স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে ৯ ঘণ্টা ধরে তালাবদ্ধ অধ্যক্ষ, পদত্যাগ দাবি

স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে ৯ ঘণ্টা ধরে তালাবদ্ধ অধ্যক্ষ, পদত্যাগ দাবি

অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, আবাসিক হলের আসন বাতিলের হুমকি এবং অডিটোরিয়ামের বিদ্যুৎ বিল বাবদ ১২ হাজার ৬০০ টাকা জরিমানা দাবির অভিযোগে রাজধানীর গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লাইড হিউম্যান সায়েন্সের (সাবেক হোম ইকোনমিকস কলেজ) অধ্যক্ষ অধ্যাপক মেহেরুন্নেছার পদত্যাগ দাবি করেছেন শিক্ষার্থীরা।

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে তাকে নিজ কার্যালয়ে তালাবদ্ধ রেখে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন তারা। দিনভর বিক্ষোভের একপর্যায়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত প্রায় ৯ ঘণ্টা ধরে অধ্যক্ষ নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার সকালে কলেজের প্রশাসনিক ভবনে অধ্যক্ষের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় ‘দফা এক দাবি এক, প্রিন্সিপালের পদত্যাগ’ এবং ‘প্রিন্সিপালের কালো হাত, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন তাঁরা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে অধ্যক্ষের বিভিন্ন অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে তারা ক্ষুব্ধ। সম্প্রতি দুই আবাসিক শিক্ষার্থীর হলের আসন বাতিলের সিদ্ধান্ত এবং অডিটোরিয়ামের বিদ্যুৎ বিলের নামে জরিমানা দাবির ঘটনায় সেই ক্ষোভ আরও তীব্র হয়।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও কলেজ প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, পূজার ছুটির আগে কলেজ অডিটোরিয়ামে তিনটি আবাসিক হলের পাঁচ বিভাগের মাস্টার্স শেষ বর্ষের (২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ) শিক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানটি প্রথমে রাত ১০টার মধ্যে শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। পরে শিক্ষার্থীদের অনুরোধে সময় বাড়িয়ে রাত ১২টা পর্যন্ত করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠান শেষ হতে ভোর ৪টা থেকে ৫টা বেজে যায়।

নির্ধারিত সময়ের পরও অডিটোরিয়াম ব্যবহার করায় অনুষ্ঠানের সমন্বয়কারী দুই শিক্ষার্থীর আবাসিক হলের আসন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন অধ্যক্ষ অধ্যাপক মেহেরুন্নেছা। পরে ওই দুই শিক্ষার্থী ক্ষমা চাইতে গেলে আসন ফিরিয়ে দেওয়ার শর্ত হিসেবে এক রাতের অডিটোরিয়ামের এসি ও বিদ্যুৎ বিল বাবদ ১২ হাজার ৬০০ টাকা জরিমানা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।

কলেজের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের মাস্টার্স প্রথম পর্বের শিক্ষার্থী তাবাসসুম বলেন, ‘দুইটা স্টুডেন্টের সিট অযৌক্তিকভাবে বাতিল করার কারণেই এই আন্দোলনটা। আমরা ম্যাডামের কাছে হাত-পা জোড় করে ক্ষমা চাইলে ম্যাডাম বলেন, আমাদের সরি অ্যাকসেপ্ট করেছেন এবং শাস্তিস্বরূপ এক রাতের অডিটোরিয়ামের বিল বাবদ ১২ হাজার ৬০০ টাকা চাঁদা দিতে হবে। আমাদের স্টুডেন্টদের পক্ষে এই টাকা দেওয়া সম্ভব না।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটা মওকুফ করা যায় কি না বলতে গেলে আমাদের একজন স্টুডেন্ট ম্যাডামের পা ধরেছে। কিন্তু ম্যাডাম ওই স্টুডেন্টকে পা দিয়ে ধাক্কা দিয়ে চলে গিয়েছেন। বলতে গেলে একেবারে লাথি মারা ও ধাক্কা পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে।’

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বৃহস্পতিবার সকালে এসব বিষয় নিয়ে অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি তাদের বক্তব্য না শুনে ধমক দেন। এর পরপরই সকাল সাড়ে ১০টার দিকে অধ্যক্ষের কার্যালয়ের দরজায় তালা দিয়ে অবস্থান নেন ছাত্রীরা। তারা অধ্যক্ষের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

আন্দোলনকারীরা আরও অভিযোগ করেন, প্রায় এক বছর আগে বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ থেকে বর্তমান কলেজে যোগ দেওয়ার পর থেকেই অধ্যক্ষ একের পর এক অযৌক্তিক নিয়ম চাপিয়ে দিচ্ছেন। এর আগে বদরুন্নেসা কলেজে দায়িত্ব পালনকালে তিনি দুই হলের ফ্রিজ ও বিদ্যুতের সুইচ বন্ধ করে দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ তাঁদের।

এ ছাড়া বর্তমান কলেজের আবাসিক হলগুলোতে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকা সত্ত্বেও মাসিক ফি ৬০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হয়েছে বলে জানান শিক্ষার্থীরা। আগামী বছর আরও ১০০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে বলে তাদের দাবি। অধ্যক্ষ তার সরকারি বাংলোতে নিয়মবহির্ভূতভাবে বহিরাগতদের সাবলেট দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন আন্দোলনকারীরা।

অধ্যক্ষকে কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করার বিষয়ে কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক হাবিবা ইয়াছমিন বলেন, ‘আজ সকালে আমি ও আমাদের শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক আপার (অধ্যক্ষের) রুমে বসে ছিলাম। হঠাৎ অনেকগুলো মেয়ে কথা বলার নাম করে ভেতরে ঢুকে আমাকে ও সম্পাদককে বাইরে ডেকে আনে। আমার সিক্সথ সেন্স কাজ করছিল যে কিছু একটা হতে পারে, তাই আমি অধ্যক্ষের অফিস সহায়ক নাসিমাকে ভেতরে থাকতে বলি। যেই আমাকে টান দিয়ে বাইরে এনেছে, সঙ্গে সঙ্গে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আপার দরজাটা বন্ধ করে তালা দিয়ে তারা স্লোগান শুরু করে দেয়।’

জরিমানা ও আসন বাতিলের বিষয়ে উপাধ্যক্ষ বলেন, কলেজ ক্যাম্পাসে বর্তমানে নির্মাণকাজ চলায় সেখানে অনেক বহিরাগত শ্রমিক কাজ করছেন। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে রাত ১২টার মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করতে বলা হয়েছিল। ভবিষ্যতে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কেবল ভয় দেখাতেই প্রাথমিকভাবে দুই ছাত্রীর আসন বাতিলের কথা বলা হয়েছিল। তবে পূজার ছুটির পর গত রোববার সিদ্ধান্ত হয়, ফাইনাল ইয়ারের ওই দুই শিক্ষার্থীর আসন বাতিল করা হবে না।

তিনি আরও বলেন, ভোর ৫টা পর্যন্ত অডিটোরিয়ামে এসি ও ফ্যান চলায় ১২ হাজার ৬০০ টাকার বিদ্যুৎ বিল এসেছে। এ টাকা হোস্টেলের সব শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মাথাপিছু ৫০ থেকে ১০০ টাকা করে সংগ্রহ করে পরিশোধ করতে বলা হয়েছিল।

উপাধ্যক্ষ জানান, বিভাগীয় প্রধান ও শিক্ষকেরা কয়েক দফায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দিলেও তারা অধ্যক্ষের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে অনড় রয়েছেন। বিকেল ৫টার পর অধ্যক্ষকে আর ক্যাম্পাসে দেখতে চান না বলেও শিক্ষার্থীরা আলটিমেটাম দিয়েছেন।

তবে বিসিএস ক্যাডার সার্ভিসে নিয়োগ রাষ্ট্রপতির আদেশে হওয়ায় এভাবে সাদা কাগজে পদত্যাগ নেওয়া সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন উপাধ্যক্ষ। তিনি জানান, বিষয়টি ইতিমধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক ও শিক্ষা সচিবকে জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি শান্ত রাখতে কলেজ প্রশাসন সর্বোচ্চ সহনশীল ভূমিকা পালন করছে।

এ বিষয়ে অধ্যক্ষ অধ্যাপক মেহেরুন্নেছার বক্তব্য জানতে তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলার চেষ্টা করা হলে শিক্ষার্থীরা বাধা দেন এবং কার্যালয়ের তালা খুলতে অস্বীকৃতি জানান। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে অধ্যক্ষ বলেন, ‘ডিজি মহোদয় ও বিভিন্ন কলেজের প্রিন্সিপালরা আসায় আমি এখন ব্যস্ত আছি। পরে যোগাযোগ করেন।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...