্নীতি ও দলীয়করণসহ নানা জটিলতা বাড়ছে। এমনকি কোথাও কোথাও স্কুল কমিটি নিয়ে সংঘাত-সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনা ঘটছে বলেও খবর পাওয়া গেছে।

সূত্রমতে, পতিত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের সময় থেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি নির্বাচন না হওয়ার ব্যাপক প্রবণতা দেখা যায়। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন হলেও তাতে ব্যাপক অনিয়মের ঘটনা ঘটে।

চব্বিশের জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর সারা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি বাতিল করে অ্যাডহক কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ সময় ওই কমিটিতে স্থান পাওয়া নিয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের অনুসারীদের প্রতিযোগিতা লেগে যায়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নির্বাচনের মাধ্যমে কমিটি গঠনের দাবি উঠলেও নানা কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। ইতোমধ্যে ৬ মাস মেয়াদি অ্যাডহক কমিটিগুলোর মেয়াদ দুই-তিন দফায় বাড়ানো হয়েছে।

এদিকে গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটি দখল নিয়ে চলছে নতুন তৎপরতা। নতুন করে গঠিত হচ্ছে অ্যাডহক কমিটি। এমনকি নির্বাচিত সরকারের সময়েও দীর্ঘমেয়াদি বিশেষ কমিটি গঠনের খবর পাওয়া গেছে। শিক্ষা বোর্ড থেকে এসব কমিটির অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। এ নিয়ে শিক্ষক ও অভিভাবক নেতারা চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে নির্বাচিত কমিটি গঠনের ওপর জোর দিয়েছেন তারা।

রাজধানীর মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিশেষ কমিটি গঠনের পর মতিঝিলের আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজেও একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলু।

গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটিতে ওই কমিটি গঠন না করার দাবি জানিয়েছেন তিনি। বিবৃতিতে তিনি বলেন, স্বৈরাচারী আওয়ামী সরকারের পতনের পর একটি স্বার্থান্বেষী মহল বারবার একই ব্যক্তিদের নিয়ে অ্যাডহক কমিটি গঠন করে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই একই ব্যক্তি সভাপতি ও অভিভাবক প্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত হয়ে আসছেন এবং সরকারি বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছেন।

তিনি আরো বলেন, অ্যাডহক কমিটির সভাপতি ও সদস্যরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোচিং বাণিজ্য বন্ধের নীতিমালা, শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি, ভর্তি, আয়-ব্যয়সহ বিভিন্ন সরকারি নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করছেন না। বরং বিভিন্ন খাত সৃষ্টি করে স্কুলের ফান্ড অনৈতিকভাবে উজাড় করে দিচ্ছেন।

জিয়াউল কবির দুলু বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম চলছে। এমন পরিস্থিতিতে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিশেষ বা অ্যাডহক কমিটি গঠনের যৌক্তিকতা নেই। তিনি দাবি করেন, জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ১৫ দিনের মধ্যেই গভর্নিং বডির নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব।

অভিভাবকরা মাঠে নামার আগেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমিটি নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে জিয়াউল কবির দুলু আমার দেশকে বলেন, অ্যাডহক কমিটির উদ্দেশ্যই থাকে নির্বাচন দেওয়া। কিন্তু তারা এখন নানা অজুহাতে নির্বাচন না দিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করে। বর্তমানে স্কুলকেন্দ্রিক রাজনীতি শুরু হয়েছে দাবি করে এই অভিভাবক নেতা আরো বলেন, এখন স্কুল কমিটি দখল করা হচ্ছে। তাই এসব কমিটি নির্বাচনের বিকল্প নেই।

এ বিষয়ে শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের মহাসচিব জাকির হোসেন আমার দেশকে বলেন, অ্যাডহক কমিটি ও বিশেষ কমিটি দেওয়ার কারণে শিক্ষাব্যবস্থায় হ-য-ব-র-ল অবস্থার পাশাপাশি একপ্রকার রাজত্ব ও দখল করার মানসিকতা তৈরি হবে। এতে শিক্ষার বড় ক্ষতি হবে। এসব কমিটির ক্ষেত্রে মামা-চাচা বা অর্থের জোর প্রাধান্য পাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে স্থানীয় এমপির মতামত উপেক্ষা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিরোধী দলের বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য। তাছাড়া, স্কুল ম্যানেজিং কমিটি গঠন, সভাপতি নির্বাচন বা আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে জয়পুরহাট, সাতক্ষীরা, সিরাজগঞ্জ, বাগেরহাটের মোংলা এবং নড়াইলের লোহাগড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই ইস্যুতে বহু প্রতিষ্ঠানে চাপা ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটি গণতান্ত্রিক পক্রিয়ায় হওয়া উচিত—মন্তব্য করে আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশনের মহাসচিব অধ্যাপক এবিএম ফজলুর রহমান আমার দেশকে বলেন, বর্তমান নির্বাচিত সরকারের সময়ে অনির্বাচিত বা অগণতান্ত্রিক উপায়ে গঠিত কোনো কমিটি জনগণ মানবে না। সরকারকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে বর্তমানে অ্যাডহক কমিটি দেওয়া হলেও আগামীতে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী কমিটি গঠনের আশ্বাস দিয়েছেন ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান। তিনি আমার দেশকে বলেন, বর্তমানে ২০২৪ সালের প্রবিধানমালার সংশোধনীর আলোকে কমিটি দেওয়া হচ্ছে। তবে পরবর্তী সময়ে যেখানে নির্বাচন প্রয়োজন, সেখানে সেভাবেই কমিটি দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা হবে ইনশাআল্লাহ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন