নোয়াখালীতে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, আটক ৫ শতাধিক

নোয়াখালীতে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, আটক ৫ শতাধিক

নোয়াখালী জেলাজুড়ে কিশোর গ্যাং ও বখাটেদের দৌরাত্ম্য আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার পর সাঁড়াশি অভিযানে নেমেছে পুলিশ। জেলাজুড়ে পরিচালিত এই অভিযানে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০০ জনকে আটক করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

নিজেদের কোনো নির্দিষ্ট উপার্জন বা ক্রয়ক্ষমতা না থাকলেও এসব কিশোরের হাতে দেখা যায় দামি অ্যান্ড্রেয়েড স্মার্টফোন এবং যাতায়াতের জন্য ব্যবহার করছে বিভিন্ন রঙের মোটরসাইকেল। দল ও শাখা-দলে বিভক্ত এসব কিশোর মোটরসাইকেলের সাইলেন্সার পাইপের ‘চ্যালেঞ্জার পাইপ’ বা বাঁশি খুলে নিয়ে বিকট শব্দ তৈরি করে এবং নৃত্যের তালের মতো বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালায়। এর ফলে জেলায় প্রতিনিয়ত ঘটছে নির্মম সড়ক দুর্ঘটনা। বিষয়টি বর্তমানে জেলাজুড়ে এক মারাত্মক সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে।

বিশেষ করে বৃহত্তর নোয়াখালীর প্রধান বাণিজ্যিক নগরী চৌমুহনী বাজার ও চৌমুহনী পৌরসভা এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত চরম আকার ধারণ করেছে। চৌমুহনী পৌর পার্ক, বেগমগঞ্জ স্টেডিয়াম এলাকা, নোয়াখালী মেডিকেল কলেজ এলাকা, বিসিক শিল্প এলাকা, বেগমগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও এর আশপাশ, গনিপুর টক্কা পোল, চৌমুহনী রেলওয়ে স্টেশন এলাকা, চৌমুহনী কলেজ রোড, চৌমুহনী দক্ষিণ বাজার, গোলাবারিয়া, গোলাবাড়িয়া পার্ক, মিয়ার পোল, কিসমত করিমপুর, কন্ট্রাক্টর পোল, দক্ষিণ নাজিরপুর এবং উত্তর নাজিরপুর এলাকায় এদের তৎপরতা বেশি।

এমনকি নোয়াখালী জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে অবস্থিত নোয়াখালী পৌর পার্কেও এদের উৎপাত কম নয়। প্রতিদিন বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে রাত ৯টা-১০টা পর্যন্ত ব্যস্ততম শহরের মানুষ একটু মানসিক প্রশান্তির জন্য এই পার্কে আসেন। তবে দর্শনার্থীদের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর কিশোরদের বিভিন্ন গ্রুপ এখানে আড্ডায় বসে। তাদের শোরগোল, চিৎকার-চেঁচামেচি, গালাগালি ও অশালীন বাক্য বিনিময় পরিবেশকে বিষিয়ে তোলে, যা সাধারণ মানুষকে চরম অস্বস্তিতে ফেলে।

একইভাবে চৌমুহনী পৌর পার্ক ও বেগমগঞ্জ এগ্রিকালচার ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (এটিআই) এলাকায় বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের ভিড় জমে। গাছগাছালির ছায়া ও দিঘির বাতাসের জন্য মানুষ সেখানে গেলেও কিশোর ও বখাটেদের উৎপাতের কারণে পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়া এখন বড় ধরনের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এসব কিশোর গ্যাং গড়ে উঠেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নোয়াখালীতে ক্যাডার রাজনীতির মাধ্যমে এই গ্যাং সংস্কৃতির সূচনা হয়। গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতাকর্মী পলাতক থাকলেও বর্তমানে এসব গ্যাং সদস্য এলাকাভেদে কিছু স্থানীয় বিএনপি নেতার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থেকে অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি নোয়াখালীর চৌমুহনীতে মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী এক সমাবেশে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও নোয়াখালী-৩ আসনের সংসদ সদস্য বরকত উল্লাহ বুলু বলেন, বিগত আওয়ামী শাসনামলে যারা কাউন্সিলর বা ইউপি চেয়ারম্যান হওয়ার যোগ্য ছিল না, তারা মেয়র ও এমপি হয়েছে। ওই অযোগ্য জনপ্রতিনিধিরা নিজেদের স্বার্থে মাদক কারবারি, মাদকসেবী, কিশোর গ্যাং ও অস্ত্রধারীদের নিয়ে সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলে, যারা এখনো অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে।

অপরদিকে, নোয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান এক সমাবেশে বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গঠিত সন্ত্রাসী বাহিনী এখনো সক্রিয় থাকার চেষ্টা করছে। তবে মাদক, সন্ত্রাস ও কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। অপরাধীদের বিরুদ্ধে আমাদের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অব্যাহত থাকবে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বেশ কিছু কিশোর গ্যাং প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়, আবার অনেকে ফেসবুক, টিকটক ও ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় রয়েছে।

কিশোর গ্যাং ও মাদকাসক্তি দূর করতে সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থার ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, যারা কিশোরদের মাদক ও অপরাধে ব্যবহার করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিবারকে সন্তানের সঙ্গে সময় কাটাতে হবে এবং কথা শুনতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলাধুলা, সংস্কৃতি, বিতর্ক, বিজ্ঞানচর্চা ও কাউন্সিলিংয়ের সুযোগ বাড়াতে হবে। যারা ইতিমধ্যে আসক্ত হয়েছে, তাদের ঘৃণা না করে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ করে দিতে হবে।

অভিযানের বিষয়ে নোয়াখালী পুলিশ সুপার এন এম নাসিরুদ্দিন জানান, আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে এসব কিশোরদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা। এদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী, যাদের এখন পড়ার টেবিলে থাকার কথা। কিন্তু তারা পড়াশোনা ছেড়ে রাস্তায় আড্ডা দিয়ে অপরাধ ও মাদকের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আমরা কোনো কিশোরকে শুরুতেই স্থায়ী অপরাধী হিসেবে গণ্য করতে চাই না। একটি সুন্দর ও সুস্থ সমাজ উপহার দিতে কিশোর গ্যাং, মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমাদের ‘জিরো টলারেন্স’ অভিযান অব্যাহত থাকবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন