প্রথম বিসিএসেই ক্যাডার, চবির ইমতিয়াজ

এক দিন বেশি পড়ার চেয়ে নিয়মিত পড়া গুরুত্বপূর্ণ

এক দিন বেশি পড়ার চেয়ে নিয়মিত পড়া গুরুত্বপূর্ণ
ইমতিয়াজ আহমেদ জুলিয়ান

‘প্রথমে কিছু সংখ্যা, তারপর আরো কিছু সংখ্যা—এভাবে রোল নম্বর দেখতে দেখতে হঠাৎ দেখি আমার পুরো রোল নম্বরটি রয়েছে। সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি বুঝতে পেরে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে ছিলাম। এরপর রুমমেট ও বন্ধুদের জানাই। তারপর বাসায় ফোন করে আব্বু-আম্মুকেও সুখবরটি দিই।’

৪৭তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর ফল জানার সেই মুহূর্তের অনুভূতি এভাবেই প্রকাশ করছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ আহমেদ জুলিয়ান। ইমতিয়াজের দেশের বাড়ি বগুড়ায়। তার বাবা অবসরপ্রাপ্ত একজন সরকারি কর্মকর্তা। মা গৃহিণী। তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট ইমতিয়াজ। বড় দুই ভাইয়ের মধ্যে একজন নন-ক্যাডার। অন্যজন বিচারক।

বিজ্ঞাপন

ইমতিয়াজ ২০১৭ সালে বগুড়ার মুলতানি পারভীন শাহজাহান তালুকদার বিদ্যালয় এসএসসি ও ২০১৯ সালে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন পাবলিক স্কুল ও কলেজ থেকে জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। পরে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। অ্যাপিয়ার্ড অবস্থাতেই ৪৭তম বিসিএসে অংশ নিয়ে ক্যাডার হয়েছেন তিনি।

অনার্স পরীক্ষা শেষে বিসিএস জার্নি

অনার্স ফাইনাল ইয়ারে ওঠার পর থেকে মূলত বিসিএস সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে শুরু করেন ইমতিয়াজ। ভবিষ্যতে বাবা-মায়ের সঙ্গে দেশে থাকার ইচ্ছাতেই বিসিএসই ছিল তার প্রথম পছন্দ। এছাড়া পরিবারের কয়েকজন সদস্য সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় তার সিদ্ধান্ত নিতেও সহজ হয়। এরপর অনার্স ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থেকেই পূর্ণোদ্যমে বিসিএসের প্রস্তুতি শুরু করেন তিনি।

ইমতিয়াজ আমার দেশকে বলেন, ‘আমি কখনোই গৎবাঁধা রুটিন মেনে পড়াশোনা করিনি। যখন মনে হয়েছে পড়া দরকার, তখনই পড়েছি। আমি রাত জেগে পড়তে ভালোবাসতাম। অনেক সময় রাত ৩টা-৪টা পর্যন্ত পড়েছি। তবে সবসময় ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছি। আমার মতে, এক দিন বেশি পড়ার চেয়ে প্রতিদিন নিয়মিত পড়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সারাদিন টেবিলে বসে থাকলেই হবে না, পড়াশোনার মানও ভালো হতে হবে।’

তিনি জানান, গড়ে প্রতিদিন ছয় থেকে আট ঘণ্টা পড়াশোনা করতেন। প্রয়োজন হলে এর চেয়েও বেশি সময় দিতেন। পরীক্ষা ঘনিয়ে এলে বা পড়ার আগ্রহ বেশি থাকলে ১২ ঘণ্টা পর্যন্তও পড়েছেন। আবার যখন মনে হয়েছে বিশ্রাম প্রয়োজন, তখন বিশ্রাম নিয়েছেন। সাধারণত দুপুর থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত সময়ের মধ্যেই তার পড়াশোনা চলত।

পাশে ছিল পরিবার

৪৭তম বিসিএসের প্রিলিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর লিখিত পরীক্ষার জন্য হাতে সময় পেয়েছিলেন মাত্র দুই মাস। ইংরেজি বিষয়ে তুলনামূলক ভালো করলেও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি ও গণিতে পরীক্ষা প্রত্যাশামতো হয়নি বলে মনে করেন ইমতিয়াজ। একই সময়ে তার মাস্টার্সের পরীক্ষাও চলছিল। এমনকি মাস্টার্স ও বিসিএস লিখিত পরীক্ষার রুটিন একই দিনে পড়ায় তিনি একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নেন—মাস্টার্সের দুটি কোর্সের পরীক্ষা না দিয়ে বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন।

এরপর কয়েক মাস কেটে যায়। এ সময়ে তিনি ৫০তম বিসিএসের প্রিলিতেও অংশ নেন, তবে সেখানে সফল হতে পারেননি। প্রিলিতে ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তখনো ৪৭তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়নি। হতাশ হয়ে তিনি গ্রামের বাড়িতে ফিরে যান এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান।

ইমতিয়াজ বলেন, ‘আমি ৫০তম বিসিএসের প্রিলিতে পাস করতে পারিনি। তখন পুরোপুরি হতাশ হয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যাই এবং পরিবারের সঙ্গে কিছুদিন সময় কাটাই। আমার আব্বু-আম্মু সবসময় আমাকে সাহস দিয়েছেন। ফল যাই হোক, তারা কখনো আমাকে দোষারোপ করেননি। বরং সবসময় বলতেন—তুমি পারবে। তাদের আমার ওপর অগাধ বিশ্বাস ছিল।’

তিনি জানান, সেই বিশ্বাসই তাকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে। কিছুদিন পর ৪৭তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। তিনি পাস করেছেন। এরপর তিনি নতুন উদ্যমে আবার পড়াশোনায় মনোযোগ দেন। পাশাপাশি সিনিয়র অফিসার এবং অফিসার (জেনারেল) পদের দুটি নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেন। দুটিতেই প্রিলিমিনারি উত্তীর্ণ হয়ে লিখিত পরীক্ষাও দিয়েছেন তিনি। বর্তমানে সেগুলোর ফল প্রকাশের অপেক্ষায় আছেন।

ঢাবির মতো কালচার তৈরির স্বপ্ন

ইমতিয়াজের বড় দুই ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। তাদের মধ্যে একজন নন-ক্যাডার কর্মকর্তা এবং অন্যজন বিচারক হিসেবে কর্মরত আছেন। ছোটবেলা থেকেই বড় দুই ভাইকে নিজের আইডল হিসেবে দেখতেন ইমতিয়াজ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর বিসিএস জার্নির সংস্কৃতি তাকে বিশেষভাবে নাড়া দিত। সেখানে একটি হল থেকেই একাধিক ক্যাডার তৈরি হওয়ার ঘটনা তাকে অনুপ্রাণিত করত। তিনি সবসময় ভাবতেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোয়ও যদি এমন পরিবেশ তৈরি হতো, তাহলে জুনিয়র শিক্ষার্থীরাও আরো বেশি অনুপ্রাণিত হতো।

ইমতিয়াজ বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকা শিক্ষার্থীদের বিসিএস ক্যাডার হওয়ার ধারা দেখে জুনিয়ররা উৎসাহ পায়। কিন্তু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তেমন সুসংগঠিত সংস্কৃতি এখনো গড়ে ওঠেনি। তিনি চেয়েছিলেন চবিতেও এমন একটি অনুপ্রেরণামূলক পরিবেশ তৈরি হোক।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বৈধ বরাদ্দের মাধ্যমে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকার সুযোগ পান। এর আগে তিনি মেসে থাকতেন। তবে তার মতে, মেসের তুলনায় হলের পরিবেশ পড়াশোনার জন্য অনেক বেশি উপযোগী। বিশ্ববিদ্যালয়ের রিডিং রুম, মসজিদ, ডাইনিংসহ সামগ্রিক পরিবেশ—সবকিছু এক ছাদের নিচে। ফলে তার প্রস্তুতিকে আরো সহায়তা করেছে।

তিনি আরো জানান, রুমমেট, বন্ধু এবং ব্লকের বড় ভাইদের কাছ থেকেও তিনি সবসময় অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। পাশাপাশি একই হলের অনেক সিনিয়র বিসিএস ক্যাডার হওয়ায় তাদের অভিজ্ঞতা তাকে আরো উৎসাহিত করেছে। তার নিজের বিভাগ থেকেও একাধিক বড় ভাই ইতোমধ্যে বিসিএস ক্যাডার হয়েছেন, যা তার স্বপ্নপূরণের পথে শক্তি জুগিয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন