সংবাদকর্মী ও শিক্ষার্থীদের ওপর নৃশংস পুলিশি হামলার প্রতিবাদে জবিতে মানববন্ধন

প্রতিনিধি, জবি

সংবাদকর্মী ও শিক্ষার্থীদের ওপর নৃশংস পুলিশি হামলার প্রতিবাদে জবিতে মানববন্ধন

পুরান ঢাকার মুরগিটোলা মোড়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী ও পেশাগত দায়িত্ব পালনরত সংবাদকর্মীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জের প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

মানববন্ধন থেকে জবি শিক্ষার্থী ও প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এবং আমার দেশ পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি লিমন ইসলামের ওপর হামলার বিচার, দায়ী পুলিশ সদস্যদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, আহতদের চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণের দাবি এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকার সমালোচনা করা হয়।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের রফিক ভবনের নিচে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাব, সাংবাদিক সমিতি, রিপোর্টার্স ইউনিটি ও মাল্টিমিডিয়া ইউনিটির যৌথ উদ্যোগে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

মানববন্ধনে বক্তারা একযোগে দাবি জানান, মুরগিটোলার ঘটনায় জবি প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক লিমন ইসলামসহ আহত সব সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীর চিকিৎসার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নিতে হবে, দায়ী পুলিশ সদস্য ও হামলাকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং ভবিষ্যতে শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

ছাত্র মজলিসের সদস্যসচিব ওবায়দুল ইসলাম বলেন, পুলিশের চরিত্রের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা গেছে, সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী পরিচয় দেওয়ার পরও লিমনকে মারধর করা হয়েছে। তিনি দায়ী পুলিশ সদস্যদের প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া এবং শাস্তির দাবি জানান। একই সঙ্গে প্রক্টরিয়াল বডির দায়িত্বহীনতারও সমালোচনা করেন।

জবি ছাত্রশক্তির সদস্যসচিব শাহিন মিয়া বলেন, তিনি নিজেও ওই ঘটনার একজন ভুক্তভোগী। ঘটনাস্থলে গিয়ে শিক্ষার্থীরা বারবার পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করলেও কিছু পুলিশ সদস্য আকস্মিকভাবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয়ে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী রাহাত, জবি প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও আমার দেশ পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি লিমন ইসলামসহ কয়েকজনকে বেধড়ক মারধর করেন, যা কোনোভাবেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আচরণ হতে পারে না। তিনি অভিযোগ করেন, রাত ১১টার দিকে ঘটনা শুরু হলেও বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও প্রক্টর অফিসের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি প্রায় স্বাভাবিক হওয়ার পর গভীর রাতে প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তিনি এ অবস্থাকে ‘ডাক্তার আসিবার পূর্বেই রোগীটি মারা গেল’-এর সঙ্গে তুলনা করে বলেন, শিক্ষার্থীরা মার খাওয়ার পর শুধু চিকিৎসার ব্যবস্থা করাই প্রশাসনের দায়িত্ব হতে পারে না। তিনি আরও বলেন, বারবার শিক্ষার্থীরা স্থানীয়দের ও পুলিশের হামলার শিকার হলেও সুষ্ঠু বিচার না হওয়ায় এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। হামলার বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি শিক্ষার্থী, সাংবাদিক ও ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ওই দায়িত্বে থাকার নৈতিক অধিকার তাদের নেই।

জবি ছাত্রদলনেতা রিয়াসাল রাকিব বলেন, পুরান ঢাকায় আবাসিক শিক্ষার্থীরা প্রায়ই নানা সমস্যার মুখোমুখি হন, কিন্তু প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পান না। তিনি অভিযোগ করেন, স্থানীয় অপরাধীদের রক্ষার চেষ্টা করতে গিয়েই পুলিশ শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালিয়েছে। হামলার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

জবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি ও জকসু জিএস আব্দুল আলিম বলেন, গেন্ডারিয়া থানায় গিয়ে তারা তিনটি দাবি তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় মাদক কারবার দমন, সাংবাদিক লিমনের ওপর হামলার বিচার এবং পুরান ঢাকায় অবস্থানরত জবি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী পরিচয় দেওয়ার পরও লিমনকে একাধিক পুলিশ সদস্য মিলে মারধর করেছে, যা অত্যন্ত নিন্দনীয়। আহত লিমনসহ সব শিক্ষার্থীর সুচিকিৎসা নিশ্চিত করারও দাবি জানান তিনি।

জবি রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা করে কলম থামিয়ে দেওয়া যাবে না। তিনি অভিযোগ করেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। দায়ী পুলিশ সদস্যদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দেন তিনি।

জবি সাংবাদিক সমিতির পক্ষ থেকে দ্য ডেইলি স্টারের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পরও লিমনকে নির্মমভাবে মারধর করতে দেখেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, ঘটনার শুরু থেকে দীর্ঘ সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কেউ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। প্রশাসন শুরু থেকেই সক্রিয় থাকলে শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের মার খেতে হতো না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। পাশাপাশি আহত সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা ব্যয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বহনের দাবি জানান।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবের সভাপতি মুশফিকুর রহমান মুশফিক বলেন, তাদের সাধারণ সম্পাদক লিমন ইসলাম এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি অভিযোগ করেন, ঘটনার সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রয়োজনীয় তৎপরতা ছিল না। বারবার যোগাযোগ করেও প্রশাসনের কার্যকর সাড়া পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, প্রশাসন দ্রুত পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে দায়ীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত না করলে জবি প্রেসক্লাব, সাংবাদিক সংগঠন, ছাত্র সংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

উল্লেখ্য, এর আগে গত ৬ জুলাই মধ্যরাতে পুরান ঢাকার মুরগিটোলা মোড়ে জুতা চুরির অভিযোগকে কেন্দ্র করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয়দের সংঘর্ষের পর পুলিশের লাঠিচার্জে জবি প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও আমার দেশ পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি লিমন ইসলামসহ অন্তত ১৩ জন আহত হয়েছেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন