বাটেক্সপোতে ঐকমত্যের ঐতিহ্য চান গোলাম পরওয়ার

বাটেক্সপোতে ঐকমত্যের ঐতিহ্য চান গোলাম পরওয়ার
মিয়া গোলাম পরওয়ার

বাটেক্সপোতে জাতীয় ঐকমত্যের ঐতিহ্য ধরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।

বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, দীর্ঘ ১২ বছর পর বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) আয়োজিত বাটেক্সপো ফিরে আসছে। আজ এক সংবাদ সম্মেলনে বিজিএমইএ বাটেক্সপো ২০২৬-এর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। আগামী ১৮ ও ১৯ নভেম্বর ঢাকায় বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

গোলাম পরওয়ার বলেন, বাটেক্সপোর এই প্রত্যাবর্তনকে আমরা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করি। ১৯৮৯ সালে বিদেশি ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা এবং বাংলাদেশের পোশাক রফতানি সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে যে আয়োজনের যাত্রা শুরু হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তা দেশের প্রধান রফতানি শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। তবে আজকের ঘোষণায় বাটেক্সপোর উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের যে পরিবর্তন এসেছে, সে বিষয়ে আমরা আমাদের উদ্বেগের কথাও জানাতে চাই।

তিনি আরও বলেন, বাটেক্সপো বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য। দীর্ঘ এক যুগ পর এই আয়োজনের প্রত্যাবর্তন নিঃসন্দেহে দেশের পোশাক শিল্প, উদ্যোক্তা, শ্রমিক এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। অতীতে বাটেক্সপোর উদ্বোধন ও সমাপনী অনুষ্ঠানে দেশের সরকার ও বিরোধী দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অংশগ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বার্তা বহন করত—বাংলাদেশের প্রধান রফতানি শিল্পের প্রশ্নে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

গোলাম পরওয়ার বলেন, এবারের আয়োজনে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং সমাপনী অনুষ্ঠানে মাননীয় রাষ্ট্রপতিকে আমন্ত্রণ জানানোর সিদ্ধান্ত বিজিএমইএ নিয়েছে। এ সিদ্ধান্ত সংগঠনটির নিজস্ব বিবেচনার বিষয়। তবে আমরা মনে করি, বাটেক্সপোর মতো জাতীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি আয়োজনে দীর্ঘদিনের অন্তর্ভুক্তিমূলক ঐতিহ্যকে অব্যাহত রাখা হলে তা দেশের রাজনৈতিক ঐকমত্য, গণতান্ত্রিক সৌহার্দ্য এবং শিল্পের প্রতি সম্মিলিত অঙ্গীকারের আরও শক্তিশালী বার্তা দিত। বিশেষ করে, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় এই বিষয়টির গুরুত্ব আরও বেশি। আজকের বিশ্বে একটি দেশ শুধু তার পণ্য রফতানি করে না; প্রতিটি রফতানি পণ্যের সঙ্গে সেই দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, সক্ষমতা এবং সামগ্রিক ভাবমর্যাদার একটি বার্তাও বিশ্বের কাছে পৌঁছে যায়। একটি পোশাক যেমন বাংলাদেশের কারখানা থেকে একজন বিদেশি ক্রেতার হাতে পৌঁছায়, তেমনি তার সঙ্গে বাংলাদেশের পরিচয় ও দেশের মর্যাদাও আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর বিশ্বে কোনো দেশের ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক বার্তা মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। আর সেই বার্তা সরাসরি একটি দেশের পণ্য, ব্র্যান্ড, ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই বাটেক্সপোর মতো আন্তর্জাতিক পরিসরের একটি আয়োজনকে আমরা শুধু ক্রেতা-বিক্রেতার মিলনমেলা হিসেবে দেখি না। এটি একই সঙ্গে বাংলাদেশকে বিশ্বে উপস্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা মনে করি, বাটেক্সপোর মতো একটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আয়োজনের রাজনৈতিক অতিথি নির্বাচন এবং সামগ্রিক উপস্থাপনায় আরও বিস্তৃত জাতীয় ভাবনা ও পেশাদার কৌশল প্রয়োজন ছিল। দেশের রাজনৈতিক বিভাজনের কোনো অনিচ্ছাকৃত বার্তা যেন বিদেশি ক্রেতা, বিনিয়োগকারী বা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে না যায়—এ বিষয়টিও একটি জাতীয় শিল্প সংগঠনের বিবেচনায় থাকা প্রয়োজন।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আমরা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ছোট করা কিংবা কোনো সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত করার উদ্দেশ্যে এ বক্তব্য দিচ্ছি না। বরং বিজিএমইএকে একটি অরাজনৈতিক ও জাতীয় শিল্প সংগঠন হিসেবে আরও দূরদর্শী, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং পেশাদার ভূমিকা পালনের আহ্বান জানাচ্ছি। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প কোনো একটি রাজনৈতিক দল, সরকার বা সংগঠনের সম্পদ নয়। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত লাখ লাখ শ্রমিক, হাজার হাজার উদ্যোক্তা, অসংখ্য স্থানীয় ব্যবসা এবং বিশ্বব্যাপী ক্রেতা ও অংশীদার। তাই শিল্পের জাতীয় আয়োজনগুলোতে এমন একটি পরিবেশ থাকা প্রয়োজন, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের পরিবর্তে সহযোগিতা, ঐকমত্য ও বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমর্যাদা বার্তাই প্রধান হয়ে ওঠে।

আমরা আশা করি, ভবিষ্যতে বিজিএমইএ তার দায়িত্ব ও পেশাদারিত্বের জায়গা থেকে আরও যোগ্যতা, দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দেবে এবং জাতীয় শিল্পের প্রতিটি আন্তর্জাতিক আয়োজনে বাংলাদেশের ঐক্য, স্থিতিশীলতা, সক্ষমতা, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ইতিবাচক বার্তা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরবে।

বাটেক্সপো শুধু একটি প্রদর্শনী নয়—এটি বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশকে বিশ্বে উপস্থাপনের একটি সুযোগ। আমরা চাই, বাটেক্সপো হোক রাজনৈতিক বিভাজনের নয়; বাংলাদেশের পোশাক শিল্প, জাতীয় ঐকমত্য এবং বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমর্যাদার প্রতীক। দেশের স্বার্থে, শিল্পের স্বার্থে এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক অবস্থানের স্বার্থে—বিজিএমইএ’র কাছে আমরা আরও পেশাদারিত্ব, যোগ্যতা ও দূরদর্শিতার প্রত্যাশা করি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন