বছর পেরোলেও খুনিদের পরিচয় জানাতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা

বছর পেরোলেও খুনিদের পরিচয় জানাতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা
ফাইল ছবি

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ইতিহাসে শোকের প্রতীক হয়ে থাকা একটি দিন ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই। ঠিক এক বছর আগে এই দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ আজিজুর রহমান হল-সংলগ্ন পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয় আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাজিদ আব্দুল্লাহর লাশ। প্রথমে পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও পরে ফরেনসিক ও ভিসেরা প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয় পানিতে ডুবে নয়, শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে তাকে।

তবে এক বছর পরও সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার তো দূরের কথা, খুনিদের পরিচয়ও নিশ্চিত করতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা। প্রশাসনের একের পর এক আশ্বাস, তদন্ত কমিটি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার ঘোষণা। এত কিছুর পরও মামলাটি আজও অমীমাংসিত।

বিজ্ঞাপন

সাজিদকে হত্যার পর পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও স্মরণসভা করেন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিয়াশীল সংগঠনগুলোও সম্মতি জানিয়ে আন্দোলন সক্রিয় করে তোলে। তাদের একটাই দাবি ছিল দ্রুত হত্যাকারীদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।

এদিকে ক্যাম্পাস অস্থিতিশীলতার দোহাই দিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে ওঠা আন্দোলন নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে সাজিদের বিভাগ আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগের শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে আন্দোলন পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে দায়িত্বপ্রাপ্তির পর মহাসমারোহে আন্দোলন করলেও কয়েকদিন পর তা গতি হারায়।

সাজিদ হত্যার বিচার চেয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী জারিন তাসনিম পুষ্প বলেন, গত বছর আমাদের বন্ধু সাজিদ আব্দুল্লাহকে নির্মমভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়। বিগত প্রশাসনের তদন্ত প্রক্রিয়ায় নানা ধরনের গাফিলতি ও তালবাহানার অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধেও আজ পর্যন্ত কোনো কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিরই পরিণতিতে মাত্র ৯ মাসের ব্যবধানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় আরেকটি হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী হয়েছে।

এছাড়া, গত ২৭ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মনজুরুল হক স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে সাজিদ হত্যা মামলার তদন্তকাজে প্রয়োজনবোধে বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষার্থী বা অন্য কোনো ব্যক্তিকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেওয়া হয় সিআইডিকে। তারা বিভিন্ন সময় সাজিদের বন্ধুবান্ধব, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ছাত্রনেতা ও সাংবাদিকসহ অন্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেও এখনো কোনো ক্লু বের করতে পারেননি। তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের চাপের মুখে কিছুদিন পরপর ইবির প্রক্টর অফিসে সিআইডির ব্রিফিংয়ের আয়োজন করলেও প্রায় একই ধরনের আশাবাদ একাধিকবার ব্যক্ত করায় তা শিক্ষার্থীদের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে।

এদিকে, সাজিদ হত্যার তদন্তের কাজে ইবি থানা ও সিআইডি অনেকটা ব্যর্থ হলেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গঠিত ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির প্রতিবেদনে। তাতে দেখা যায়, সাজিদ হত্যার পরে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাজিদের ব্যবহৃত শহীদ জিয়াউর রহমান হলের ১০৯ নম্বর কক্ষে বেডটি তদন্তের স্বার্থে উলটপালট করে ওই অবস্থায় কক্ষটি সিলগালা করে রাখা হলেও দ্বিতীয় দফায় ২৩ জুলাই সংশ্লিষ্টরা গিয়ে সাজিদের রুমটি পরিপাটি অবস্থায় দেখতে পান।

প্রশাসনের অগোচরে রুমে তৃতীয় কারো প্রবেশের ঘটনা ঘটেছে বলে সন্দেহ হলে ওই রুমের সিলগালাকৃত তালার চাবির খোঁজ করা হয়। এ সময় জানা যায়, লাশ উত্তোলনের পর সাজিদ আব্দুল্লাহর ব্যবহৃত রুমটি তাৎক্ষণিকভাবে তালাবদ্ধ করে সিলগালা করার জন্য যে তালাটি রুমে লাগানো হয়েছিল সেই তালাটি হল মসজিদের। ওই তালার তিনটি চাবি, যার একটি চাবি হলের একজন কর্মচারীর কাছে, একটি হল মসজিদের ইমামের কাছে এবং অপর চাবিটি সাদ্দাম হোসেন হলে অবস্থানরত একজন ছাত্রের কাছে রয়েছে বলে উঠে এসেছে ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির রিপোর্টে।

এ ঘটনার পর সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল হত্যাকাণ্ডের সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ। এক বছর পরও সেদিনের বিকাল ৫টা থেকে রাত ১১টার কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যে ফুটেজ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কোথাও বলা হয়েছে ফুটেজ নেই, কোথাও প্রযুক্তিগত সমস্যার কথা বলা হয়েছে, আবার কোথাও আংশিক তথ্য পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এমনকি তৎকালীন প্রশাসন সিসিটিভি প্রসঙ্গে আইসিটি সেলকে ব্যাখ্যা দিতে বললেও শেষ পর্যন্ত সেই সিসিটিভি রহস্যেরও কোনো স্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা সামনে আসেনি।

তবে এসব বিষয়ে সাজিদের বাবা আহসান হাবিবুল্লাহ দেলওয়ার বলেন, এক বছর হতে চলেছে আমার ছেলে হত্যার বিচার এখনো হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন-পুলিশ প্রশাসন কেউ কিছুই এখনো জানাতে পারেনি। আমি নিজেই মাঝে মধ্যে ফোন দিই কিন্তু তারা কোনো খোঁজ নেয় না। মাঝে মধ্যে শুধু ছাত্র সংগঠনের কেউ কেউ খোঁজ নেয়। আমাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ছিল, সেটাও দেওয়া হয়নি।

তদন্তের অগ্রগতি জানতে চাইলে মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সিআইডি ইন্সপেক্টর মহব্বত হোসেন আমার দেশকে বলেন, আমি এই মামলার দায়িত্ব পেয়েছি এক মাস আগে। মামলার তদন্ত চলমান। তদন্ত চলাকালীন কোনো তথ্য জানানো সম্ভব না। তবে আমরা সাক্ষ্য নিচ্ছি, জিজ্ঞাসাবাদ করছি, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট বিশ্লেষণ করছি।

তিনি বলেন, কতদিন সময় লাগতে পারে সেটি নিশ্চিত বলা যায় না। তবে কোনো ধরনের ক্লু পেলে আমরা দ্রুত সমাধান করতে পারব।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন