সুন্দরবনের দুয়ার খুললেও ঘুস বাণিজ্যের কারণে জীবিকা অর্জনে যেতে পারছেন না বনজীবীরা। টানা তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে গত ১ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনের দুয়ার খুলেছে। নদী-খালে মাছ ও কাঁকড়া ধরে জীবিকা ফেরানোর আশায় নৌকা-জাল নিয়ে প্রস্তুত উপকূলের বনজীবীরা। কিন্তু বনে ফেরার আগেই তাদের সামনে এসেছে বাড়তি অর্থের চাপ। বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট (বিএলসি) নবায়নের নামে সরকারি ফির তুলনায় ২০ থেকে ৩০ গুণ বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের বন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। এতে ঘুসবাণিজ্য শুরু হওয়ায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন বনজীবীরা। ঘুস দিতে না পারায় তারা জীবিকার্জনে সুন্দরবনে প্রবেশ করতে পারছেন না ।
বন বিভাগের হিসাবে, বিএলসি নবায়নে ভ্যাটসহ সরকারি রাজস্ব আদায়ের কথা বলে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৮১০ টাকা দাবি করা হচ্ছে। অথচ জেলে-বাওয়ালিদের অভিযোগ, নৌকাপ্রতি ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়েছে। ন্যূনতম ৮০০ টাকা হিসাব করলেও ২ হাজার ৯৩৮টি বিএলসি থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। সরকারি রাজস্বের তুলনায় এ অর্থ প্রায় ১০ গুণ বেশি।
বনজীবীদের অভিযোগ, সরাসরি বন কর্মকর্তারা নয়, বিভিন্ন স্টেশনে সক্রিয় একটি চিহ্নিত দালালচক্রের মাধ্যমে এসব টাকা আদায় করা হয়েছে। নির্ধারিত ফি দিতে চাইলেও অতিরিক্ত টাকা ছাড়া বিএলসি নবায়ন করা হয়নি। কোথাও কোথাও বন মামলায় জড়ানোর ভয় দেখানো হয়েছে। ফলে সুন্দরবনে যাওয়ার অনুমতি পেতে অনেকে মহাজনের কাছ থেকে সুদে টাকা নিয়ে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করেছেন।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর সাতক্ষীরা রেঞ্জে মোট ২,৯৩৮টি বিএলসি নবায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন থেকে ১,০১৬টি, কদমতলা স্টেশন থেকে ৬৫১টি, কৈখালী স্টেশন থেকে ৪০৩টি এবং কোবাদক স্টেশন থেকে ৮৬৮টি বিএলসি নবায়ন হয়েছে। নবায়ন করা বিএলসির মধ্যে মাছের ১,১৪৯টি, কাঁকড়ার ১,৭০০টি, গোলপাতার দুটি, প্রমোদ ট্রলারের ৭৪টি, লবণ পানির একটি এবং মধুর ১২টি বিএলসি রয়েছে।
সুন্দরবনের মাছ ও কাঁকড়া আহরণের অধিকাংশ নৌকার ধারণক্ষমতা সাধারণত ৭৫ মণ। এ হিসাবে নৌকাপ্রতি সরকারি রাজস্ব ৩০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে হওয়ার কথা। সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, ২,৯৩৮টি নৌকার বিএলসি নবায়ন থেকে ভ্যাটসহ সরকারি রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ২ লাখ ৩৩ হাজার ৮১০ টাকা। অন্যদিকে বনজীবীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নৌকাপ্রতি সর্বনিম্ন ৮০০ টাকা করে নেওয়া হয়ে থাকলে মোট আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৩ লাখ ৫০ হাজার ৪০০ টাকা। অর্থাৎ সরকারি রাজস্বের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগের পরিমাণ প্রায় ২১ লাখ ১৬ হাজার ৫৯০ টাকা।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা এরফান উদ্দিন, কদমতলা ও কৈখালী স্টেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শ্যামাপ্রসাদ রায় এবং কোবাদক স্টেশন কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাদের দাবি, শুধু বিএলসি নবায়নের নির্ধারিত ফি ৩৪ টাকা ৫০ পয়সা দিলেই সব ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া শেষ হয় না। মাছ ও কাঁকড়ার পরিমাণ বা ওজন অনুযায়ী সরকারি আরো কিছু ফি নির্ধারিত হয়। ফলে ৩৪ টাকা ৫০ পয়সাকে সব ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সরকারি ফি হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়। বিএলসি নবায়নে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ে দালালচক্র ব্যবহারের অভিযোগও অস্বীকার করেন এই তিন কর্মকর্তা।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা এজেডএম হাসানুর রহমান বলেন, বিএলসি নবায়নের ক্ষেত্রে বিধিতে যা আছে, তা অনুযায়ী অর্থ নেওয়ার জন্য প্রতিটি ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কারো বিরুদ্ধে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের নির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বিএলসি নবায়নে এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে তিনি কিংবা ঊর্ধ্বতন বন কর্মকর্তারা জড়িত নন বলে দাবি করেন তিনি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

