ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমেরিকান সংবিধান দিবস উদযাপন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমেরিকান সংবিধান দিবস উদযাপন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ ও ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের যৌথ উদ্যোগে ‘ইউএস কনস্টিটিউশন ডে’ উদযাপন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সাংবিধানিক অভিজ্ঞতা, ক্ষমতার পৃথকীকরণ, আইনের শাসন, মৌলিক অধিকার ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা করেন বক্তারা।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিসটেনসন। বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকরামুল হক।

বিজ্ঞাপন

প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাংবিধানিক কাঠামো ও আইনি ব্যবস্থায় এর বিভিন্ন নীতি ও ধারণার প্রভাব পড়েছে।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের সঙ্গে বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তুলনামূলক আলোচনা করা যেতে পারে। বিশেষ করে বিচারিক পর্যালোচনা, ক্ষমতার পৃথকীকরণ, মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলো সাংবিধানিক অধ্যয়নের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

আইনমন্ত্রী আরও বলেন, সংবিধান ও সাংবিধানিক অধিকার সম্পর্কে জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধিতে এ ধরনের একাডেমিক আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আইন, গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক চর্চা নিয়ে পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান আধুনিক সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ক্ষমতার পৃথকীকরণ, ক্ষমতার ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণ, আইনের শাসন এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার মতো নীতিগুলো এই সংবিধানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এসব নীতি বিশ্বব্যাপী সাংবিধানিক চিন্তা ও চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশেরও দীর্ঘ সাংবিধানিক অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্য রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধান গণতন্ত্র, মানবাধিকার, মৌলিক অধিকার, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। বাংলাদেশের নিজস্ব ইতিহাস, মুক্তিসংগ্রাম ও জনগণের আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়ে এ সাংবিধানিক কাঠামো গড়ে উঠেছে। ফলে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক অভিজ্ঞতার মধ্যে সংলাপ ও তুলনামূলক আলোচনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম আরও বলেন, সংবিধান কেবল একটি বিমূর্ত একাডেমিক বিষয় নয়; এটি একটি জীবন্ত প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা। আইন বিভাগের শিক্ষার্থীদের সাংবিধানিক ধারণাগুলো সরাসরি অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার মাধ্যমে উপলব্ধি করার সুযোগ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে দুই দেশের সাংবিধানিক অভিজ্ঞতা নিয়ে আরও অর্থবহ আলোচনা অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

গেস্ট অব অনারের বক্তব্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিসটেনসন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের সূচনা হয়েছে ‘We the People’ - এই সরল অথচ তাৎপর্যপূর্ণ বাক্য দিয়ে। ১৭৮৭ সালের গ্রীষ্মে ফিলাডেলফিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নের জন্য প্রতিনিধিরা সমবেত হয়েছিলেন। বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য ও বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও তারা এমন একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে ক্ষমতার পৃথকীকরণ ও পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যাতে সম্পূর্ণ ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা হয়।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর ১৭ সেপ্টেম্বর কনস্টিটিউশন ডে পালিত হয়। দিনটি দেশটির সাংবিধানিক ঐতিহ্য ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে ভাবনার সুযোগ তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান বিভিন্ন সময়ে সংশোধিত হয়েছে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রেখেছে।

মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, সাংবিধানিক শাসন, আইনের শাসন ও জনগণের অংশগ্রহণ কোনো একটি দেশের জন্য নির্দিষ্ট বিষয় নয়। নিজস্ব রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনায় আগ্রহী সব সমাজের জন্যই এসব গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন ও সাংবিধানিক চর্চার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশও একটি নতুন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। ক্ষমতার পৃথকীকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলো বাংলাদেশেও গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

উদ্বোধনী পর্ব শেষে ‘ইউএস কনস্টিটিউশন’ বিষয়ক একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক ব্যবস্থা, ক্ষমতার পৃথকীকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সাংবিধানিক অধিকার এবং দুই দেশের সাংবিধানিক অভিজ্ঞতার তুলনামূলক বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়। আলোচনায় শিক্ষক, আইনজীবী, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের শিক্ষক, আইনজীবী, গবেষক, শিক্ষার্থী, আইন ও বিচার অঙ্গনের প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...