রাজবাড়ী জেলায় লাম্পি স্কিন রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্ত হয়ে পড়ছে শত শত গরু। প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে অনেক গরু মারা যাচ্ছে । এ রোগের বিস্তার ঘটায় খামারমালিক ও সাধারণ গরু পালনকারীরা দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। অনেক অসচ্ছল নারী-পুরুষ নিজের জীবনে ভাগ্য ফেরাতে গরু পালন করেন। কিন্তু সর্বনাশা লাম্পি স্কিন রোগের ভাইরাস খামারির সেই মুখের হাসি কেড়ে নিয়েছে। আক্রান্ত গরুর চিকিৎসা খরচ জোগাতে এবং পশুর মৃত্যুতে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন হাজারো প্রান্তিক গরু পালনকারী। অথচ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কাছে এই ক্ষয়ক্ষতির সঠিক কোনো হিসাব নেই। জনবল সংকটের অজুহাতে মাঠপর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম ঝিমিয়ে থাকায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে আক্রান্ত গরুর সংখ্যা।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলার পাঁচটি উপজেলায় মোট গরুর খামার রয়েছে ১৬ হাজার ১২১টি। এর মধ্যে নিবন্ধিত গাভির খামারের সংখ্যা ৩৬৬ এবং অনিবন্ধিত গাভির খামারের সংখ্যা ৮ হাজার ৬০৯। নিবন্ধিত গরু হৃষ্টপুষ্টকরণ খামার রয়েছে ৩৪টি । আর অনিবন্ধিত খামার রয়েছে ৭ হাজার ১৪৩টি। জেলায় মোট গরু রয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ৯২টি। গত অর্থবছরে ৬ হাজার ৫০০ ডোজ এলএসডি টিকা সরকারিভাবে সরবরাহ করা হয়েছে। অথচ জেলায় টিকার চাহিদা রয়েছে প্রায় দেড় লাখ ডোজ।
কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১৯ সালের দিকে বাংলাদেশে এই রোগ প্রথম দেখা যায়। শরুর দিকে বড় খামারগুলোতে আক্রান্তের হার বেশি ছিল। প্রতিষেধক ব্যবহারের মাধ্যমে আক্রান্তের হার কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। প্রান্ত্রিক পর্যায়ে কৃষি পরিবার ছাড়াও অনেক বাড়িতে গরু পালন করা হয়। তবে তারা খামারিদের মতো এত সচেতন নয়। সরকারিভাবে এই রোগের টিকা রয়েছে তা এক অ্যাম্পুলে পাঁচটি গরুকে দেওয়া যায়। কিন্তু বিভিন্ন কোম্পানির যে টিকা রয়েছে, তাতে এক অ্যাম্পুলে ১০ গরুকে দিতে হয়। কোম্পানির এক অ্যাম্পুলের দাম দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। এ কারণে অনেক গরু পালনকারীই এই টিকা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করে না। কর্মকর্তাদের দাবি একটু সচেতন হলেই ভাইরাসজনিত এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। রাজবাড়ী সদর উপজেলার দাদসী ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামের বিধবা আসমা খাতুন জানান, নিজের সংসারে একটু আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে বেছে নিয়েছি গরু পালনের উদ্যোগ। অনেকটা সফলও হয়েছি। একটি গাভি, ষাঁড় ও একটি বাছুর নিয়ে তার যাত্রা শুরু হয়। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তার বাছুরটি ল্যাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত হয়। রাজবাড়ী উপজেলা পশু হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার পরও বাছুরটি বাঁচানো যায়নি। এতে তার ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৭০ হাজার টাকা।
পাংশা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বলেন, ভাইরাস রোগ সাধারণত তার রূপ পরিবর্তন করে থাকে। লাম্পি স্কিনও এখন দুই ধরনের দেখা যায়। একটি রয়েছে গরুর শরীরে ছোট গুটি আকারে ফুটে ওঠে। এটি ফেটে বের হয় না। এটা বিপজ্জনক। আরেকটা আছে সেটি বড় আকারের গুটি হয় এবং ফেটে ঘা হয়। এটি দ্রুত ভালো হয়। এই রোগে আক্রান্ত গরুর শরীরে তাপমাত্রা বেড়ে যায়। গরুর খাওয়া কমে যায়। গরুর দুধ ও মাংস উৎপাদন কমে যায়।
রাজবাড়ী সদর উপজেলা লাইভস্টক অফিসার খায়ের উদ্দিন আহমেদ জানান, ছয় মাসে সদর উপজেলায় এ রোগে মারা গেছে ২০টি গরু। এ মৃত্যুহার স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। তিনি বলেন, বড় গরুর তুলনায় বাছুর বেশি আক্রান্ত হয়।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, লাম্পি স্কিন একটি ভাইরাসজনিত রোগ। সারা দেশেই এটি ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণত মশা, মাছি ও আঁঠালির মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায়। বর্ষার শুরুতে এই রোগের প্রকোপ বাড়ে। এই রোগে আক্রান্ত গরুর তেমন কোনো চিকিৎসা নেই। সুস্থ গরুকে ভ্যাকসিনেশনের মাধ্যমে এর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। প্রাণিসম্পদ দপ্তরের উদ্যোগে খামার পরিদর্শন ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে খামারি ও প্রান্তিকপর্যায়ে কৃষকদের টিকা ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে আমাদের জনবল সংকট রয়েছে। মানুষকে সচেতন করার জন্য যে পরিমাণ উঠান বৈঠক করা প্রয়োজন আমরা তা করতে পারছি না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

